অন্বেষা বসুরায়
বাংলা সাহিত্যে রয়েছে ছড়ার সুদীর্ঘ ইতিহাস। একসময় লোকসমাজে ছড়াই ছিল ভাবপ্রকাশের প্রধান মাধ্যম। বিশ শতক থেকে বাংলা সাহিত্যে ছড়ার দু’টি ধারা খুব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একটি ধারা লোকজ সাহিত্য থেকে সৃষ্ট এবং অন্য ধারাটি সুকুমার রায় প্রবর্তিত হাস্যরসাত্মক ছড়া, যা অনেক সময় অর্থহীন বা অসংলগ্ন কথা বিন্যাস।
Advertisement
১৮৯৯ সালে যোগীন্দ্রনাথ সরকার লৌকিক ছড়াকে প্রথম গ্রন্থভুক্ত করেন এবং তার নাম দেন ‘খুকুমণির ছড়া’। পরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লোকমুখে প্রচলিত ছড়া সংকলিত করার ক্ষেত্রে বিশেষ উদ্যোগ নেন। এক্ষেত্রে তাঁর প্রধান সহযোগী ছিলেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর সম্পাদিত কাব্যগ্রন্থে সুকুমার রায়ের ছড়া সংকলিত করে সাহিত্যে ছড়ার গ্রহণযোগ্যতাকে আরও সুদৃঢ় করেন। ছড়া প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘সুদূর কাল থেকে আজ পর্যন্ত এই কাব্য (ছড়া) যারা আউড়িয়েছে এবং যারা শুনেছে তারা অর্থেও অতীত রস পেয়েছে। ছন্দতে ছবিতে মিলে একটা মোহ এনেছে তাদের মধ্যে। সেইজন্য অনেক নামজাদা কবিতার চেয়ে এর আয়ু বেড়ে চলেছে। একসময় ছড়াকে মনে করা হতো শুধুই শিশুসাহিত্য। এখন তা আর মনে করা হয় না, বাংলা সাহিত্যে ছড়া তার নিজস্ব অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে।
Advertisement
ছড়ায় ব্যবহৃত শব্দ বা বাক্যের অর্থ থাকতেও পারে, না-ও থাকতে পারে। যেমন, ‘হাট্টিমা টিম-টিম / তারা মাঠে পাড়ে ডিম / তাদের খাড়া দুটো সিং / তারা হাট্টিমা টিম টিম।
বাংলায় প্রথম এই ধরনের আজগুবি ছড়া বা ননসেন্স রাইমের প্রচলন করেন সুকুমার রায়, যা দীর্ঘকাল ধরেই বাঙালির মন জয় করে রেখেছে।
সুনীল করণ সম্পাদিত ‘টাট্টুঘোড়া’ পত্রিকাটির উৎসব সংখ্যা শুধুমাত্র ছড়া নিয়েই প্রকাশিত হয়েছে। দেশ-বিদেশ সহ পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলার প্রায় ৩০০ জন বিশিষ্ট কবি এই সংখ্যায় ছড়া লিখেছেন।
প্রথমেই চোখে পড়ে তপন বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্যামলকান্তি দাশ, অভীক বসু, শ্যামল জানা প্রমুখ বিশিষ্ট কবিদের ছড়া। শ্যামলকান্তি দাশ লিখেছেন, ‘ছড়ারা যেই ছড়িয়ে গেল / ভাঙল ঘরের খাটখানা, / ধানকুড়নি পায়রাগুলো / আহ্লাদে হয় আটখানা।’
শ্যামল জানা ‘টাট্টুঘোড়া’ নিয়েই লিখেছেন, ‘টুটছে সবই পায়ের চাপে / ছুটছে তবু ঘোড়া, / পায়ের চাপেই সন্ধ্যা নামে/ পাহাড় নামায় ঝোরা।’ শেষ করেছেন এইভাবে— ‘এখনো বাকি একটু থোড়া / ওই ঘোড়াটির কথা, / নামটি তাহার টাট্টুঘোড়া / সুনীল করণ মাথা।’
এই পত্রিকাটির বৈশিষ্ট্য, এই সময়ের প্রায় সমস্ত উল্লেখযোগ্য কবিরাই এখানে ছড়া লিখেছেন। অন্যান্যদের মধ্যে রতনতনু ঘাটী, রামচন্দ্র পাল, অশ্রুরঞ্জন চক্রবর্তী, উত্থানপদ বিজলী, মধুসুদন ঘাটী, রূপক চট্টরাজ, প্রদীপ আচার্য, কৃষ্ণা বসাক, সমরেশ মণ্ডল, দীপশিখা চৌধুরী, তুহিনকুমার চন্দ, চিত্রা লাহিড়ী, রামকিশোর ভট্টাচার্য, তাপসকুমার চট্টরাজ, তীর্থঙ্কর সুমিত, কিঙ্কি চট্টোপাধ্যায় ও আরও অনেকে। এতে রয়েছে ‘ছোটোদের পাতা’, যেখানে স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের ছড়া প্রকাশিত হয়েছে। চমৎকার প্রচ্ছদটি এঁকেছেন শ্যামল জানা। সবমিলিয়ে খুব আকর্ষণীয় এই ‘টাট্টুঘোড়া’।
টাট্টুঘোড়া
সম্পাদক: সুনীল করণ
মূল্য : ৭০ টাকা
Advertisement



