আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য নিরলস লড়াই, যুদ্ধাপরাধের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান এবং মানবাধিকার রক্ষার দীর্ঘ সংঘর্ষকে কুর্নিশ জানিয়ে ২০২৬ সালের শান্তিতে নোবেল পুরস্কারে (Nobel Peace Prize) ভূষিত করা হল বিশিষ্ট আইনজ্ঞ ও মানবাধিকার কর্মী নাভানেদেম ‘নাভি’ পিল্লাইকে (Navi Pillay)। নরওয়ের নোবেল কমিটির তরফে জানানো হয়েছে, বিশ্বজুড়ে যুদ্ধপীড়িত অঞ্চলে শান্তি ফিরিয়ে আনা, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচার সুনিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার ব্যবস্থার মূল ভিতকে শক্তিশালী করার অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবেই পিল্লাইকে শান্তি পুরস্কার দেওয়া হল।
বিশ্বমঞ্চে দক্ষিণ আফ্রিকার নাগরিক হিসেবে পরিচিত হলেও, এই প্রবাদপ্রতিম আইনজ্ঞের শিকড় রয়েছে ভারতে। তাঁর এই বিশ্বজোড়া স্বীকৃতিতে দক্ষিণ আফ্রিকার পাশাপাশি গর্বিত ভারত এবং সারা বিশ্বের তামিল ডায়াসপোরাও।
BREAKING NEWS The Norwegian Nobel Committee has decided to award the 2026 #NobelPeacePrize to Navanethem “Navi” Pillay for her efforts to promote peace and international law. #NobelPrize https://t.co/97vurspw6z
— The Nobel Prize (@NobelPrize) October 9, 2026
শিকড়ের গল্প
১৯৪১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে জন্ম নেন নাভি পিল্লাই। তাঁর পরিবার ছিল এক সাধারণ ভারতীয় তামিল অভিবাসী পরিবার। নাভির পূর্বপুরুষেরা ভারতের তামিলনাড়ু থেকে কাজের সন্ধানে দক্ষিণ আফ্রিকায় পাড়ি জমিয়েছিলেন। তাঁর বাবা ছিলেন একজন সাধারণ বাসচালক। তৎকালীন শ্বেতাঙ্গ সরকারের চরম বর্ণবৈষম্যমূলক ‘অ্যাপার্থাইড’ (apartheid) শাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়েও নাভির পড়াশোনা থামেনি।
স্থানীয় ভারতীয় সম্প্রদায়ের অর্থসাহায্যে তিনি নাটাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনের পাঠ নেন এবং পরবর্তী কালে হার্ভার্ড ল স্কুল (Harvard Law School) থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। সেই সময় দক্ষিণ আফ্রিকায় অ-শ্বেতাঙ্গ নারীদের জন্য আইন পেশার দরজা ছিল কার্যত বন্ধ। সমস্ত সামাজিক ও বর্ণবাদী প্রতিবন্ধকতা চূর্ণ করে ১৯৬৭ সালে তিনিই প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ ও ভারতীয় বংশোদ্ভূত নারী হিসেবে নাটালে নিজস্ব আইনি ফার্ম খোলেন। রবেন দ্বীপে বন্দি নেলসন ম্যান্ডেলার অনুগামীদের হয়ে আইনি লড়াই চালানো থেকে শুরু করে রাজনৈতিক বন্দিদের নির্যাতন বন্ধের দাবিতে তাঁর লড়াই বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হয়েছিল।
ধর্ষণকে গণহত্যার স্বীকৃতি
আন্তর্জাতিক আইনের ইতিহাসে নাভি পিল্লাইয়ের নাম চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে একটি যুগান্তকারী রায়ের জন্য। রোয়ান্ডা গণহত্যার বিচারে গঠিত রাষ্ট্রপুঞ্জের ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল’-এর (International Criminal Tribunal for Rwanda-ICTR) অন্যতম শীর্ষ বিচারপতি ছিলেন তিনি।
১৯৯৮ সালে জিন-পল আকায়েসু মামলায় নাভি পিল্লাই এমন এক নজিরবিহীন আইনি ব্যাখ্যা দেন, যা বিশ্ব বিচারব্যবস্থার গতিপথ বদলে দেয়। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে সংগঠিত ধর্ষণ ও যৌন হিংসাকে তিনি শুধু সাধারণ অপরাধ নয়, বরং ‘গণহত্যার অংশ’ (rape as an act of genocide) এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ (crime against humanity) হিসেবে স্বীকৃতি দেন। বিশ্ব ইতিহাসে এটিই ছিল প্রথম রায়, যেখানে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সংঘটিত যৌন হিংসাকে গণহত্যার শামিল বলে আন্তর্জাতিক স্তরে সিলমোহর দেওয়া হয়।
রাষ্ট্রসঙ্ঘের মানবাধিকার প্রধান
পরবর্তী সময়ে হেগ-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতের (International Criminal Court-ICC) গুরুত্বপূর্ণ বিচারক হিসেবে দায়িত্ব সামলান নাভি পিল্লাই। এর পর ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন রাষ্ট্রসঙ্ঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনার (UN High Commissioner for Human Rights-UNHCHR)।
সেই সময়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলির চাপ অগ্রাহ্য করে তিনি সিরিয়া, শ্রীলঙ্কা কিংবা প্যালেস্তাইনের যুদ্ধাপরাধের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। গাজায় মানবাধিকার লঙ্ঘন খতিয়ে দেখতে রাষ্ট্রসঙ্ঘের স্বাধীন তদন্ত কমিশনের (UN Commission of Inquiry) শীর্ষ পদে থেকেও তিনি ন্যায়ের সপক্ষে কথা বলেছেন নির্ভীক ভাবে। ক্ষমতাধর রাষ্ট্র বা সামরিক শক্তির রক্তচক্ষুকে পরোয়া না করে তিনি সব সময় গুরুত্ব দিয়েছেন আমজনতার বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকারকে।
শান্তি মানে স্থায়ী ন্যায়বিচার
নরওয়ের নোবেল কমিটির পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট বলা হয়েছে, শান্তি কোনও সামরিক সমঝোতা বা নিছক যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে স্থায়ী হতে পারে না। স্থায়ী শান্তির একমাত্র শর্ত হল নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা এবং মানবাধিকারের সুরক্ষা।
নাভি পিল্লাই তাঁর দীর্ঘ ছয় দশকের কর্মজীবনে দেখিয়েছেন, আন্তর্জাতিক আইন কীভাবে দুর্বল ও নিপীড়িত মানুষের ঢাল হয়ে উঠতে পারে। তাঁর নোবেল জয়ে আসলে ডারবানের তামিল বস্তি থেকে শুরু হওয়া এক লড়াকু তরুণীর যাত্রা আজ শান্তি ও ন্যায়বিচারের সর্বোচ্চ বেদিতে সম্মানিত হল।




