আমেরিকা বা অন্য বহু দেশের মতো সাধারণ মানুষের সরাসরি ভোট দিয়ে দেশের প্রধানমন্ত্রী বেছে নেওয়ার সুযোগ নেই ইজরায়েলে। ভোটাররা ভোট দেন কোনও একটা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের বাক্সে। আর সেই ভোটের পরেই শুরু হয় আসল খেলা। দরকষাকষি, জোট বা কোয়ালিশন চুক্তি এবং ৬১ আসনের ম্যাজিক ফিগার ছুঁয়ে ফেলার মরিয়া লড়াই।
অক্টোবর মাসের ২৭ তারিখ, মঙ্গলবার ইজরায়েলে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে দেশের নতুন পার্লামেন্ট বা ‘নেসেট’ (Knesset) নির্বাচন। প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর (Benjamin Netanyahu) রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম কঠিন এই নির্বাচনী লড়াইয়ের আবহে ইজরায়েলের অদ্ভুত ও জটিল নির্বাচনী পদ্ধতি (Israel’s Electoral System) নিয়ে বিশ্বজুড়েই কৌতূহল তুঙ্গে। কীভাবে দলীয় ভোট থেকে শুরু করে জোট গঠন আর ৬১ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ঠিক করে দেয় ইজরায়েলের আগামী দিনের চালচিত্র, পুরো বিষয়টি ধাপে ধাপে বুঝে নেওয়া যাক।
ভোটাররা পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী প্রার্থীকে সরাসরি ভোট দেন না কেন?
অন্যান্য অনেক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ভোটাররা যেমন সরাসরি নিজেদের স্থানীয় প্রতিনিধি বা সরাসরি প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থীকে ভোট দেন, ইজরায়েলের পদ্ধতি সম্পূর্ণ আলাদা। ইজরায়েলে পুরো দেশটিকে একটি মাত্র একক নির্বাচনী ক্ষেত্র (Single Nationwide Constituency) হিসেবে ধরা হয়। ভোটাররা কোনও প্রার্থীর নামে ভোট দেন না, তাঁরা ভোট দেন কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের তালিকা বা প্যানেলে (Political Party or Electoral List)। প্রতিটি দল ভোটের আগেই তাদের প্রার্থীদের একটি সুনির্দিষ্ট ক্রম বা তালিকা প্রকাশ করে। দলগুলি আনুপাতিক হারে যে ক’টি আসন জেতে, সেই তালিকার ঠিক তত জন নেতাই পার্লামেন্টে প্রবেশ করেন।
পার্লামেন্টে ঢোকার প্রথম বাধা
ইজরায়েলের পার্লামেন্ট বা ‘নেসেট’-এ মোট আসন সংখ্যা ১২০। তবে চাইলেই যে কোনও ছোট দল সেখানে ঢুকে পড়তে পারে না। পার্লামেন্টে আসন পেতে হলে কোনও দলকে গোটা দেশে পড়া মোট বৈধ ভোটের অন্তত ৩.২৫ শতাংশ পেতেই হবে। এই ন্যূনতম সীমাকে বলা হয় ‘ইলেক্টোরাল থ্রেশহোল্ড’ (Electoral Threshold)। যে দলগুলি এই সীমা পার করতে পারে না, তাদের সমস্ত ভোট নষ্ট বলে গণ্য হয় এবং তারা ১২০টি আসনের একটিও পায় না।
🇮🇱🇮🇷 Netanyahu: Elect me or you will all die (basically) “On the eve of the elections, I am speaking to you from the bottom of my heart. The opposition will not eliminate Iran’s nuclear program. We cannot live with a nuclear Iran. We cannot accept this bomb because they will destroy us.” Something tells me that even if he were right, even a “more progressive” Israeli government would act! To suggest he is the only one who can protect Israel is a lie, borne out of desperation… Writer: Michael https://t.co/4KaXjiEAUs
— Mario Nawfal (@MarioNawfal) October 25, 2026
কেন কোনও একক দল সহজে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় না?
আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক ব্যবস্থা (Proportional Representation System) হওয়ার কারণে ইজরায়েলে ভোট শতাংশ অনুযায়ী দলগুলি আসন পায়। এর ফলে বহু ছোট-বড় দল পার্লামেন্টে প্রবেশ করে।
ইতিহাসে আজ পর্যন্ত ইজরায়েলে কোনও একটি একক দল কখনও নিজের জোরে ১২০ আসনের নেসেটে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। ফলে নির্বাচন শেষ হওয়ার পর সরকার গড়ার জন্য একাধিক দলের মধ্যে জোট বা কোয়ালিশন গঠন করা ছাড়া কোনও বিকল্প থাকে না।
৬১ আসনের ম্যাজিক ফিগার
১২০ আসনের নেসেটে সরকার গঠন বা মন্ত্রিসভার আস্থা ভোট জিততে হলে নুন্যতম ৬১ জন সাংসদের সমর্থন বা সংখ্যাগরিষ্ঠতা (61-Seat Majority) প্রয়োজন হয়। নির্বাচনের সবচেয়ে মজার এবং কঠিন দিক হলো, যে দল বা জোট সবচেয়ে বেশি আসন জিতেছে, সে স্বতঃসিদ্ধভাবে সরকার গড়ার সুযোগ পাবে এমন কোনও কথা নেই। ভোটের পর দেখা হয় কোন নেতা বা কোন দল বিভিন্ন ছোট-বড় দলগুলিকে এক ছাতার তলায় এনে ৬১ বা তার বেশি আসন সংখ্যা জোগাড় করতে পারছে। যার ঝুলিতে সেই ম্যাজিক ফিগার আসবে, সেই দলের নেতাই হবেন পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী।
নির্বাচনের পর সরকার গঠনের পুরো প্রক্রিয়াটি কেমন?
ভোটের ফল ঘোষণার পর থেকেই শুরু হয় ইজরায়েলের আসল রাজনৈতিক নাটক। নির্বাচনের পর ইজরায়েলের রাষ্ট্রপতি (President of Israel) পার্লামেন্টে জয়ী সমস্ত রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। কোন নেতাকে সরকার গড়ার দায়িত্ব দেওয়া যায়, তা নিয়ে দলগুলির মতামত শোনেন তিনি।
এরপর রাষ্ট্রপতি এমন একজন আইনপ্রণেতা বা দলীয় নেতাকে সরকার গঠনের দায়িত্ব বা ম্যান্ডেট দেন, যাঁর পক্ষে ৬১ আসন জোগাড় করার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি বলে মনে করা হয়। ম্যান্ডেট পাওয়ার পর সেই নেতাকে সাধারণত ২৮ দিন সময় দেওয়া হয় কোয়ালিশন চুক্তি চূড়ান্ত করার জন্য। প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতি এই মেয়াদ আরও ১৪ দিন বাড়াতে পারেন। এই সময়ের মধ্যে বিভিন্ন দলের সঙ্গে মন্ত্রিত্ব, নীতিগত সমঝোতা ও বাজেট নিয়ে দরকষাকষি চলে।
কোয়ালিশন চূড়ান্ত হওয়ার পর মনোনীত নেতাকে তাঁর নতুন মন্ত্রিসভা এবং নীতিগত কর্মসূচি নিয়ে নেসেটে হাজির হতে হয়। পার্লামেন্টে আস্থাভোটে (Vote of Confidence) জয়ী হলেই তবে নতুন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতা গ্রহণ করে এবং শীর্ষস্থানীয় দলের মনোনীত নেতা দেশের প্রধানমন্ত্রী হন।
এবারের সমীকরণ
পশ্চিম এশিয়ায় রক্তক্ষয়ী সংঘাতের জন্য নেতানিয়াহু অত্যন্ত বিতর্কিত।নিরাপত্তা সংক্রান্ত ব্যর্থতার অভিযোগে সমালোচনার মুখেও পড়েছেন তিনি। তবু বিবি ইজরায়েলের রাজনীতিতে এক দীর্ঘস্থায়ী চরিত্র। জনমত সমীক্ষা বলছে, তাঁর বর্তমান ডানপন্থী জোট হয়তো আগের মতো সহজে গদি ধরে রাখতে পারবে না। বিরোধিতার স্রোত বইছে দেশ জুড়ে।
72 hours until the election. Four years of fighting. Over 1,000 protests. Tonight, hundreds of thousands of Israelis took to the streets for the last time to say: WE ARE NOT OUR GOVERNMENT. In 3 days, Netanyahu will be history, like many tyrants before him. He and his racist, fascist clowns will face the courts on their way to jail, and Israel will belong to its people again. The insanity ends here. Israel starts the shift to a brighter future, and the rest of the world must follow! Video by Amir Goldstein
— Ami Dror 🇮🇱 עמי דרור (@AmiDror) October 24, 2026
এত কিছুর পরেও ইজরায়েলের রাজনীতির বেআব্রু সত্যিটা হলো, ভোটের বাক্সে কে কত আসন পেল তার চেয়েও বড় কথা, ভোটের পরে কে কার সঙ্গে হাত মিলিয়ে ৬১ আসনের ম্যাজিক ফিগার দেখাতে পারছে। নেতানিয়াহু হোন বা তাঁর বিরোধী কোনও শিবির, শেষ পর্যন্ত কোয়ালিশন টেবিলের কূটকচালিই নির্ধারণ করবে ইজরায়েলের পরবর্তী মসনদে কে বসছেন!




