• facebook
  • twitter
Sunday, 1 February, 2026

নবনীতা দেবসেন দেখিয়ে দিয়েছেন ‘আমি নারী / আমি সব পারি’

জানিয়েছেন অমর্ত্যের অনেক আগেই তা পাওয়ার ছিল। অবশ্য সেখানেও তাঁর আত্মপ্রত্যয়ী সংযমের প্রকাশ নানাভাবে বিকশিত হয়েছে। অমর্ত্য সেনকে নিয়ে প্রবন্ধ লিখেছেন।

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

স্বপনকুমার মণ্ডল

আধুনিক বিশ্ব নারীদের অধিকার নিয়ে যতই সোচ্চার গর্জে উঠুক, পুরুষ শাসিত ও শোষিত সমাজে তার অস্তিত্ব এখনও সঙ্গীন, এখনও অমানবিক। নারীপুরুষের বৈষম্যবোধ এখনও আভিজাত্য লাভ করে। অন্যদিকে বিদ্রোহ উৎকর্ষ লাভে বিপ্লবের পথকে প্রশস্ত করে তোলে। সেক্ষেত্রে বিদ্রোহের সরবতাই বিপ্লবের আগমনিবার্তা বয়ে আনে। অথচ সেই সরবতায় উচ্চকিত না হয়েও যে বৈপ্লবিক চেতনার বিস্তার করা যায়, তা নারীবাদী লেখিকা নবনীতা দেবসেন দেখিয়ে দিয়েছেন। সেখানে তাঁর নীরব সাধনা শুধু বিস্ময় জাগায় না, শ্রদ্ধায় আনত করে তোলে। নারীবাদী লেখিকা হিসাবে কখনই তিনি সোচ্চার হয়ে ওঠেননি। অথচ তার অবকাশ ছিল। সুউচ্চতর শিক্ষাদীক্ষা ও বহুমুখী সৃজনীপ্রতিভায় তাঁর প্রবল ব্যক্তিত্বের বনেদি প্রকৃতিতে তা আপনাতেই সরব হয়ে ওঠার যথেষ্ট পরিসর ছিল। শুধু তাই নয়, তাঁর পরিবারের মধ্যেই তার রসদ ছিল।

Advertisement

নবনীতার মা রাধারাণী দেবীই (১৯০৩-১৯৮৯) ছিলেন রক্ষণশীল পুরুষশাসিত সমাজের প্রগতিশীল নারীকণ্ঠের উজ্জ্বল প্রতিভূ। বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে কলকাতায় কংগ্রেসের অধিবেশনে আয়োজিত বিতর্কসভায় ‘ডিভোর্স উচিত কিনা’ বিষয়ে অনুরূপা দেবীর বিপক্ষ বক্তব্যকে খণ্ডন করে তাঁর সপক্ষে জোরালো বক্তব্য উপস্থাপন করে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন তেরো বছরে বাল্যবিধবা রাধারাণী দেবী। কবি-সাহিত্যিকদের সঙ্গে আত্মসম্মান বজায় রেখেই তিনি নিয়মিত সাহিত্যচর্চা করেছেন। সেখানে তিনি শরৎচন্দ্রদের আপত্তিকে অতিক্রম করে নারী হিসাবে ‘রবিবাসর’-এর সাহিত্যের আড্ডাতে তাঁর অধিকার প্রতিষ্ঠা করেই ক্ষান্ত হননি, নারীকণ্ঠেও তাঁর আত্মমর্যাদাবোধকে দিয়েছেন বনেদি আভিজাত্য। রাধারানী দেবী ‘অপরাজিতা’ ছদ্মনামে কাব্যচর্চা করে সাড়া জাগিয়েছিলেন এবং প্রমথ চোধুরীর নারীদের নিজস্ব লেখা যা পুরুষেরা লিখতে না পারার প্রত্যাশাকে তিনিই পূরণ করেছিলেন। ‘অপরাজিতা’র আড়ালে কে রয়েছেন, অনেকদিন তাঁর পরিচয় জানা যায়নি। অন্যদিকে তাঁর কাব্যচর্চার উৎকর্ষ ছিল ক্রমশ শ্রীবৃদ্ধিমান। ‘পুরবাসিনী’(১৯৩৫) কাব্যে তা আরও তীব্র কৌতূলের বিষয় হয়ে ওঠে। কাব্যটি কোনও পুরুষ কবির লেখা সম্ভব নয় বলে প্রমথ চোধুরীই জানিয়ে দেন। কাব্যটি আবার রাধারানী দেবী ও নরেন্দ্রনাথ দেবকে উৎসর্গিত। শেষে অপরাজিতা রাধারানী দেবীর সাক্ষাৎ মেলে।

Advertisement

অন্যদিকে, সাহিত্যিক নরেন্দ্রনাথ দেবের ‘কাব্য-দীপালি’ পত্রিকাটি সম্পাদনায় সাহায্য করতে গিয়ে তাঁদের মধ্যে হার্দিক সম্পর্ক বিবাহে গড়িয়ে যায়। দু’জনের বয়সে পনেরো বছরের ব্যবধান । তার উপর পারস্পরিক প্রতিকূল আবহ। সে-সব শুধু উপেক্ষিতই হল না, কন্যাসম্প্রদানেও নজির তৈরি করল। বরকে কেউ সম্প্রদান করে না। অতএব নিজেই নিজেকে সম্প্রদান করেন রাধারানী। ১৯৩১-এ ৩১মে সেই বিয়ের পরের দিন সংবাদপত্রে লেখা হয় ‘রাধারানী-নরেন্দ্র দেব বিবাহ: কন্যার আত্মসম্প্রদান’। সেই রাধারানীর প্রথম সন্তানের শৈশবেই অকালপ্রয়াণ হওয়ায় নরেন্দ্র দেব কলকাতার হিন্দুস্থান পার্কে স্বাস্থ্যকর খোলামেলা আবহাওয়ায় ‘ভালো-বাসা’ নামে নতুন আবাস গড়ে তোলেন। সেই ‘ভালো-বাসা’র মুক্ত ও প্রশস্ত পরিসরেই তাঁদের ‘খুকু’ তথা শরৎচন্দ্রের ‘অনুরাধা’ শেষে রবীন্দ্রনাথের ‘নবনীতা’র বেড়ে ওঠা, গড়ে তোলা জীবনে আপনাতেই তাঁর ডানপিটে প্রকৃতির পরশে নারীবাদী চেতনার প্রকাশ ছিল সময়ের প্রতীক্ষা। শুধু তাই নয়, তিনি যে তাঁর মায়েরই মেয়ে, সেকথার স্পষ্টবাক্‌মূর্তি তাঁর কথাতেই শুধু প্রতিমায়িত হয়নি, সুযোগ্যা উত্তরসূরি হিসাবেও সমীহ আদায় করে নিয়েছেন। অথচ তাঁর নারীবাদী চেতনায় কোনো রূপ উগ্র প্রকাশ নেই। সেখানেও মেয়ের মধ্যে মায়ের মূল্যবোধ নিবিড় হয়ে উঠেছে। সুদীর্ঘকাল সেই মায়ের ছায়াতেই শ্রীবৃদ্ধি লাভের অবকাশ মিললেও তাঁর প্রকাশে উগ্রতার প্রকাশ ঘটেনি।

নবনীতা শিক্ষাশোভন বনেদি পরিসরে তাঁর মেধা ও মননকে ক্রমশ উচ্চশিক্ষার অভিজাত সোপানে নিজেকে বিস্তার করেছিলেন। লেডি ব্রেবোর্ণ কলেজ থেকে প্রেসিডেন্সি কলেজ, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়, ইণ্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয় (পিএইচডি) থেকে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য শিক্ষা ও গবেষণার ব্যাপ্তিই শুধু নয়, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে সুদীর্ঘকাল (১৯৭৫-২০০২) অধ্যাপনার পাশাপাশি আমেরিকার কলোরাডো কলেজে মেটাগ প্রফেসর থেকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে রাধাকৃষ্ণণ স্মারক লেকচারার সর্বত্র বিদ্যাচর্চায় স্বমহিমার বিস্তার। শুধু তাই নয়, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্যের প্রথম ছাত্রীটি (রোল নম্বর ছিল ১) প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েই আত্মতৃপ্ত হয়ে পড়েননি, স্বভাবসুলভভাবেই নিজেকে উচ্চশিক্ষার সোপানে সামিল করেছিলেন। হিন্দি, ওড়িয়া, অসমিয়া, সংস্কৃত, ফারসি, জার্মান, হিব্রু এবং ইংরেজি প্রভৃতি ভাষায় তাঁর বিদুষী প্রকৃতির অনন্যতা আপনাতেই সবুজ সজীবতা লাভ করে। ব্যক্তিত্বের বহুমুখী বিস্তারে নবনীতা রাধারানীকেও ছাড়িয়ে যান। লেখনীপ্রতিভার বহুমুখী চলনেও তাঁর স্বকীয় প্রতিভা প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর অবিসংবাদিত নারীব্যক্তিত্বের উৎকর্ষমুখর প্রকৃতি মহার্ঘ পুরস্কার-সম্মাননায় (‘পদ্মশ্রী’, ‘সাহিত্য অকাদেমি, বিদ্যসাগর পুরস্কার, দেশিকোত্তম প্রভৃতি) স্বীকৃতি লাভ করে। অথচ অভিভাবকীয় ব্যক্তিত্বের আধারেও নবনীতার নারীবাদের প্রচার-প্রসারে কোনও রকম বিদ্রোহী ভাবের অবকাশ ছিল না। সেখানে তাঁর সংযমী প্রকৃতির আন্তরিকতা ও আত্মপ্রত্যয়ী মানসিকতা তাঁকে নীরবে বিপ্লবের পথে সওয়ারি করেছিল। তাঁর মধ্যে পুরুষশাসিত সমাজে নারীদের বৈষম্যপীড়িত জীবনবোধে বলিষ্ঠ প্রতিবাদী চেতনায় নারীবাদের পরিচয় নানাভাবেই প্রকাশমুখর।

শুধু তাই নয়, তাঁর মননে ও সৃজনেও তার পরিচয় নানাভাবেই উঠে এসেছে। ছোটবেলায় ছোট ভাই দিদিকে মারলেও দিদি মারতে পারবে না, দিদিকে তা সহ্য করার চেতাবনির মধ্যে তাঁর মেয়েদের অন্যচোখে দেখার চেতনা জেগে উঠেছিল । সমাজে পুরুষের আধিপত্যে নারীদের আনুগত্যবোধের মধ্যে তাঁর প্রতিবাদী চেতনাই তাঁর বৈদগ্ধ্যপূর্ণ বনেদি অবস্থানে আত্মপরিচয়ের সোপান হয়ে উঠতে পারত। সেখানে তাঁর আমৃত্যু ডাকাবুকো চরিত্রপ্রকৃতিই তার সঙ্গতের পক্ষে যথেষ্ট সরব ছিল। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বাংলায় ডানপিটে ছেলের অভাব নেই।
অন্যদিকে ডানপিটে মেয়ের কথা একমাত্র সিনেমার ধন্যিমেয়ের মধ্যেই দৃশ্যমান। সমাজে যে তাঁর ঠাঁই নেই। অথচ বাংলার সেই রক্ষণশীল সমাজে নবনীতাই আজীবন ডানপিটে পরিচয়ে সমুজ্জ্বল ছিলেন। নিজের মতো করে বেঁচেছেন হার না-মানা প্রকৃতিতে। সেখানে তাঁর পৌরুষদীপ্ত ভাবমূর্তি ছিল সমান সচল। হাসতে হাসতে এককাপড়ে ট্রাকে চড়ে অরুণাচল সীমান্তে ভারত-চিনের ম্যাকমোহন লাইন ছুঁয়ে এসেছিলেন। তাঁর ভ্রমণকাহিনি ‘ট্রাকবাহনে ম্যাকমোহনে’। আবার হায়দ্রাবাদে সেমিনারে গিয়ে কুম্ভমেলায় ছুটে গিয়েছেন একাকী।

তাঁর লেখনীর পরশে তাই ‘করুণা তোমার কোন পথ দিয়ে’ ভ্রমণসাহিত্যে প্রতিমায়িত হয়েছে। এভাবে দুরারোগ্য ব্যাধিকে উপেক্ষা করে বেরিয়ে পড়েছেন পৃথিবীর দুর্গম পথে, বাংলা সাহিত্যে তাঁর বিচিত্র অভিজ্ঞতার অসংখ্য ফসল ফলিয়েছেন অবলীলায়। সেখানে তাঁর অপরাজিতা প্রকৃতির লাগামছাড়া চলনের মতোই জীবনকে তিনি ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। স্বাধীনতাপ্রিয় নবনীতার আপসহীন যাপনে অবশ্য স্বেচ্ছাচারের বিকার ছিল না। এজন্য তাঁর আত্মপ্রত্যয়ী মানসিকতায় সংযমের পরাকাষ্ঠা যেমন লক্ষণীয়, তেমনই তাঁকে আত্মম্ভরিতায় বিদ্রোহে সামিল করেনি। বরং আত্মসংযমী প্রকৃতির উদারতায় তাঁর নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গির অনন্যতা লক্ষণীয়৷ সে শিক্ষাও তাঁর মায়ের কাছেই পেয়েছিলেন। রাধারাণী দেবী মেয়েকে আঁচলে করে মানুষ না করলেও প্রেমে স্বাধীনতা দিয়েও তাঁর যাপনের সীমারেখা টেনে দিয়েছিলেন। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় অমর্ত্য সেনের সঙ্গে নবনীতার প্রেম নিবিড় হয়ে ওঠে। সেখানে মেয়ের প্রতি মায়ের নির্দেশ ছিল : ‘তিনটি জায়গায় যাওয়া যাবে না। পর্দা টাঙানো কেবিনওয়ালা রেস্তরাঁয়, সন্ধ্যার পরে লেকের ধারে আর সিনেমায়।’ সেই প্রেম বিবাহে গড়ায় ১৯৫৯-এ এবং সতেরো বছর পর ১৯৭৬-এ বিবাহবিচ্ছেদও ঘটে। অথচ সেই আঘাত নবনীতাকে নারীবাদী বিদ্রোহে সক্রিয় করেনি। বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ অটুট ছিল আজীবন। ১৯৯৮-এ অমর্ত্য সেনের নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তিতে নবনীতার আনন্দোচ্ছ্বাসে অভাব ছিল না। তা নিয়ে সাক্ষাৎকারও দিয়েছেন সহাস্যে।

জানিয়েছেন অমর্ত্যের অনেক আগেই তা পাওয়ার ছিল। অবশ্য সেখানেও তাঁর আত্মপ্রত্যয়ী সংযমের প্রকাশ নানাভাবে বিকশিত হয়েছে। অমর্ত্য সেনকে নিয়ে প্রবন্ধ লিখেছেন। আবার সে-সময়ের প্রেক্ষিতে একটি স্মরণীয় ছোটগল্পও লেখেন ‘জরা হটকে, জরা বাঁচকে, ইয়ে হ্যায় নোবেল মেরি জান’। অন্যদিকে সেই সময়ে তাঁর সমসাময়িক বলিষ্ঠ নারীকণ্ঠ কবিতা সিংহের মৃত্যুতেও শোকপ্রকাশে এগিয়ে গিয়েছেন। সর্বত্র তাঁর স্বচ্ছন্দ বিচরণ, স্বাধীনচেতা মনের প্রকাশ, বিদ্রোহহীন বিপ্লবের প্রয়াস আজীবন সচল ছিল। সেক্ষেত্রে তাঁর অস্তিত্বে ‘আমি নারী/ আমি সব পারি’র একাই একশো আমাদের শ্রদ্ধা আদায় করে নেয় ।

Advertisement