নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ততই অশান্ত হয়ে উঠছে বাংলাদেশের পরিস্থিতি। শরীয়তপুরে এনসিপি ও ছাত্রদলের নেতা ও কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। ককটেল বিস্ফোরণে আহত হয়েছেন অন্ততপক্ষে ৮ জন। এই ঘটনায় একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙুল তুলেছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বাহিনীকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস।
পুলিশ সূত্রে খবর, ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদিকে হত্যা ও খুলনায় এনসিপি নেতা মোতাবেল শিকদারের উপর গুলির প্রতিবাদে এবং দোষী ব্যক্তিদের বিচারের দাবিতে সোমবার সন্ধ্যায় বিক্ষোভ মিছিল বের করেন এনসিপি-র নেতা-কর্মীরা। সেই মিছিলের মধ্যে ছাত্রদলের এক কর্মী মোটর সাইকেল নিয়ে ঢোকায় কথা কাটাকাটি শুরু হয়।
এর জেরেই সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। উভয় পক্ষের মধ্যে ইঁট-পাটকেল ছোঁড়া শুরু হয়। শুরু হয় ধাক্কাধাক্কি। এই সময় ৩টি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। ঘটনার জেরে ছাত্রদলের ৫ নেতা-সহ কমপক্ষে ৮ জন আহত হন। ছাত্রদলের ৫ নেতাকে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এঁদের মধ্যে নঈম ব্যাপরীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে পালং মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক শাহ আলম বলেন, ‘এনসিপি-র মিছিলে একটি মোটর সাইকেল ঢুকে পড়া নিয়ে ছাত্রদলের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। আমরা খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যাই এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনি। এই ঘটনায় অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আইনি পদক্ষেপ করা হবে।’
ছাত্রদলের তরফে সোহেল তালুকদার বাংলাদেশের এক সংবাদমাধ্যমে বলেন, ‘আমাদের ছাত্রদলের এক কর্মীকে রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় আটকে রাখেন এনসিপি-র নেতা সবুজ তালুকদার ও তাঁর সমর্থকেরা। আমরা খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে এলে আমাদের উপর হামলা চালান এনসিপি-র নেতা-কর্মীরা। এরপর তাঁরা সংঘবদ্ধভাবে অস্ত্র নিয়ে আমাদের উপর হামলা করেন। ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আতঙ্কের সৃষ্টি করা হয়। ককটেলের আঘাতে আমাদের ৬ নেতা আহত হয়েছেন।’
অন্যদিকে এনসিপি নেতা সবুজ তালুকদারের দাবি, ‘আমরা হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে ও এনসিপি নেতার উপর গুলি চালানোর প্রতিবাদে মিছিল করে যাচ্ছিলাম। ছাত্রদলের একটি ছেলে মোটর সাইকেল নিয়ে আমাদের মিছিলে ঢুকে যায় এবং আমাদের কর্মীর উপর হামলা চালায়। আমরা তাঁকে ধরে রাখলে ছাত্রদলের নেতা ও কর্মীরা আমাদের উপর দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়।’
নির্বাচনের মুখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটায় স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ বেড়েছে। প্রশ্নের মুখে পড়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। পরিস্থিতি সামাল দিতে সোমবারই সতর্কবার্তা দিয়েছেন ইউনূস। ইউনূসের বার্তার পর একই নির্দেশ দেন ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার শেখ মুহাম্মদ সাজ্জাত আলি। সোমবার ঢাকার ৫০টি থানার ওসিদের নিয়ে বৈঠক করেন তিনি।
জানা গিয়েছে, নির্বাচনের আগে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে, এমন সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে ওই বৈঠকে। নির্বাচনের আগে হিংসাত্মক ঘটনা, হামলা এবং অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা আরও ঘটতে পারে বলে বৈঠকে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ঢাকা পুলিশের আধিকারিকরা। এই আবহে আগামী দিনে সতর্ক থাকার কথা বলা হয়েছে পুলিশের বৈঠকে।
বাংলাদেশের নেতা শরীফ ওসমান হাদির মৃত্যুর পর থেকেই অশান্ত হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। ১২ ডিসেম্বর তিনি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তাঁকে সিঙ্গাপুরে উন্নত চিকিতসার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। গত বৃহস্পতিবার তাঁর মৃত্যুর খবর দেন বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস।
এরপরেই বাংলাদেশ জুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। শুরু হয় হামলা। চট্টগ্রামে ভারতীয় উপ-হাইকমিশনারের বাড়ি আক্রান্ত হয়। এর পাশাপাশি বিভিন্ন জায়গা ভাঙচুর, তাণ্ডব, অগ্নিসংযোগ করা হয়। পুলিশ এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে বেশ কয়েকজন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করে, তবে কে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে তা এখনও স্পষ্ট নয়। হামলা চালানো হয় ছায়ানট, উদীচীর মতো সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে।
১৮ ডিসেম্বর দুটি বৃহত্তম দৈনিক সংবাদপত্রের অফিসে আগুন ধরিয়ে দেয় উত্তেজিত জনতা, কর্মীদের ভিতরে আটকে রাখে। আওয়ামী লীগ অফিস, প্রাক্তন মন্ত্রীদের বাড়ি, এমনকি মুজিবুর রহমানের বাসভবনেও হামলা চালানো হয়। ময়মনসিংহে ২৫ বছর বয়সের এক হিন্দু যুবককে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এই অশান্ত পরিস্থিতির মধ্যেই সোমবার এনসিপি-র সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে বিএনপি-র ছাত্র সংগঠন। সোমবার খুলনায় গুলিবিদ্ধ হন এনসিপি নেতা মোতালেব শিকদার।
Advertisement