ভোরের আলো ফুটতেই শহরের অলিগলিতে, ইটভাটার চুল্লির ধোঁয়ায়, হোটেলের রান্নাঘরের আগুনে কিংবা নির্মীয়মাণ বহুতলের ধুলোর মধ্যে যে ছোট ছোট হাতগুলো ব্যস্ত হয়ে ওঠে, তারা বইখাতা ধরার কথা ছিল। স্কুলের ঘণ্টা বাজার কথা ছিল যাদের জন্য, তারা আজ মজুরির ঘণ্টা গুনছে। শিশুশ্রম কেবল একটি সামাজিক সমস্যা নয়; এটি আমাদের সভ্যতার বিবেকের সামনে এক কঠিন প্রশ্নচিহ্ন। স্বাধীনতার এত দশক পরেও কেন একটি দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শ্রমের বোঝা বইতে বাধ্য হয়?
ভারতে শিশুশ্রম দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। আইন, নীতি, প্রচার— সবই আছে; তবু বাস্তব ছবিতে পরিবর্তন সীমিত। গ্রাম থেকে শহর, কৃষিক্ষেত্র থেকে কারখানা, চা-দোকান থেকে আতশবাজি শিল্প— নানা ক্ষেত্রে শিশুরা কাজ করছে। কেউ পরিবারের আর্থিক দুরবস্থার কারণে, কেউ আবার প্রতারণার শিকার হয়ে। শহরের ট্রাফিক সিগন্যালে ফুল বিক্রি করা শিশু, রেলস্টেশনে বোঝা বওয়া কিশোর কিংবা গৃহকর্মে নিযুক্ত অল্পবয়সি মেয়েটি— এরা সবাই একই গল্পের ভিন্ন অধ্যায়।
Advertisement
শিশুশ্রমের মূল কারণ দারিদ্র্য— এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। বহু পরিবার প্রতিদিনের দু’বেলা খাবার জোগাড় করতেই হিমশিম খায়। সেখানে সন্তানের পড়াশোনা অনেক সময় বিলাসিতা বলে মনে হয়। পরিবারের আয় বাড়ানোর তাগিদে শিশুদের কাজ করতে পাঠানো হয়। তবে দারিদ্র্যই একমাত্র কারণ নয়। শিক্ষার অভাব, সামাজিক সচেতনতার ঘাটতি, জনসংখ্যার চাপ, অপ্রতুল সামাজিক নিরাপত্তা এবং সস্তা শ্রমের চাহিদা— সব মিলিয়ে একটি জটিল জাল তৈরি হয়েছে। অনেক শিল্পক্ষেত্রে শিশুদের কম মজুরিতে দীর্ঘ সময় কাজ করানো সহজ; ফলে নিয়োগকর্তাদের একাংশ সচেতনভাবেই এই অবৈধ পথ বেছে নেয়।
Advertisement
শিশুশ্রমের আরেকটি অন্ধকার দিক হলো অদৃশ্য শ্রম। বহু শিশু গৃহস্থালির কাজে নিযুক্ত, যাদের শ্রম পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না। বাড়ির কাজ, ছোট ভাইবোনের দেখাশোনা, ক্ষেতের কাজে সহায়তা— এসবও শ্রম, কিন্তু তা স্বীকৃতি পায় না। বিশেষ করে কন্যাশিশুরা এই অদৃশ্য শ্রমের ভার বহন করে। ফলে তাদের শিক্ষা প্রায়শই থেমে যায় প্রাথমিক স্তরেই।
আইন কি নেই? অবশ্যই আছে। সংবিধান শিশুদের সুরক্ষার কথা বলে। নির্দিষ্ট বয়সের নিচে বিপজ্জনক কাজে শিশু নিয়োগ নিষিদ্ধ। শিশুশ্রম (নিষেধ ও নিয়ন্ত্রণ) আইন সংশোধিত হয়েছে, শাস্তির বিধান কঠোর হয়েছে। তবু বাস্তবে আইন প্রয়োগে বহু ফাঁকফোকর রয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে নজরদারি দুর্বল, আবার কোথাও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার আড়ালে অপরাধ লুকিয়ে থাকে। গ্রামীণ ও অনানুষ্ঠানিক খাতে শ্রমের নজরদারি আরও কঠিন।
শিশুশ্রমের প্রভাব শুধু অর্থনৈতিক নয়, গভীরভাবে মানসিক ও সামাজিক। দীর্ঘ সময় কঠোর পরিশ্রম শিশুর শারীরিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। অপুষ্টি, রোগব্যাধি, দুর্ঘটনা— এসব তাদের নিত্যসঙ্গী। একই সঙ্গে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়ায় তারা ভবিষ্যতে দক্ষ কর্মী হয়ে উঠতে পারে না। ফলে দারিদ্র্যের চক্র ভাঙা কঠিন হয়ে পড়ে। যে শিশু আজ শ্রমিক, সে বড় হয়ে আবার স্বল্পআয়ের কাজে নিয়োজিত থাকে, এবং তার সন্তানও একই পথে হাঁটে। এভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম দারিদ্র্যের বৃত্তে আবদ্ধ থাকে।
শিশুশ্রমের সঙ্গে জড়িয়ে আছে শোষণ ও নির্যাতনের সম্ভাবনাও। অনেক শিশু অমানবিক পরিবেশে কাজ করে, যথাযথ মজুরি পায় না, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়। বিশেষ করে গৃহকর্মে নিযুক্ত শিশুদের অবস্থান আরও অনিরাপদ, কারণ তাদের কর্মস্থল ব্যক্তিগত পরিসরে সীমাবদ্ধ। সমাজের চোখ সেখানে সহজে পৌঁছায় না।
তবে সম্পূর্ণ বাস্তবতা বুঝতে গেলে একটি প্রশ্নও বিবেচনা করতে হয়— সব ধরনের কাজ কি শিশুশ্রম? অনেক পরিবারে শিশুরা পড়াশোনার পাশাপাশি স্বল্প সময় পারিবারিক কাজে সাহায্য করে। এটি তাদের দায়িত্ববোধ শেখায় এবং জীবনের বাস্তবতার সঙ্গে পরিচয় করায়। কিন্তু যখন সেই কাজ বাধ্যতামূলক হয়ে ওঠে, দীর্ঘ সময় ধরে চলে এবং শিক্ষার অধিকার কেড়ে নেয়, তখনই তা শিশুশ্রমে পরিণত হয়। তাই মূল পার্থক্যটি হলো— কাজ কি শিশুর বিকাশে সহায়ক, নাকি তা তার শৈশব কেড়ে নিচ্ছে?
সমাধানের পথ তাই বহুমাত্রিক হতে হবে। প্রথমত, দারিদ্র্য দূরীকরণ ও সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পকে শক্তিশালী করতে হবে। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, ন্যায্য মজুরি এবং গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়ন পরিবারগুলিকে শিশুদের কাজে পাঠানোর প্রয়োজনীয়তা কমাবে। দ্বিতীয়ত, বিদ্যালয়কে আকর্ষণীয় ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তুলতে হবে। মধ্যাহ্নভোজন, বৃত্তি, বিনামূল্যে বই ও ইউনিফর্ম— এসব প্রকল্প কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বাড়ে। তৃতীয়ত, আইন প্রয়োগে কঠোরতা ও স্বচ্ছতা জরুরি। নিয়োগকর্তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা এবং পুনর্বাসন ব্যবস্থার উন্নতি অপরিহার্য।
পুনর্বাসন শুধু উদ্ধারেই সীমাবদ্ধ নয়; উদ্ধারকৃত শিশুদের শিক্ষা, কাউন্সেলিং ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ দিতে হবে। সমাজকেও দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। সস্তা পরিষেবা পাওয়ার লোভে যদি আমরা শিশু শ্রমিক নিয়োগ করি বা তা মেনে নিই, তবে আমরাও এই সমস্যার অংশ হয়ে যাই। নাগরিক হিসেবে প্রত্যেকের দায়িত্ব আছে সন্দেহজনক পরিস্থিতি প্রশাসনকে জানানো এবং সচেতনতা বাড়ানো।
মিডিয়া ও সাহিত্যও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। একটি সংবাদ প্রতিবেদন, একটি ছবি বা একটি গল্প অনেক সময় সমাজকে নাড়া দিতে পারে। শিশুশ্রমের বাস্তবতা যত বেশি প্রকাশ্যে আসবে, তত বেশি চাপ তৈরি হবে নীতিনির্ধারকদের ওপর। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতেও শিশু অধিকার সম্পর্কে পাঠ অন্তর্ভুক্ত করা উচিত, যাতে আগামী প্রজন্ম আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি নৈতিকতার। আমরা কেমন সমাজ গড়তে চাই? এমন সমাজ, যেখানে শিশুরা শ্রমের বোঝা বইবে, নাকি এমন সমাজ, যেখানে তারা স্বপ্ন দেখবে? শিশুশ্রম নির্মূল করা কেবল আইনি লড়াই নয়; এটি মানসিকতার পরিবর্তনের সংগ্রাম। প্রতিটি শিশুর অধিকার আছে শিক্ষা, খেলাধুলা ও নিরাপদ শৈশবের। সেই অধিকার নিশ্চিত করা আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব।
শিশুর হাতে যদি কলমের বদলে হাতুড়ি ধরা থাকে, তবে তা কেবল একটি পরিবারের ব্যর্থতা নয়, একটি জাতির ব্যর্থতা। উন্নয়নের অগ্রগতি তখনই সত্যিকার অর্থে অর্থবহ হবে, যখন দেশের প্রতিটি শিশু বিদ্যালয়ের পথে হাঁটবে, শ্রমের পথে নয়। শৈশবের অদৃশ্য শিকল ভাঙার সময় কি এখনও আসেনি? উত্তর আমাদের হাতেই।
Advertisement



