• facebook
  • twitter
Monday, 2 March, 2026

‘এসো একসাথে এই ছায়াগুলো পান করি’

সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায় পেশায় চিকিৎসক, কিন্তু শিল্প-সাহিত্য অন্তপ্রাণ। তাঁর সংস্থা ‘ইসিসার’ (ISISAR)-এর উদ্যোগে কলকাতায় প্রতিবছর আন্তর্জাতিক কবিতা উৎসব উদযাপিত হয়।

প্রচ্ছদ চিত্র

দেবপ্রিয় বাগচী

টোবিয়াস বুরগার্ডট ও জোনা বুরগার্ডট কবিদম্পতির যৌথ কাব্যগ্রন্থ ‘জলের স্মৃতিকথা’। অনুবাদ করেছেন সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়। টোবিয়াসের জন্ম ১৯৬১ সালে জার্মানিতে। বিশ্বের বহু দেশে টোবিয়াস গিয়েছেন কবিতা লেখার সূত্রেই। পেয়েছেন বিবিধ পুরস্কার। তার মধ্যে বাংলাদেশ থেকে ২০১৭ সালে তাঁরা দু’জনেই পেয়েছেন ‘কথক ইন্টারন্যাশনাল লিটারারি অ্যাওয়ার্ড’। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে ‘দ্য এলিমেন্টস অফ দ্য সি’, ‘সেপ্টেম্বর সয়েল অ্যান্ড অগাস্ট অ্যালফাবেট’, ‘রিভার আইলস অ্যান্ড আদার ডিস্ট্রিক্টস’, ‘রিভার ব্যাঙ্ক’ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। বহু আন্তর্জাতিক পত্র-পত্রিকা ও সংকলনে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর কবিতা।

Advertisement

‘স্থাপত্য’ কবিতায় টোবিয়াস লিখেছেন, ‘কত স্তম্ভ, কত খিলান/ তোমার হাঁটার পথ পরিমাপ করে / একটা সেতুর জন্য?’ কবিতাটি শেষ হয় এইভাবে, ‘শুধু নভেম্বর বিছিয়ে দেয় / বালির আর্দ্র ফেনা।’ টোবিয়াসের কবিতায় ছোট ছোট পঙ্‌ক্তি দিয়ে নির্মিত এবং তাঁর অত্যন্ত সাবলীল ও আশ্চর্য চিত্রকল্প তৈরি করে। ‘যুদ্ধ ও ইতিহাস’ কবিতাটি পুরোটা এখানে উদ্ধৃত করা হল—
‘অসম যুদ্ধ চলতে থাকে,/ কোনো দুটো যুদ্ধ একরকম নয়,/ প্রতিটি যুদ্ধ সবসময় ব্যর্থ হয়/ হত্যা নিয়ে আসছে মহামারী,/ যে নতুন করে যুদ্ধ করে/ সে কোনো ইতিহাস/ নির্মাণ করতে পারে না।’ অসাধারণ ব্যঞ্জনাময় সত্য ফুটে উঠেছে এই কবিতায়।

Advertisement

টোবিয়াসের কবিতা নির্ভার এবং পাঠকদের এক অনুভবময় জগতে পৌঁছে দেয়। ‘পরিদর্শন থেকে ফিরে’ কবিতায় তিনি লেখেন, ‘আমরা ভাষা শূন্যের মধ্যে ছেড়ে দিই/ এলোমেলো স্বাচ্ছন্দ্যে আর বিশ্রামের দৃষ্টিতে।’
বাংলার শিল্প-সংস্কৃতির সঙ্গে তৈরি হয়েছে তাঁর হৃদয়ের টান। তাই জীবনানন্দ দাশের ‘রূপসী বাংলা’র পঙ্‌ক্তি থেকে উদ্বুদ্ধ হন ‘একটি তুঁত সিল্ক সুতো’-র মতো কবিতা লিখতে। সেখানে তিনি লেখেন, ‘ক্রমবর্ধমান কুয়াশার ঢেউ— মিশে যাচ্ছ বালির মেঘে।/ আশ্রয় ছাড়া আর কিছু নেই/ মধ্যবর্তী অন্ধকারে।’
টোবিয়াস ‘জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি’ শীর্ষক কবিতা যেমন লেখেন, তেমনই ‘সেতার’ কবিতাটি লিখেছেন মিতা নাগের জন্য।

জোনা বুরগার্ডটের জন্ম ১৯৬৩ সালে আর্জেন্টিনার বুয়েনাস এয়ারেসে। জোনার কবিতা যেমন ইংরেজি, জার্মান, বাংলা, আরবি, সুইডিশ এবং ফরাসি ভাষায় অনূদিত হয়েছে, তেমনি তিনি নিজেও একজন দক্ষ অনুবাদক। টোবিয়াস ও জোনা একসঙ্গেও বহু কবিতা অনুবাদ করেছেন। তাঁরা দু’জনে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কবিতা উৎসবেরও আয়োজন করেছেন।

জোনার কয়েকটি কবিতা এখানে দেখা যেতে পারে। ‘বাতাস ও জল’ কবিতায় তিনি লিখেছেন, ‘ওরা বলেছে, ওরা কারোর সন্তান নয়,/ নিজেদের অপ্রাসঙ্গিক ইতিহাসের সন্তান হিসেবে/ আয়না তাদের স্বভাব প্রতিফলিত করে না/ কিন্তু মুখোশ সব শূন্যতা ঢেকে দেয়।’

জোনার কবিতাও নির্ভার কিন্তু সংবেদনশীল ও ব্যঞ্জনাময়। ‘পাখিরা জানে না’ কবিতায় তিনি লিখেছেন, ‘প্রতিটি অতল গহ্বর ছুটে যায়/ ভয়ের পেটে/ দুরারোহ পাহাড়ের গায়ে/ ভয়ের গোড়ালির ওপর,/ পাখিরা জানে না,/ কীভাবে তারা ডিমে ফিরে আসে/ বার বার,/ অতল গহ্বরের সামনে, আমরা/ ক্রমশ পিছিয়ে আসি।’ কবিতাটি এখানেই সম্পূর্ণ। প্রথম পঙ্‌ক্তিটি এক আশ্চর্য শিহরন তৈরি করে পাঠকের অনুভূতিতে। আর শেষে সেই অতল গহ্বরের সামনে থেকে ক্রমশ পিছিয়ে আসা।

আরেকটি ছোট্ট কবিতা দেখে নেওয়া যাক— ‘নর্তকী’। ‘ছোট্ট নর্তকী/ লাইন এবং নাচের মধ্যে পড়ে/ পিচ্ছিল সিল্কের ওপর/ নাচ, নাচ আর নাচ/ ছোট্ট নর্তকী/ ওড়নার বুদবুদে,/ উচ্চারণ ভেসে যায়/ পালকের উদাসীনতায়।’ আশ্চর্য চিত্রকল্প যা পাঠককে কবিতার গভীরে পৌঁছে দেয়।

উল্লেখ্য, সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায় পেশায় চিকিৎসক, কিন্তু শিল্প-সাহিত্য অন্তপ্রাণ। তাঁর সংস্থা ‘ইসিসার’ (ISISAR)-এর উদ্যোগে কলকাতায় প্রতিবছর আন্তর্জাতিক কবিতা উৎসব উদযাপিত হয়। এখানে সুদীপ্তর অনুবাদ এতটাই স্বচ্ছ ও সাবলীল যে, খুব সহজেই টোবিয়াস ও জোনার কবিতার মর্মস্থলে পৌঁছে যাওয়া যায়।

জলের স্মৃতিকথা
টোবিয়াস ও জোনা বুরগার্ডট-এর কবিতা
অনুবাদ: সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়
প্রকাশক: এডুকেশন সেন্টার
মূল্য: ২৫০ টাকা

Advertisement