দেশের অর্থনীতির অদৃশ্য স্তম্ভ হলেন পরিযায়ী শ্রমিকরা। নির্মাণক্ষেত্র, কলকারখানা, ইটভাটা, হোটেল, গৃহস্থালি কাজ— সবখানেই তাঁদের শ্রমে দাঁড়িয়ে আছে শহরের স্বচ্ছন্দ জীবন। অথচ এই বিপুল জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিয়ে রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি আজও প্রায় উপেক্ষামূলক। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই অবহেলারই নির্মম সাক্ষ্য দিচ্ছে।
পরিযায়ী শ্রমিক মানেই অনিশ্চয়তা। কাজের সন্ধানে এক রাজ্য ছেড়ে অন্য রাজ্যে যাওয়া, অচেনা ভাষা ও সংস্কৃতির মধ্যে টিকে থাকার সংগ্রাম, ন্যূনতম মজুরি থেকে বঞ্চিত হওয়া— এ সবই তাঁদের নিত্যদিনের বাস্তবতা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও এক ভয়ংকর প্রবণতা– সন্দেহের রাজনীতি। বিশেষ করে বাংলাভাষী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে ‘বিদেশি’, ‘বাংলাদেশি’ তকমা সেঁটে দেওয়া, পরিচয়পত্র নিয়ে হয়রানি, বেআইনি আটক এমনকি জোরপূর্বক সীমান্তের ওপারে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ বারবার উঠে আসছে।
এখানে প্রশ্নটা কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতার নয়, এটি সরাসরি মানবাধিকারের প্রশ্ন। সংবিধান প্রত্যেক নাগরিককে স্বাধীনভাবে চলাচল ও জীবিকা নির্বাহের অধিকার দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সেই অধিকার কতটা সুরক্ষিত? ভাষা, পোশাক বা উচ্চারণের ভিত্তিতে যদি কাউকে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তবে তা শুধু একজন শ্রমিকের অপমান নয়— এটি রাষ্ট্রের আইনি ও নৈতিক কাঠামোর উপরই আঘাত।
পরিযায়ী শ্রমিকদের সমস্যা নতুন নয়। কোভিড অতিমারির সময় দেশ দেখেছে, কীভাবে লক্ষ লক্ষ শ্রমিক পায়ে হেঁটে শত শত কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে বাধ্য হয়েছিলেন। তখন প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল— ডেটাবেস তৈরি হবে, সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে, স্বাস্থ্য ও বাসস্থানের অধিকার সুরক্ষিত হবে। কিন্তু অতিমারি কেটে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সেই প্রতিশ্রুতির অধিকাংশই ফাইলবন্দি হয়ে পড়েছে।
আজ পরিস্থিতি আরও জটিল। একদিকে কাজের বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক মেরুকরণ শ্রমিকদের আরও অসহায় করে তুলছে। পরিযায়ী শ্রমিক যেন কেবল শ্রমশক্তি— মানুষ নন। তাঁদের নাগরিক পরিচয় প্রশ্নবিদ্ধ, অথচ তাঁরা যে কর দেন, অর্থনীতিতে অবদান রাখেন, সেই সত্যটি স্বীকার করার আগ্রহ নেই প্রশাসনের একাংশের।
মানবাধিকার কেবল আন্তর্জাতিক সম্মেলনের ভাষণ বা সংবিধানের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকার বিষয় নয়। তার বাস্তব প্রয়োগই আসল পরীক্ষা। কোনও শ্রমিককে বেআইনি আটক করা হলে, তাঁর আইনি সহায়তা পাওয়ার অধিকার আছে। ভাষাগত সংখ্যালঘু হওয়ার কারণে যদি তাঁকে আলাদা করে নিশানা করা হয়, তবে সেটি স্পষ্ট বৈষম্য। এই বৈষম্য রাষ্ট্র নিজে প্রশ্রয় দিলে তার পরিণতি সুদূরপ্রসারী।
আরও উদ্বেগের বিষয় হল, এই সব ঘটনার বিরুদ্ধে মূলধারার প্রতিবাদ ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে। শ্রমিকদের কণ্ঠস্বর দুর্বল, কারণ তাঁদের সংগঠন নেই, সামাজিক পুঁজি নেই। সংবাদমাধ্যমের একাংশও বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে অনাগ্রহী। ফলে প্রশাসনিক অন্যায় অনেক সময়ই অন্ধকারে থেকে যায়।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিযায়ী শ্রমিকদের সুরক্ষা মানে কেবল মানবিকতা নয়, এটি সংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। অভিন্ন শ্রম আইন, কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা, আন্তঃরাজ্য সমন্বয় এবং সর্বোপরি প্রশাসনিক সংবেদনশীলতা— এই চারটি স্তম্ভ ছাড়া পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়। ভাষা বা আঞ্চলিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী ভাবার প্রবণতা বন্ধ না হলে, আগামী দিনে এই সংকট আরও গভীর হবে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা সহজ অথচ কঠিন– রাষ্ট্র কি তার শ্রমিকদের শুধু প্রয়োজনের সময় কাজে লাগাবে, নাকি নাগরিক হিসেবে সম্মানও দেবে? পরিযায়ী শ্রমিকদের মানবাধিকার রক্ষা করা কোনও বিশেষ গোষ্ঠীর দাবি নয়— এটি গণতন্ত্রের ন্যূনতম শর্ত। এই শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে, উন্নয়নের সমস্ত দাবি ফাঁপা স্লোগান হয়েই থেকে যাবে।
Advertisement