• facebook
  • twitter
Sunday, 1 March, 2026

ভোটার তালিকা নিয়ে পথে নামছেন মমতা! ৬ মার্চ ধর্মতলায় অবস্থানে বসবেন মুখ্যমন্ত্রী, জানালেন অভিষেক

এই ধর্না মঞ্চ থেকেই পরবর্তী আন্দোলনসূচি ঘোষণা করা হবে বলে জানানো হয়েছে

শনিবার প্রকাশিত হয়েছে  চূড়ান্ত ভোটার তালিকা। এরপর থেকেই রাজনৈতিক বিতর্ক তুঙ্গে। বিপুল সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়া এবং বহু নাম ‘বিবেচনাধীন’ থাকার প্রতিবাদে আগামী শুক্রবার থেকে কলকাতার মেট্রো চ্যানেলে অবস্থান কর্মসূচির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই ধর্না মঞ্চ থেকেই পরবর্তী আন্দোলনসূচি ঘোষণা করা হবে বলে জানানো হয়েছে।

রবিবার তৃণমূল ভবনে সাংবাদিক বৈঠক করে এই কর্মসূচির কথা ঘোষণা করেন দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি জানান, গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্নে এই আন্দোলনে তিনিও ব্যক্তিগতভাবে অংশ নেবেন এবং ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে রাজ্যজুড়ে প্রতিবাদ আরও জোরদার করা হবে।

Advertisement

রাজ্যে এসআইআর প্রক্রিয়া শেষ করে প্রথম দফার চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের পরেই নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কের ঝড় উঠেছে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় রবিবার তৃণমূল ভবনে সাংবাদিক বৈঠক করে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে একাধিক গুরুতর অভিযোগ তোলেন। তাঁর দাবি, খসড়া তালিকা থেকে শুরু করে চূড়ান্ত তালিকা এবং বিবেচনাধীন নামের সংখ্যা—সব মিলিয়ে যে সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে, তা বিজেপি নেতাদের আগাম মন্তব্যের সঙ্গে হুবহু মিলে যাচ্ছে।

Advertisement

শনিবার প্রকাশিত চূড়ান্ত তালিকা অনুযায়ী, আগেই খসড়া পর্যায়ে প্রায় ৫৮ লক্ষ নাম বাদ পড়েছিল। পরে শুনানির পর আরও ৫ লক্ষ ৪৬ হাজার ৫৩ জনের নাম বাতিল করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ৬০ লক্ষ ৬ হাজার ৬৭৫ জন ভোটারের নাম বিবেচনাধীন অবস্থায় রাখা হয়েছে। সব মিলিয়ে সংখ্যাটি এক কোটিরও অনেক বেশি। এই বিপুল সংখ্যক নাম বাদ ও বিবেচনাধীন রাখার ঘটনাকে কেন্দ্র করেই প্রশ্ন তুলেছেন ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ।

সাংবাদিক বৈঠকে অভিষেক বিভিন্ন বিজেপি নেতার বক্তব্যের ভিডিও তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী, বিজেপির রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার এবং বনগাঁর সাংসদ শান্তনু ঠাকুর—এঁরা প্রত্যেকেই জনসমক্ষে বলেছিলেন যে এক কোটিরও বেশি ভোটারের নাম বাদ পড়বে। অভিষেকের বক্তব্য, এখন চূড়ান্ত তালিকার সংখ্যা সেই মন্তব্যের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে। তাঁর অভিযোগ, ‘লক্ষ্যমাত্রা অনেক আগে ঠিক করা হয়েছিল।

সেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতেই এই প্রক্রিয়া।‘ ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্র নিয়ে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর মন্তব্যের কড়া জবাব দেন অভিষেক। তিনি কটাক্ষ করে বলেন, ভবানীপুরে ভোটার সংখ্যা যতই থাকুক না কেন, সেখানে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জয় নিশ্চিত। অভিষেকের বক্তব্য, যদি ভবানীপুরে ১ লক্ষ ৪০ হাজার ভোটারও থাকে, তাহলে তার মধ্যে প্রায় ১ লক্ষ ভোট মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বাকি ৪০ হাজার ভোট বিরোধীরা পেতে পারে।

তিনি আরও দাবি করেন, নির্বাচন কমিশন সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ যথাযথভাবে মানেনি। তাঁর কথায়, খসড়া তালিকায় নাম উঠে গেলে তা সহজে বাতিল হবে না—এমন আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। অথচ চূড়ান্ত তালিকায় বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়েছে। তিনি জানান, সমস্ত তথ্য-প্রমাণ সুপ্রিম কোর্টে জমা দেওয়া হবে। কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়েও সরাসরি প্রশ্ন তোলেন তিনি।

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেন, নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পরেও নির্দিষ্ট ফর্ম ব্যবহার করে ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কোন বিধি মেনে এই পদক্ষেপ নেওয়া হল। তাঁর মতে, বিচারাধীন নামের সংখ্যা যেভাবে বেড়ে ১৪ লক্ষ থেকে প্রায় ৬০ লক্ষে পৌঁছেছে, তা স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সম্ভব নয়। তিনি জানতে চান, কোন ‘যাদুকাঠি’-তে এই বৃদ্ধি ঘটল।

চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর নানা প্রান্ত থেকে অভিযোগ আসছে বলে দাবি তৃণমূলের। অনেকেই নথি জমা দিয়ে শুনানিতে অংশগ্রহণ করার পরও নাম তালিকায় ওঠেনি। আবার কারও কারও নামের পাশে ‘বিবেচনাধীন’ উল্লেখ রয়েছে। অভিষেক বলেন, ‘মানুষ বৈধ, কিন্তু কাগজে অবৈধ—এ কেমন বিচার?’

তিনি বিশ্বকাপজয়ী ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটার রিচা ঘোষের নাম বিবেচনাধীন তালিকায় থাকার বিষয়টিও তুলে ধরেন। তাঁর কটাক্ষ, যদি জাতীয় দলের ক্রিকেটারের নামই বিবেচনাধীন থাকে, তবে দেশের গৌরবও কি বিবেচনাধীন? একই সঙ্গে তিনি নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের শুনানিতে ডাকার ঘটনাও উল্লেখ করে কমিশনের পদক্ষেপের সমালোচনা করেন।

অভিষেক আরও দাবি করেন, ‘এক ডাকে অভিষেক’ কর্মসূচির মাধ্যমে ২৪৩ জন তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন, যাঁরা জীবিত থাকা সত্ত্বেও ভোটার তালিকায় মৃত বলে চিহ্নিত হয়েছেন। এই ঘটনাকে তিনি গণতান্ত্রিক অধিকারের অবমাননা বলে আখ্যা দেন।

রাজ্যে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়ছে। নির্ঘণ্ট এখনও ঘোষণা না হলেও প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বিজেপিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে অভিষেক  বলেন, আগামী নির্বাচনে বিজেপির আসন সংখ্যা পঞ্চাশের নিচে নেমে যাবে। তাঁর দাবি, ২০২১ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে বিজেপির ফল আরও খারাপ হবে। পুরসভা, পঞ্চায়েত, উপনির্বাচন ও লোকসভা—সব ক্ষেত্রেই বিজেপিকে পরাজিত করা হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।তিনি আরও বলেন, এসআইআর বা অন্য কোনও প্রশাসনিক পদক্ষেপে রাজনৈতিক লড়াই থামানো যাবে না। শেষ কথা বলবেন মানুষ। মানুষের রায়ই চূড়ান্ত হবে।

এদিকে নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে রাজ্যে মোট ভোটার সংখ্যা ৭ কোটি ৪ লক্ষ ৫৯ হাজার ২৮৪। নতুন ভোটার হিসেবে যুক্ত হয়েছেন ১ লক্ষ ৮৮ হাজার ৭০৭ জন। নির্দিষ্ট ফর্ম পূরণ করে তালিকায় স্থান পেয়েছেন ১ লক্ষ ৮২ হাজার ৩৬ জন। পাশাপাশি অন্য ফর্মের মাধ্যমে সংশোধন করে যুক্ত হয়েছেন আরও বহু ভোটার। তবে খসড়া তালিকা থেকে সাড়ে পাঁচ লক্ষের বেশি নাম বাদ যাওয়া এবং বিপুল সংখ্যক নাম বিবেচনাধীন থাকা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য, এই পুরো প্রক্রিয়া সুপরিকল্পিত। তাঁর অভিযোগ, বিজেপি নেতারা আগাম যে সংখ্যা বলেছিলেন, সেই সংখ্যার কাছাকাছি পৌঁছতে বিভিন্ন যুক্তি দেখিয়ে নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। তিনি কমিশনকে ‘বিজেপির সহায়ক সংস্থা’ বলেও কটাক্ষ করেন এবং প্রয়োজনে আইনি লড়াইয়ের হুঁশিয়ারি দেন। চূড়ান্ত তালিকা সুপ্রিম কোর্টে জমা পড়বে বলে জানিয়ে তিনি বলেন, বিচারব্যবস্থার উপর তাঁদের আস্থা রয়েছে। কমিশনের পদক্ষেপ নিয়ে যদি মামলা হয়, তাতেও তিনি লড়াই করবেন বলে স্পষ্ট জানান।

 

Advertisement