• facebook
  • twitter
Monday, 2 March, 2026

ঝুমুর আর পিতলের বাঁশি

দেখল— একটি ছোট হরিণ কাদার গর্তে আটকে আছে। শিংয়ে লতা জড়ানো, পা নড়াতে পারছে না। ঝুমুর একটুও না ভেবে লম্বা একটি ডাল বাড়িয়ে দিল।

কাল্পনিক চিত্র

সুব্রত পাল

ঝুমুরের বাড়ি পাহাড়ের কোলে ছোট্ট গ্রাম বকুলডাঙায়। সকালে মেঘ নেমে আসে, দুপুরে রোদ খেলা করে ঘাসবনে, আর সন্ধ্যায় ঝিঁঝিঁ পোকার সুরে গোটা গ্রাম ভরে ওঠে। গ্রামের সবার কাছে ঝুমুর একটাই পরিচয়— কৌতূহলী, দয়ালু, আর অদম্য সাহসী। প্রতিদিন স্কুল থেকে ফিরে সে পাহাড়ের গা বেয়ে দৌড়ে যায় ওপরে— যেখানে প্রাচীন এক বটগাছ দাঁড়িয়ে আছে বয়সের ভারে, অথচ এখনো মহীরুহের মতো শক্তিশালী। গ্রামের লোকেরা বলে, ওই বটগাছের শিকড়ের নিচে নাকি লুকিয়ে আছে অজস্র রহস্য। শোনা যায়, এই গাছের ছায়ায় দাঁড়ালে যে কোনো মানুষের মন পড়ে ফেলতে পারে গাছটি— কিন্তু ঝুমুর এসব কথায় হাসত। তার কাছে বটগাছ ছিল একান্তই বন্ধুর মতো।

Advertisement

একদিন বিকেলে আকাশে কালো মেঘ, হাওয়ায় শিহরন। ঝুমুর বটগাছের গায়ে হাত রেখে ফিসফিস করে বলল, ‘বটঠাকুর, তোমার কোনো গোপন রাস্তা আছে নাকি?’ মুহূর্তেই গাছটি যেন কেঁপে উঠল। মাটির ফাঁক ভেঙে বেরিয়ে এল একটি ছোট্ট পিতলের বাঁশি। ঝুমুর সেটি হাতে তুলে কৌতূহলে ফুঁ দিল। ‘হুইইই…’ চারদিকে কুয়াশার ধোঁয়া নেমে এলো, আর ধোঁয়া সরতেই দেখা গেল— বটগাছের পেছনের খাদে ভাসছে এক আলো-অদৃশ্য সেতু! নীল রূপালি আলোয় ঝলমল, আর নিচে গভীর অতল গিরিখাত। ঝুমুরের বুক ধুকপুক করছিল, তবু তার ভয়কে ছাপিয়ে গেল বিস্ময় আর সাহস। সে সেতুর ওপর পা রাখল— নরম, তুলোর মতো অনুভূতি। আশেপাশে ভেসে আসছে অচেনা সব শব্দ— হাসি, সুর, জল পড়ার শব্দ, এমনকি শিশুরা দৌড়োচ্ছে এমন শব্দও। সেতুর ওপারে পৌঁছে দেখা গেল— এক অদ্ভুত বাগান, রংধনু বন। গাছে ফলের অদ্ভুত রং— নীল আম, লাল কাঁঠাল, সোনালি ফল। পাখিরা কথা বলছে, বাতাসে মধুর সুবাস। একটি হলুদ টিয়া উড়ে এসে ঝুমুরের কাঁধে বসলো। ‘স্বাগতম ঝুমুর’, সে বলল, ‘এখানে কেবল সাহসী আর নির্মল হৃদয়ের বাচ্চারাই আসতে পারে।’ ঝুমুর বিস্মিত— ‘তুমি আমার নাম জানো কীভাবে?’ টিয়া হাসল, ‘তুমি তো বটগাছের বন্ধু। গাছেরা সবই জানে।’ ঠিক তখনই দূর থেকে কান্নার শব্দ। ঝুমুর দৌড়ে গেল। দেখল— একটি ছোট হরিণ কাদার গর্তে আটকে আছে। শিংয়ে লতা জড়ানো, পা নড়াতে পারছে না। ঝুমুর একটুও না ভেবে লম্বা একটি ডাল বাড়িয়ে দিল।

Advertisement

‘এটা কামড়ে ধরো! আমি টানছি।’
হরিণ ধরে থাকতেই ঝুমুর প্রাণপণে টান দিল। কাদা ছিটকে পড়ল, তার পা পিছলে গেল, কিন্তু সে হাল ছাড়ল না। অবশেষে হরিণটি বেরিয়ে এলো— চোখে অশ্রু, অথচ কৃতজ্ঞতার আলো। হঠাৎ রংধনু বন উজ্জ্বল আলোয় ভরে উঠল। গাছের গায়ে ঘণ্টাধ্বনি, পাখিদের উল্লাস, আকাশ থেকে নেমে এল এক আলোকগোলক।
‘ঝুমুর’, গম্ভীর কণ্ঠ, ‘তোমার দয়া আর সাহস প্রমাণ করেছে তুমি এই বনের সত্যিকারের বন্ধু। যে কোনো একটি ইচ্ছে বলতে পারো— তা পূরণ হবে।’

ঝুমুর ভেবে বলল, ‘আমার গ্রামে যেন কেউ কোনোদিন অভুক্ত না থাকে।’ আলোর গোলা মৃদু হাসল, ‘এই ইচ্ছে মহৎ। বকুলডাঙায় আর কোনোদিন ফসলের অভাব হবে না।’ আলো মিলিয়ে গেল। টিয়া বলল, ‘এবার তোমার ফিরতে হবে। সেতু শেষ হয়ে আসছে।’ ঝুমুর ফিরে এলো— হাতে রয়ে গেল শুধু পিতলের বাঁশি। পরদিন গ্রামে খবর ছড়াল— এবার নাকি ইতিহাসের সেরা ফলন হবে! ঝুমুর চুপ করে হাসল। জানত এটাই তার পথের শুরু।
কিন্তু ঠিক একমাস পর আবার কিছু অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে লাগল। হাওয়া শীতল, আকাশে অচেনা আলো, আর বাঁশিটা পকেটে থেকে নরম আলো ছড়াতে লাগল। সেদিন সন্ধ্যায় বটগাছের কাছে দাঁড়াতেই বাঁশিটি নিজে নিজেই ফুঁ দিয়ে উঠল— আর আবার তৈরি হলো আলো-সেতু। সেতুর ওপারে গিয়ে ঝুমুর হতবাক—রংধনু বন আজ নিস্তব্ধ। পাখিদের মুখে সুর নেই, ফলগুলোর রং ফ্যাকাসে, বাতাস ভারী। ‘ঝুমুর!’ টিয়ার কণ্ঠ পিছন থেকে এল, ‘বিপদ হয়েছে! রংধনু বনের সময়রক্ষক— প্রাচীন কচ্ছপ— হারিয়ে গেছে! তারাই বনের দিন-রাত, ঋতু, ফুল-ফল সব নিয়ন্ত্রণ করে। সে নেই— তাই সব রং নিভে যাচ্ছে।’ হরিণটিও দৌড়ে এসে বলল, ‘আমরা শুনেছি কেউ তাকে খাদের নিচে ঠেলে ফেলেছে!’

ঝুমুর বলল, ‘তবে চল, তাকে খুঁজে বের করি। সে বাঁচুক বা না বাঁচুক— আমাকে দেখতে হবে।’ তারা তিনজন খাদের ধারে গেল। নিচে অন্ধকার। ঝুমুর বাঁশিতে ফুঁ দিতেই আলো নেমে গেল খাদে— আর দেখা গেল— সময়রক্ষক কচ্ছপটি শিকড়ের ফাঁদে আটকে আছে! ঝুমুর কঠিন সিদ্ধান্ত নিল।

‘টিয়া, লতা এনে দাও। হরিণ, তুমি আমাকে ধরে রাখো।’ সে লতা বেঁধে নিচে নামতে লাগল। পাথর পিছলাচ্ছে, কাঁধে ঝড়ের বাতাস লাগছে— তবু সে থামল না। কচ্ছপটিকে মুক্ত করে লতা দিয়ে বেঁধে উপরে ডাক দিল। অবশেষে তিনজন মিলে কচ্ছপটিকে ওপরে তুলল। মাটিতে উঠতেই কচ্ছপটির গায়ের ঘড়ি জ্বলে উঠল— টিক… টিক… টিক…

আর সেই শব্দেই রংধনু বনের রং ফিরে এলো। গাছে ফল ঝলমল, পাখিরা গান গাইতে শুরু করল। বন আবার বাঁচল। কচ্ছপটি বলল, ‘ঝুমুর, তুমি শুধু সাহসী নও— তুমি সময়ের সাথী। এই বন তোমাকে কখনো ভুলবে না। পুরস্কার হিসেবে আমি তোমাকে এক শক্তি দিচ্ছি— যখনই তুমি বাঁশি বাজাবে, তোমার হৃদয় যদি নির্মল থাকে, রংধনু বনের সেতু নিজে থেকেই তোমার জন্য তৈরি হবে।’

ঝুমুর বাঁশিটা বুকের কাছে চেপে ধরল— ‘আমি তোমাদের বন্ধু ছিলাম, আছি, থাকব।’
ফিরে এসে সে বটগাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকাল। মেঘের ভেতর যেন লুকিয়ে আছে এক অদৃশ্য সেতুলেখক— যে নতুন নতুন গল্পের পথ তৈরি করবে, আর ঝুমুর সেই পথ ধরে দৌড়বে সাহস ও ভালোবাসা বুকে নিয়ে।

Advertisement