সুকান্ত পাল
ভারতবর্ষে নেতাজি সুভাষ চন্দ্রের একটা সর্বজনীন যে আকর্ষণ ও আবেদন আছে– তাকে অস্বীকার করা যায় না। শুধুমাত্র ভারতবর্ষেই নয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং পূর্ব এশিয়ায় তাঁর যে বৃহৎ কর্মযজ্ঞ তা সবাইকে মুগ্ধ করে। গান্ধীজির নেতৃত্বে স্বাধীনতা আন্দোলনে এক দীর্ঘ ধারাবাহিকতা ছিল, তা যখন কিছুটা দিশাহীন তখন নেতাজির আজাদ হিন্দ বাহিনীর হাতেই ইংরেজের সাম্রাজ্যবাদী শাসনের মৃত্যু ঘন্টা ধ্বনিত হয়েছিল।
তাঁর মত ও পথের সঙ্গে জাতির জনক গান্ধীর বিভিন্ন মতবিরোধ নিয়ে অনেক তর্ক বিতর্ক আছে। আমরা সেই তর্কবিতর্কের জালে আবদ্ধ না হয়ে এখানে কয়েকটি কথা বলতে চাই।
Advertisement
প্রথমেই বলব ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতাজিই ছিলেন এক বিকল্প এবং অর্থবহ নেতৃত্বের অধিকারী। যে নেতৃত্ব ছিল ইতিবাচক এবং তদানীন্তন স্বাধীনতাকামী ভারতীয় জনগণের অবদমিত মুক্তি আকাঙ্ক্ষার এক আলোক দিশারী। তাঁর প্রকৃত বিপ্লব চেতনা, স্বদেশ প্রীতি এবং আত্মত্যাগের আদর্শ পৃথিবীর অনেক মহান নেতা, দার্শনিক, লেখক, চিন্তাবিদ ও রাষ্ট্রবিদদের প্রশংসা অর্জন করেছিল। ব্রিটিশ শাসকরা ঠিক বুঝতে পেরেছিল— গান্ধী নন, তাদের আসল শত্রু নেতাজি। এই কারণেই ১৯৪০ সালের ২ জুলাই ব্রিটিশরাজ সুভাষচন্দ্রকে গ্রেপ্তার করে।
Advertisement
ব্রিটিশরাজ ঠিকই বুঝেছিল যে, যদি নেতাজিকে এবং তাঁর কর্মকাণ্ডকে স্তব্ধ করে দেওয়া যায়, তবে তার থেকে ব্রিটিশের পক্ষে মঙ্গলজনক আর কিছুই হবে না। কারণ ১৮৮৫ সালে জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর (কেন জাতীয় কংগ্রেস তৈরি হয়েছিল তার পিছনে কী তত্ত্ব কাজ করেছে সে বিষয়টা এখানে উহ্য থাক) কংগ্রেসের যে রাজনীতি ও আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি ছিল তা ব্রিটিশরাজকে যে খুব একটা বেশি ঝামেলায় ফেলতে পারবে না সে সম্বন্ধে তাদের সম্যক জ্ঞান ছিল এবং বাস্তবে তাই হয়েছিল। কিন্তু সমস্যা হল নেতাজির উত্থান। এক বিকল্প, ইতিবাচক আদর্শ সম্বলিত নেতাজির নেতৃত্ব ব্রিটিশ রাজের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলতে বাধ্য করেছিল।
১৯৩৯ সালে ত্রিপুরী কংগ্রেসের আগেই এবং ত্রিপুরী কংগ্রেসের সময় এবং পরেও তিনি তাঁর অভিজ্ঞতায় ঠিক বুঝেছিলেন যে কংগ্রেসের মধ্যেই একটি সুশৃংখল বামপন্থী সংগঠন গড়ে তুলতে হবে। যদি তা না করা যায় তবে কংগ্রেস এক দিকদিশাহীন ভ্রান্ত পথে চালিত হবে এবং এই কারণেই তিনি কংগ্রেসের সভাপতি পদ থেকে পদত্যাগ করে এই সংগঠন করার দিকে মনোনিবেশ করলেন। সভাপতির পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘গান্ধীবাদী দলের মনোভাব থেকে বোঝা গেল যে, আমার নির্দেশ তারা মেনে চলবে না, কংগ্রেসের পরিচালন ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করতেও আমাকে দেবে না। আমি যদি নামমাত্র সভাপতি থাকতে রাজি হই একমাত্র তাহলেই তারা আমাকে বরদাস্ত করবে… ফলত সভাপতি পদে ইস্তফা দেওয়া ছাড়া আমার আর গত্যন্তর ছিল না।’ সেই বছরই মে মাসের তিন তারিখে কলকাতার শ্রদ্ধানন্দ পার্কে অনুষ্ঠিত এক জনসভায় তিনি ফরওয়ার্ড ব্লক সৃষ্টি করার কথা ঘোষণা করলেন। যদিও কংগ্রেসের অভ্যন্তরে উপদল আগে থেকেই থাকায় ফরওয়ার্ড ব্লক সৃষ্টি করতে তাঁকে কোনোরকম সাংগঠনিক অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়নি। ঐদিনই তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে তাঁর লক্ষ্য হলো কংগ্রেসের অভ্যন্তরে বামপন্থী সদস্যদের ঐক্যবদ্ধ করে সামগ্রিকভাবে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম গড়ে তোলা এবং এই ঘোষণার মধ্যেই কংগ্রেসের হাইকম্যান্ড প্রমাদ গুনল।
তাই কংগ্রেসের নেতৃত্ব এবং ব্রিটিশের সন্দেহের বীজ এখান থেকেই দানা বাঁধল। শিশির কুমার বোস তাঁর গ্রন্থ, “Netaji Subhas Chandra Bose” এ লেখেন, “In July of the same year, at the call of Forward Bloc, demonstrations were held through out India demanding the democratic right of all congressmen to criticise and publicly discuss policies followed by the Congress ministries and the Congress High Command. The new Congress President Rajendra Prasad asked Subhash Chandra not to proceed with such demonstrations.” কিন্তু সুভাষচন্দ্র এই নির্দেশ না মানার ফলে সুভাষচন্দ্রকে তিন বছরের জন্য কংগ্রেসের কোনো পদে নির্বাচনের জন্য অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলো।
আসলে কংগ্রেসের হাইকম্যান্ড এক বিকল্প নেতৃত্বের উত্থানে ভীত হয়ে উঠেছিল। তাদের ভীতিকে কাজে লাগিয়েছিল ব্রিটিশ রাজ এবং ১৯৪০ সালে বিহারে রামগড়ে কংগ্রেসের অপসনীতির বিরুদ্ধে সম্মেলন করলে ব্রিটিশ এই আন্দোলন দমন করার জন্য সৈন্য নামায়। আমরা লক্ষ্য করি তদানীন্তন কংগ্রেস এবং ব্রিটিশ রাজের চিন্তাভাবনা কোথায় যেন এক সূত্রে গ্রথিত হয়ে যায়। ভারতবাসী এক বিকল্প নেতৃত্ব পেয়ে খুশি হলেও এক অশুভ আঁতাতে তা হারিয়ে গেল ভারতের মাটিতেই।
কিন্তু নেতাজি দমে যাওয়ার পাত্র ছিলেন না। তাই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নেতাজির পরিচালিত আজাদ হিন্দ ফৌজ এক নতুন আশার সঞ্চার করে। কিন্তু প্রাথমিক কিছুটা সাফল্যের পর জাপানের সামরিক কর্তৃপক্ষের অসহযোগিতার কারণে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে আজাদ হিন্দ ফৌজ কিছু ঘটতে বাধ্য হয়
এবং শেষ পর্যন্ত সামরিক ব্যর্থতা স্বীকার করতেও বাধ্য হয়। ফলে একটা স্বপ্নের অকাল মৃত্যু ঘটল।
সবশেষে একটি কথা না বললেই নয়, তা হল নেতাজির পাশে যদি সেদিন কংগ্রেস থাকত তবে হয়তো ১৯৪৭-এ ভারতকে এই দ্বিখণ্ডিত স্বাধীনতা মেনে নিতে হতো না। আজ ভারতবর্ষের চিত্র হতো সম্পূর্ণ অন্যরকম। এক সুস্থ সামাজিক পরিবেশ ও ন্যায়নীতিসম্পন্ন রাষ্ট্রীয় বাতাবরণে হয়তো আমরা বাস করতে পারতাম।
Advertisement



