রনজিৎ দাস
ভারতীয় ফুটবলের মানচিত্রটা গত তিন দশকে নিঃশব্দে আমূল বদলে গেছে। একসময় যে ময়দান থেকে ভারতীয় ফুটবলের নাড়ি স্পন্দিত হতো, সেই ঐতিহ্যের কলকাতার ফুটবলে ম্যাচ ফিক্সিং প্রমানিত। অন্যদিকে, গোয়া বা কেরলের মতো তথাকথিত ফুটবল রাজ্যগুলোও আজ পিছু হঠছে। বর্তমান আইএসএল, আই-লিগ এবং অনূর্ধ্ব-২১ রিলায়েন্স ডেভেলপমেন্ট লিগের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে একটি রূঢ় সত্য বেরিয়ে আসে—ভারতীয় ফুটবলের ‘সাপ্লাইলাইন’ এখন আর গঙ্গা বা আরব সাগরের তীরে নেই, তা থিতু হয়েছে উত্তর-পূর্ব ভারতের পাহাড়ী উপত্যকায়। বর্তমানে দেশের শীর্ষ তিন পর্যায়ের লিগে প্রায় ৩৬টি ক্লাব খেলছে, যেখানে মাঠে নামার সুযোগ পেয়েছেন ৫৫০ জনের বেশি ফুটবলার। বিস্ময়কর হলেও সত্য যে, এই ফুটবলারদের প্রায় ৫০ শতাংশই উত্তর-পূর্ব ভারতের।
Advertisement
অবশিষ্ট অংশের মধ্যে বাংলা, গোয়া, পাঞ্জাব ও কেরল মিলিয়ে মাত্র ৩৫ শতাংশ। বাকি ১৫ শতাংশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে দেশের অন্যান্য রাজ্যে। অর্থাৎ, ৯০-এর দশকের পর যে পরিবর্তনের হাওয়া শুরু হয়েছিল, ২০২৫-২৬ মরসুমে এসে তা কার্যত একচেটিয়া আধিপত্যে পরিণত হয়েছে। ভারতীয় ফুটবলে একসময় ‘টাচ ফুটবল’ বা মগজনির্ভর বুদ্ধিমত্তার কদর ছিল। কিন্তু আধুনিক ফুটবলে গতির আধিক্য এবং শারীরিক সক্ষমতার গুরুত্ব বেড়ে যাওয়াতে, পাহাড়ের ফুটবলাররা তাদের সহজাত স্ট্যামিনা ও লড়াই করার মানসিকতা দিয়ে সমতলের ফুটবলারদের টেক্কা দিচ্ছে। উত্তর-পূর্বের ফুটবলারদের কাছে ফুটবল আজ কেবল শখ নয়, বরং জীবন-জীবিকার একমাত্র হাতিয়ার। এই পেশাদারিত্বই তাদের সাফল্যের চাবিকাঠি। বিবর্তনের ধারায় এমন পরিবর্তন স্বাভাবিকতায় ধরা দেয়। যেই বাংলাকে ভারতীয় ফুটবলের ভিত্তি বলা হতো, সেই বাংলার ফুটবল আজ গভীর সংকটে।
Advertisement
এশিয়ার প্রাচীনতম লিগ এখন স্রেফ নিয়মরক্ষার টুর্নামেন্টে পরিণত হয়েছে। ভরা বর্ষায় কর্দমাক্ত মাঠে খেলা ফুটবলারদের শুধু চোটের ঝুঁকিই বাড়াচ্ছে না, খেলার শৈল্পিক মানকেও ধ্বংস করে দিচ্ছে। পক্ষপাতমূলক রেফারিং এবং ক্লাব রাজনীতির গভীর শিকড় ফুটবলের স্বাভাবিক বিকাশকে রুদ্ধ করেছে। ফুটবলীয় মেধার চেয়ে এখানে লবিং অনেক সময় বেশি প্রাধান্য পায়। কেরল বা গোয়ার মতো বাংলাতেও তৃণমূল স্তরে দুর্নীতির কারণে প্রকৃত প্রতিভারা হারিয়ে যাচ্ছে সাপ্লাই লাইন থেকে।
ভারতের ফুটবল মানচিত্রের এই পরিবর্তন কেবল ভৌগোলিক নয়, বরং এটি একটি মানসিক পরিবর্তনও বটে। যখন দেশের ঐতিহ্যবাহী ফুটবল কেন্দ্রগুলো দুর্নীতি এবং অপেশাদারিত্বে ডুবে ছিল, তখন উত্তর-পূর্ব ভারত ফুটবল শিক্ষাকে ধ্যানজ্ঞান করে এগিয়ে গেছে। বাংলা বা গোয়ার মতো রাজ্যগুলোর জন্য এটি এক চরম সতর্কবার্তা। লড়াই করার মানসিকতা এবং শৃঙ্খলাপরায়ণে দৃঢ়তা–পাশাপাশি ফুটবল কাঠামোর অভাব কাটাতে না পারলে, আগামী দিনে ভারতীয় ফুটবলের জাতীয় দলে ‘বাঙালি’ বা ‘গোয়ানিজ’ পদবি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হবে।
শৈল্পিক ফুটবলের মায়াজাল ছিঁড়ে আজ ক্ষমতার ব্যাটন পাহাড়ের হাতে। এই বিবর্তন কি ভারতের বিশ্ব ফুটবলে উত্তরণের পথ প্রশস্ত করবে, নাকি ঐতিহ্যের মৃত্যুতে ভারতীয় ফুটবল তার শিকড় হারাবে—সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
Advertisement



