শেয়ার বাজারের ওঠানামা এবার রীতিমতো ঝড়ের রূপ নিল দালাল স্ট্রিটে। চলতি সপ্তাহে ভারতীয় শেয়ার বাজারের অবস্থা এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা আর আস্থাহীনতার ছায়া একসঙ্গে গ্রাস করেছে লগ্নিকারীদের মন। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে সেনসেক্সের পতন হয়েছে ২ হাজার পয়েন্টেরও বেশি। এর জেরে বাজার মূলধন হিসেবে লগ্নিকারীদের হাত থেকে উবে গিয়েছে ১৬ লক্ষ ২৮ হাজার ৫৬১ কোটি টাকার বেশি সম্পদ।
শুধু শেয়ার বাজার নয়, একইসঙ্গে রক্তক্ষরণ অব্যাহত থেকেছে ভারতীয় মুদ্রারও। গত শুক্রবার টাকার দর আরও তলানিতে গিয়ে ইতিহাস গড়েছে। এক সময় এক মার্কিন ডলার সমান দাঁড়ায় ৯২ টাকা, যা সর্বকালীন রেকর্ড। যদিও শেষ মুহূর্তে সামান্য ঘুরে দাঁড়িয়ে ডলারের নিরিখে টাকা থিতু হয় ৯১.৯০ তে। তবুও এই পতন দেশের আর্থিক বাজারে উদ্বেগের ছবি আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে।
Advertisement
বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, চলতি সপ্তাহে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে টাকা বিনোয়োগের প্রবণতার চেয়ে মুনাফা ঘরে তোলার মানসিকতাই ছিল বেশি। অনিশ্চিত আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, বিদেশি লগ্নিকারীদের সতর্ক অবস্থান, ডলারের দর বেড়ে যাওয়া এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে চাপবৃদ্ধি— সব মিলিয়ে বাজারে বিক্রির চাপ ক্রমশ বাড়তে থাকে।
Advertisement
শুক্রবার সকালের দিকে বাজার কিছুটা ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েই খুলেছিল। প্রথম দিকে সূচক উপরের দিকেই ছিল। কিন্তু সেই আশার আলো স্থায়ী হয়নি। অল্প সময়ের মধ্যেই বাজার হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে। দিনের অধিকাংশ সময়ই নিম্নমুখী ছিল সূচক। বড় কোম্পানির শেয়ার থেকে শুরু করে মাঝারি ও ছোট শেয়ার— কেউই রেহাই পায়নি। বাজার বন্ধ হওয়ার সময় বিএসই সেনসেক্স পড়ে যায় ৭৬৯.৬৬ পয়েন্ট বা ০.৯৪ শতাংশ। সূচক থিতু হয় ৮১,৫৩৭.৭০ পয়েন্টে।
সাপ্তাহিক হিসাবে ছবিটা আরও ভয়াবহ। তথ্য অনুযায়ী, মাত্র এক সপ্তাহে সেনসেক্সের পতন হয়েছে ২,০৩২.৬৫ পয়েন্ট বা ২.৪৩ শতাংশ। একই পথে হেঁটেছে এনএসই নিফটির সূচকও। নিফটি কমেছে ৬৪৫.৭০ পয়েন্ট বা ২.৫১ শতাংশ। বাজারের এই ধারাবাহিক পতনে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে সাধারণ লগ্নিকারীরা, যাঁদের দীর্ঘদিনের সঞ্চয় শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করা ছিল।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, টাকার দর পড়ে যাওয়া এবং শেয়ার বাজারের ধস একে অপরকে প্রভাবিত করছে। ডলার শক্তিশালী হলে বিদেশি পুঁজি বাজার থেকে বেরিয়ে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ে। ফলে শেয়ার বাজারে বিক্রির চাপ বাড়ে। আবার বাজার পড়লে অর্থনীতির উপর আস্থার সঙ্কট তৈরি হয়, যার প্রভাব পড়ে মুদ্রাবাজারেও।
এই পরিস্থিতিতে লগ্নিকারীদের মধ্যে আতঙ্ক বাড়লেও বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছেন, এই ধরনের অস্থিরতা শেয়ার বাজারের স্বাভাবিক বৃত্তেরই অংশ। তবে বর্তমান বাস্তবতায় বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরতে কিছুটা সময় লাগতে পারে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মুদ্রাস্ফীতি, সুদের হারের নীতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের গতিপ্রকৃতি— সবকিছু মিলিয়েই আগামী দিনের বাজারের দিক নির্ধারিত হবে।
সব মিলিয়ে, চলতি সপ্তাহ ভারতীয় শেয়ার বাজারের জন্য এক কঠিন অধ্যায় হয়ে থাকল। একদিকে সেনসেক্স ও নিফটির বড় পতন, অন্যদিকে টাকার রেকর্ড পতন— এই দুইয়ের যুগলবন্দিতে দালাল স্ট্রিট এখন কার্যত ঝঞ্ঝার মুখে। লগ্নিকারীদের চোখে এখন একটাই প্রশ্ন, এই অস্থিরতা কবে থামবে, আর বাজার কবে আবার ঘুরে দাঁড়াবে?
Advertisement



