• facebook
  • twitter
Thursday, 15 January, 2026

নির্বাচন কমিশন, রক্ষাকবচ এবং গণতন্ত্রের সংকেত

গণতন্ত্র কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে টিকে থাকে না। এটি টিকে থাকে আস্থার উপর— ভোটারের আস্থা, প্রতিষ্ঠানের আস্থা এবং প্রক্রিয়ার আস্থা।

প্রতীকী চিত্র

সৈয়দ হাসমত জালাল

গণতন্ত্রের প্রাণভোমরা যদি নির্বাচন হয়, তবে সেই নির্বাচনের নিরপেক্ষতা রক্ষার দায়িত্ব যে প্রতিষ্ঠানের উপর ন্যস্ত, তার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের ঊর্ধ্বে থাকা একান্ত প্রয়োজন। ভারতের ক্ষেত্রে সেই প্রতিষ্ঠান হল নির্বাচন কমিশন– একটি সাংবিধানিক সংস্থা, যার উপর নির্ভর করে জনগণের ভোটাধিকার, ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তর এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ভাবে আজ সেই নির্বাচন কমিশনই বিতর্কের কেন্দ্রে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ-পদ্ধতি এবং তাঁদের দেওয়া আইনি সুরক্ষা ঘিরে যে প্রশ্নগুলি উঠছে, তা কেবল প্রশাসনিক বা আইনি বিতর্ক নয়, এগুলি সরাসরি গণতন্ত্রের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগের ইঙ্গিত।

Advertisement

দু’বছর আগে কেন্দ্রের মোদী সরকার যে ‘মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন’ কার্যকর করেছে, তার ফলে এই বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। এই আইনের দু’টি দিক বিশেষ ভাবে প্রশ্নের মুখে। প্রথমত, নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের জন্য গঠিত কমিটি থেকে দেশের প্রধান বিচারপতিকে বাদ দেওয়া। দ্বিতীয়ত, কমিশনারদের জন্য আজীবন ফৌজদারি মামলা থেকে সুরক্ষা দেওয়ার বিধান। এই দুই সিদ্ধান্তই নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা এবং সাংবিধানিক অবস্থান নিয়ে গভীর সংশয় তৈরি করেছে।

Advertisement

সরকারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই আইনি সুরক্ষা কমিশনারদের কাজের শর্তের অংশ। যুক্তি দেওয়া হচ্ছে, যাতে তাঁরা রাজনৈতিক চাপ বা প্রতিহিংসামূলক মামলার ভয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পিছপা না হন। যুক্তিটি শুনতে আকর্ষণীয় হলেও, এখানেই মূল প্রশ্নটি উঠে আসে— ফৌজদারি আইনের আওতা থেকে কার্যত অব্যাহতি কি সত্যিই ‘কাজের শর্ত’ হিসেবে গণ্য হতে পারে? দেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি ও রাজ্যপালদের মতো উচ্চ সাংবিধানিক পদাধিকারীরাও যেখানে এমন পূর্ণ রক্ষাকবচ ভোগ করেন না, সেখানে নির্বাচন কমিশনারদের জন্য এই অতিরিক্ত সুরক্ষা কি সাংবিধানিক ভারসাম্যকে বিঘ্নিত করছে না?

বিরোধী শিবিরের অভিযোগ আরও তীব্র। তাদের মতে, এই আইনি ঢাল কমিশনকে স্বাধীন করার বদলে কার্যত নির্বাহী বিভাগের ঘনিষ্ঠ করে তুলছে। কারণ, একদিকে নিয়োগের প্রক্রিয়ায় বিচারব্যবস্থার উপস্থিতি সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে কমিশনারদের এমন সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে, যা তাঁদের জবাবদিহির পরিসর সংকুচিত করে। ফলে জনমনে এই ধারণা তৈরি হচ্ছে যে নির্বাচন কমিশন শাসক দলের প্রতি অতিরিক্ত সহানুভূতিশীল, কিংবা রাজনৈতিক চাপের কাছে নতিস্বীকার করছে।

এই ধারণা যে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, তা আজ আর নির্দ্বিধায় বলা কঠিন। সাম্প্রতিক একাধিক লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নির্বাচনী বিধিভঙ্গের অভিযোগে বিরোধী নেতাদের বিরুদ্ধে দ্রুত নোটিস, নিষেধাজ্ঞা বা কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হলেও, শাসক দলের শীর্ষ নেতৃত্বের ক্ষেত্রে কমিশনের ভূমিকা তুলনামূলক ভাবে নরম— এমন অভিযোগ বারবার সামনে এসেছে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন যদি কেবল রাজনৈতিক মঞ্চে সীমাবদ্ধ থাকত, তা হলে হয়তো একে স্বাভাবিক বিতর্ক হিসেবেই ধরা যেত। কিন্তু সেই অভিযোগ যখন আদালতের দরজায় পৌঁছয়, তখন তা নিছক রাজনীতির সীমা ছাড়িয়ে যায়।

এই কারণেই সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, এই আইন সংবিধানের মৌলিক কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে কি না, তা খতিয়ে দেখা আদালতের দায়িত্ব। অর্থাৎ প্রশ্নটা আর শুধু আইনের বৈধতা নিয়ে নয়, বরং এই আইনের ফলে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীন সত্তা কতটা অক্ষুণ্ণ থাকছে, সেটাই বিচার্য।

উল্লেখ করা জরুরি, এর আগেই সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের ক্ষেত্রে একটি ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামোর কথা বলেছিল, যেখানে নির্বাহী বিভাগের পাশাপাশি বিচারব্যবস্থার প্রতিনিধিত্ব থাকত। নতুন আইনে সেই নির্দেশ কার্যত উপেক্ষিত হয়েছে। ফলে অভিযোগ উঠছে, সরকার নিজের অনুকূল ব্যক্তিদের কমিশনে নিয়োগ করার পথ সুগম করছে। গণতন্ত্রে শুধু বাস্তব নিরপেক্ষতা যথেষ্ট নয়; নিরপেক্ষতার ধারণাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। জনগণের মনে যদি এই বিশ্বাস জন্মায় যে নির্বাচন কমিশন পক্ষপাতদুষ্ট, তবে সেই ক্ষতি দীর্ঘস্থায়ী হয়।

এখানেই রক্ষাকবচের প্রশ্নটি নতুন মাত্রা পায়। এই সুরক্ষা আদৌ কাদের জন্য? কমিশনারদের স্বাধীনভাবে কাজ করার জন্য, না কি তাঁদের সিদ্ধান্তকে আইনি প্রশ্নের বাইরে রাখার জন্য? একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার জন্য সুরক্ষা দেওয়া আর তাকে সন্দেহের আড়ালে ঢেকে রাখা— এই দুইয়ের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। বর্তমান ব্যবস্থায় যদি নির্বাচন কমিশনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়, তবে তার প্রভাব পড়বে পুরো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার উপর। নির্বাচন কমিশন কোনও সরকারের অধীন দপ্তর নয়। এটি সংবিধানের দ্বারা সৃষ্ট একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, যার প্রতি সকল রাজনৈতিক দলের আস্থা থাকা উচিত। সেই আস্থা যখন টলমল করতে শুরু করে, তখন তা শুধু কমিশনের সমস্যা থাকে না, তা রাষ্ট্রের সমস্যায় পরিণত হয়। আজ যখন দেশের সর্বোচ্চ আদালত এই আইন খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নিয়েছে, তখন সরকারের উচিত এই বিষয়টিকে অহংকারের লড়াই হিসেবে না দেখে আত্মসমালোচনার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা।

গণতন্ত্র কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে টিকে থাকে না। এটি টিকে থাকে আস্থার উপর— ভোটারের আস্থা, প্রতিষ্ঠানের আস্থা এবং প্রক্রিয়ার আস্থা। সেই আস্থা একবার ভেঙে গেলে, আইনি রক্ষাকবচ দিয়েও তাকে পুনর্গঠন করা সহজ নয়। নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা করা মানে কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের সুরক্ষা নয়, তা আসলে ভারতের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করার প্রশ্ন।

Advertisement