• facebook
  • twitter
Thursday, 19 February, 2026

শেখ মুজিবুর রহমান ও ভাষা আন্দোলন

পুলিশের তথা রাষ্ট্রের এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই আমগাছতলাতেই ছাত্রলীগের একটি প্রতিবাদ সভা হয়।

সুকান্ত পাল

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানের ক্ষমতাধারী শাসকরা পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মাতৃভাষা বাংলাকে অবরুদ্ধ করে উর্দু ভাষাকে সরকারি ভাষা হিসাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিদের উপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। একটা কথা স্মরণ রাখতে হবে যে, দেশভাগ হয়ে যাবার পর শেখ মুজিবুর রহমান লক্ষ্য করলেন তিনি দেশভাগের পর যে অসাম্প্রদায়িক সমাজ ও রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিলেন— সেই স্বপ্ন পশ্চিম পাকিস্তানি উর্দুভাষীদের হাতে পড়ে ক্রমাগত বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এক সাম্প্রদায়িক চিন্তাভাবনা ও সংস্কৃতির ভিত্তি এবং তার সঙ্গে সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদের আগ্রাসন ঘটছে ফলে তিনি আশাহত হয়ে আওয়ামী লীগ গঠন করে এক সুস্থ সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেন।

Advertisement

পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিন পশ্চিম পাকিস্তানের মুসলিম লীগ সরকারের সাম্প্রদায়িক এবং বাঙালি বিরোধী অবস্থান নিলে খুব স্বাভাবিকভাবেই পূর্ব পাকিস্তানের বাংলাভাষী মুক্ত ও উদার চিন্তা সম্পন্ন, অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী, ছাত্র, যুব, সাধারণ জনগণ বিরক্ত এবং ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। তাঁরা বুঝতে পারলেন যে, ১৯৪৭ সালের একটি ঔপনিবেশিক শক্তির অধীন থেকে মুক্ত হয়ে অন্য একটি নতুন (এশীয়) ঔপনিবেশিক শক্তির অধীনস্থ হয়েছেন তাঁরা। উভয়ের মধ্যে খুব বেশি ফারাক নেই।‌ গুণগত বিচারের কোনও পরিবর্তনই হয়নি। ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি শুধুমাত্র একটা ঝুটা অলংকার ব্যতীত আর কিছুই নয়।

Advertisement

এই পরিস্থিতিতে মুজিবুর রহমান সাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ থেকে বেরিয়ে এসে আলাদাভাবে গঠন করলেন ‘পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ’ কিন্তু কিছুদিন বাদেই নিজের ভুল বুঝতে পেরে ‘মুসলিম’ শব্দটিকে বাদ দিয়ে ছাত্র সংগঠনের নামকরণ করলেন ‘ছাত্রলীগ’। এখানেই তাঁর অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রকাশ।

অন্যদিকে, পশ্চিম পাকিস্তানপন্থী শাসকরা, যারা ছিল সমগ্র পাকিস্তানে (পূর্ব-পশ্চিম) সংখ্যালঘু তারা পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের উপর নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখার জন্য বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে। এইসব কৌশলের মধ্যে অন্যতম ছিল ভাষার আধিপত্য।

নতুন পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের প্রাথমিক পর্বে করাচিতে স্বাধীন পাকিস্তানের প্রথম গণপরিষদের অধিবেশনে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়। তার মধ্যে এই নতুন রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা কী হবে— এই প্রশ্নে যখন আলোচনা চলছিল তখন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত খুব সঙ্গত কারণেই প্রস্তাব দেন যে, পাকিস্তানের বিভিন্ন ভাষাভাষীদের মধ্যে বাংলা ভাষাভাষী মানুষই সংখ্যাগরিষ্ঠ, তাই উর্দু ও ইংরেজির সঙ্গে বাংলা ভাষাকেও রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে মর্যাদা দিতে হবে। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানি উর্দুভাষী এবং সাম্প্রদায়িক শাসকরা তা দিতে অস্বীকার করে।
তখন মুজিবুরের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় ছাত্রলীগের রাষ্ট্রভাষা সংগ্রামের সভা হয়। এই সভায় সর্বসম্মত ক্রমে ছাত্ররা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, নতুন রাষ্ট্রের ভাষা হবে বাংলা ভাষা। সভা সমাপ্ত করার পর মুজিবুরের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের একটি বিশাল মিছিল আইন পরিষদের সামনে গিয়ে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে। এই বিক্ষোভকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ বাহিনী ছাত্রদের উপর হামলা চালায় এবং লাঠিচার্জ করে ছাত্রদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। ফলে অনেকেই আহত হন।

পুলিশের তথা রাষ্ট্রের এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই আমগাছতলাতেই ছাত্রলীগের একটি প্রতিবাদ সভা হয়। এই ঘটনার দু’দিন পরেই জিন্না পাকিস্তান থেকে উড়ে এসে স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেন যে, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।

এই ঘোষণার ফলে শুরু হয়ে যায় প্রবল ছাত্র বিক্ষোভ ও আন্দোলন। শাসকগোষ্ঠী এই আন্দোলন স্তব্ধ করার জন্য যত রকম দমন পীড়ন সম্ভব সবই শুরু করল। এর ফলে শুরু হল এক ঐতিহাসিক সংগ্রাম, ভাষা সংগ্রাম। তখন এই সংগ্রামের মূল নেতৃত্ব তাঁর হাতে না থাকলেও তিনি এই আন্দোলনের এক অন্যতম মুখ হয়ে ওঠেন শেখ মুজিবুর রহমান। এর ফলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের কিছুদিন পর মুক্তি লাভ করে সরকার বিরোধী আন্দোলনে আবার আত্মনিয়োগ করার ফলে অত্যন্ত দুর্ভাগ্যবশত লীগ সরকারের নির্দেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আইন বিভাগের উজ্জ্বল ছাত্র শেখ মুজিবুর রহমানকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করে।

শেখ মুজিবুরের সঙ্গে আরও বেশ কিছু ছাত্রনেতাকেও বহিষ্কার করা হয় তখন। কিন্তু আপসকামী কিছু ছাত্রনেতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে মুচলেকা দিয়ে আত্মসমর্পণ করে এবং পুনরায় বিশ্ববিদ্যালয় ফিরে যায়। কিন্তু প্রকৃত বিপ্লবী চেতনায় উদ্বুদ্ধ এবং জাগ্রত বিবেকসম্পন্ন শেখ মুজিবুর রহমান সে পথে হাঁটেননি। নিজের ব্যক্তিগত জীবনের সুখ, স্বাচ্ছন্দ্য ও কোনও উন্নতির কথা তিনি ভাবেননি। একজন প্রকৃত বিপ্লবীর মতোই তিনি গভীর আত্মবিশ্বাসে সেদিন উচ্চারণ করেছিলেন, ‘আমি আবার একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসবই, তবে হয়তো ছাত্র হিসাবে নয়।’

পরে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় ফিরে এসেছিলেন— তবে ছাত্র হিসাবে নয়, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে। বাংলা ভাষা সংগ্রামের এক মহান সৈনিক থেকে একজন রাষ্ট্রনায়ক, যে রাষ্ট্রনায়ক দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার একজন শ্রেষ্ঠ রাজনীতিবিদ। বলা যায়, পুর্বঙ্গের ভাষা আন্দোলনের ফলে যে, জাতীয় সংগ্রাম গড়ে উঠেছিল এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতা লাভ করেছে ‘বাংলাদেশ’ নামক একটি রাষ্ট্র হিসাবে, তার সঙ্গে বাঙালির এক পরমপ্রাপ্তি ভাষা আন্দোলনের এক ছাত্র নেতাকে তাদের স্বাধীন দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পাওয়া।‌

Advertisement