• facebook
  • twitter
Tuesday, 13 January, 2026

লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির শুনানি ঘিরে প্রশাসনিক চাপে জেলা

ভোটারদের মধ্যেও বাড়ছে উৎকণ্ঠা

প্রতীকী চিত্র

ক্রমশ জটিল হচ্ছে ভোটার তালিকার ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ সংক্রান্ত প্রক্রিয়া। শুনানি নিয়ে নির্বাচন কমিশনের কোনও স্পষ্ট লিখিত নির্দেশিকা নেই— এই দাবি করলেও প্রশাসনের অন্দরেই ভিন্ন সুর শোনা যাচ্ছে। আধিকারিকদের একাংশের বক্তব্য, সরাসরি নির্দেশ না এলেও কমিশন পরোক্ষভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে, যাঁদের ক্ষেত্রে লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি ধরা পড়েছে, তাঁদের শুনানি করতেই হবে। সেই অনুযায়ী মঙ্গলবার থেকেই বিভিন্ন এলাকায় শুনানি প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে।

কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়। প্রশাসনিক মহলের একাংশের মতে, হাতে থাকা সীমিত সংখ্যক কর্মী ও আধিকারিক দিয়ে এত বিপুল সংখ্যক শুনানি সামলানো কার্যত অসম্ভব। সেই কারণেই ইতিমধ্যেই বিভিন্ন দপ্তর থেকে অতিরিক্ত কর্মী নেওয়ার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। জেলা প্রশাসনের তরফে প্রয়োজন হলে কাজে লাগানোর জন্য আধিকারিকদের নামের তালিকাও তৈরি করে রাখা হয়েছে।

Advertisement

এদিকে নির্বাচন কমিশনের একটি নির্দেশিকায় জানানো হয়েছে, নন-ম্যাপিং ও লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি সংক্রান্ত শুনানিতে যাঁরা ভিন রাজ্য বা ভিন দেশে রয়েছেন, তাঁদের পরিবারের প্রতিনিধি পরিচয়পত্রের প্রমাণ দিয়ে শুনানিতে অংশ নিতে পারবেন। এই সিদ্ধান্তে কিছুটা স্বস্তি মিললেও, বাস্তবে শুনানির চাপ কমছে না বলেই মত প্রশাসনের।

Advertisement

এদিকে পূর্ব মেদিনীপুরে পরিস্থিতি আরও জটিল। প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, শুধু হলদিয়া মহকুমাতেই লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির সংখ্যা প্রায় এক লক্ষ। নন্দীগ্রাম বিধানসভা এলাকায় এই সংখ্যা প্রায় ৪৭ হাজার। গোটা জেলায় মিসম্যাচ ভোটারের সংখ্যা প্রায় ৪ লক্ষের কাছাকাছি। এত অল্প সময়ে এত বিপুল সংখ্যক শুনানি কী ভাবে সম্পন্ন হবে, তা নিয়েই দুশ্চিন্তায় প্রশাসনের একাংশ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিডিও বলেন, ‘পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখেই অন্য দপ্তরের আধিকারিকদের একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। জেলা প্রশাসন থেকে যে রকম নির্দেশ আসবে, সেই অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ হলদিয়ার মহকুমা শাসক তীর্থঙ্কর বিশ্বাস জানিয়েছেন, ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির ক্ষেত্রে নোটিস ইস্যু করার কাজ ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে।’

পশ্চিম মেদিনীপুরেও ছবিটা প্রায় একই। জেলা নির্বাচন দপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, ভোটার তালিকায় তথ্যগত অসঙ্গতি ও লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির কারণে প্রায় এক লক্ষ ভোটারকে নতুন করে শুনানির নোটিস পাঠানো হচ্ছে। জেলার মোট মিসম্যাচ ভোটারের সংখ্যা প্রায় ৪ লক্ষ ৫৮ হাজার। যদিও এর মধ্যে বহু ভোটারের নথি ইতিমধ্যেই বিএলও-রা যাচাই করে আপলোড করেছেন, তবু প্রায় এক লক্ষ ক্ষেত্রে সরাসরি শুনানির প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

প্রশাসনের দাবি, মূলত যাঁদের নাম ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় রয়েছে, কিন্তু বাবা-মায়ের নামের বানানে গরমিল, মাঝের অংশ বাদ পড়া (যেমন— কুমার, চন্দ্র) অথবা বয়স সংক্রান্ত অসঙ্গতি রয়েছে, তাঁদেরই ডাকা হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে খড়গপুর বিধানসভার অন্তর্গত মেদিনীপুরের আবাস এলাকায় একটি ঘটনায় দেখা গিয়েছে, ২০০২ সালের তালিকা অনুযায়ী এক ভোটার ও তাঁর মায়ের বয়সের পার্থক্য মাত্র সাত বছর। ওই ভোটার সুদর্শন সামন্তের বক্তব্য, ‘আমার মায়ের বয়স প্রায় ৯০ বছর। পুরনো নথির অভাবে ভোটার ও আধার কার্ডে বয়স কম নথিভুক্ত হয়েছিল। সেই কারণেই এই সমস্যা। সব কাগজ নিয়ে শুনানিতে যাব।’

এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে। মেদিনীপুরের দেবাশিস মাইতির কথায়, ‘বছরের পর বছর ভোট দিচ্ছি। শুধু বাবার নামের বানান ভুল হওয়ায় শুনানিতে যেতে হচ্ছে।’ ডেবরার রিনা দাস বলছেন, ‘ভোটার কার্ড থাকা সত্ত্বেও বার বার কাগজপত্র নিয়ে ডাকা হলে ভোগান্তি বাড়ে।’

তবে জেলা প্রশাসন আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছে। জেলাশাসক বিজিন কৃষ্ণা বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ীই কাজ হচ্ছে। যাঁদের তথ্যে অসঙ্গতি রয়েছে, তাঁদের শুনানিতে ডাকা হবেই। এতে আতঙ্কের কিছু নেই। প্রয়োজনীয় নথি নিয়ে এলে সমস্যা হবে না।’ তবু বিপুল সংখ্যক শুনানি ও সীমিত সময়— এই দুইয়ের সংঘাতে আগামী দিনে প্রশাসনিক চাপ যে আরও বাড়বে, তা মানছে প্রশাসনের একাংশ।

Advertisement