ডিজিটাল ও আধুনিকতার এই সময়েও গ্রামবাংলার বহু মানুষ আজও ন্যূনতম স্বাস্থ্য পরিষেবা থেকে বঞ্চিত। বিশেষ করে নারীদের কিছু শারীরিক সমস্যা সামাজিক সংকোচ ও আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে আড়ালেই থেকে যায়। সেই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতায় সেবাশ্রয় ২ প্রকল্পের মডেল শিবিরে এক ঐতিহাসিক উদ্যোগের সাক্ষী থাকল সাধারণ মানুষ। ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপস্থিতিতে এই শিবিরে প্রথমবারের মতো চালু হল নারীদের জন্য বন্ধ্যাত্ব সংক্রান্ত বিশেষ চিকিৎসা পরিষেবা, যা এই অঞ্চলের স্বাস্থ্য পরিষেবায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল।
ফলতা বিধানসভার অন্তর্গত হরিণডাঙা বিডিও অফিস প্রাঙ্গণে আয়োজিত এই সেবাশ্রয় শিবিরে সকাল থেকেই মানুষের ভিড় চোখে পড়ার মতো ছিল। দূরদূরান্ত থেকে আসা মানুষ চিকিৎসার আশায় লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সাধারণ রোগ নির্ণয়ের পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের উপস্থিতিতে একাধিক জটিল রোগের পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে এদিনের শিবিরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন ছিল নারীদের বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসা পরিষেবার সূচনা। এতদিন এই ধরনের চিকিৎসা শহরের বড় বড় হাসপাতালে সীমাবদ্ধ থাকলেও, সেবাশ্রয় প্রকল্পের মাধ্যমে তা গ্রামাঞ্চলের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া হল।
Advertisement
শিবির পরিদর্শনের সময় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “স্বাস্থ্য পরিষেবা মানুষের মৌলিক অধিকার। বিশেষ করে নারীদের এমন কিছু শারীরিক সমস্যা রয়েছে, যেগুলো নিয়ে সমাজে এখনও লজ্জা আর ভয়ের আবরণ রয়েছে। সেই ভয় ভাঙতেই সেবাশ্রয়। চিকিৎসা মানেই শুধু ওষুধ নয়, সম্মান আর ভরসাও।” তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, সরকার ও দলের উদ্যোগ মানুষের জীবনের বাস্তব সমস্যার সমাধানে কতটা আন্তরিক।
Advertisement
তিনি আরও বলেন, “গ্রামের গরিব মেয়েরা যেন শুধুমাত্র টাকার অভাবে বা সামাজিক চাপে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হন, সেটাই আমাদের লক্ষ্য। সেবাশ্রয় প্রকল্প সেই লক্ষ্যেই কাজ করছে।” অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায় বারবার উঠে আসে মানবিক প্রশাসনের ধারণা, যেখানে নীতির পাশাপাশি সংবেদনশীলতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই শিবিরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন তাঁর আপ্ত সহায়ক সুমিত রায় এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনার জেলা পরিষদের দপ্তরের কর্মাধ্যক্ষ জাহাঙ্গীর খান। দু’জনেই শিবিরের বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে দেখেন এবং চিকিৎসা পরিষেবার ব্যবস্থাপনা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেন। স্থানীয় নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক আধিকারিকদের উপস্থিতিতে শিবিরের সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন সাংসদ।
শিবিরে যাওয়ার পথেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মানবিক রূপ আরও একবার সামনে আসে। ফলতার রাস্তার ধারে এক বৃদ্ধা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি নিজের কনভয় থামিয়ে তাঁর খোঁজ নেন। নিজে কাছে গিয়ে বৃদ্ধার সঙ্গে কথা বলেন এবং দ্রুত তাঁকে সেবাশ্রয় শিবিরে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। শিবিরে পৌঁছনোর পর চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে ওই বৃদ্ধার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। এই ঘটনা উপস্থিত মানুষদের মনে গভীর ছাপ ফেলে। অনেকেই বলেন, একজন জনপ্রতিনিধির কাছ থেকে এমন তাৎক্ষণিক সহানুভূতি আজকের দিনে খুবই বিরল।
ফলতার সেবাশ্রয় শিবিরে এই ঘটনা যেন পুরো উদ্যোগের মূল দর্শনকেই তুলে ধরল। এখানে চিকিৎসা শুধুই একটি পরিষেবা নয়, বরং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর একটি মাধ্যম। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ জানান, আগে এই ধরনের সমস্যার জন্য কলকাতা বা দূরের হাসপাতালে যেতে হত। এখন নিজের এলাকাতেই বিনামূল্যে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ পাওয়ায় তাঁরা আশাবাদী।
সেবাশ্রয় ২ প্রকল্পের মাধ্যমে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক মডেল শিবির আয়োজন করা হচ্ছে। এই প্রকল্পের লক্ষ্য শুধু রোগ নিরাময় নয়, বরং স্বাস্থ্য সচেতনতা গড়ে তোলা এবং সামাজিক বাধা ভেঙে মানুষকে চিকিৎসার আওতায় আনা। ফলতার শিবিরে নারীদের বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসা পরিষেবা চালু হওয়া সেই বৃহত্তর লক্ষ্যকেই আরও শক্তিশালী করল।
শিবির শেষে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “রাজনীতি মানে শুধু ভাষণ নয়, মানুষের কষ্ট বোঝা। যতদিন মানুষের পাশে থাকতে পারব, ততদিন এই ধরনের উদ্যোগ চলবে।” তাঁর এই মন্তব্যে উপস্থিত মানুষদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়।
Advertisement



