একসময় ভারতীয় ফুটবলের আঁতুড়ঘর বলে পরিচিত কলকাতা ময়দান এখন গভীর সংকটের মুখে। একদিকে যেমন কলকাতা প্রিমিয়ার ফুটবল লিগে বারবার ম্যাচ ফিক্সিংয়ের মতো গুরুতর অভিযোগ উঠছে, তেমনই এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলার ফুটবলের সামগ্রিক মানের উপর। যার ফলস্বরূপ জাতীয় ফুটবল দল থেকে বাংলার ঘরের ফুটবলারদের উপস্থিতি প্রায় বিলুপ্ত হতে চলেছে। যা একসময় ছিল এই রাজ্যের গর্বের বিষয়। আসলে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের কাঁটায় কলঙ্কিত ময়দান।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কলকাতা লিগের বিভিন্ন ম্যাচে গড়াপেটা বা ফিক্সিংয়ের অভিযোগ বারবার শিরোনামে উঠে এসেছে। কিছু ক্ষেত্রে ক্লাব এবং খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে পয়েন্ট বা অন্য কোনও আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে ম্যাচের ফলাফল প্রভাবিত করার অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু বাংলার ফুটবলের নিয়ামক সংস্থা আইএফএ দ্রুত এই বিষয়ে কড়া পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলছে। কিন্তু লিগে এমন অনিয়মের কটা ম্যাচকে চিহ্নিত করা গেছে,তার ঘোষনা নেই। এমন ঘটনায় ময়দানের একাধিক ক্লাবের নাম শোনা যাচ্ছে। তার বাস্তবতা বা নজরদারীতে অভাব থেকে যাচ্ছে।
Advertisement
একাধিক ফুটবলার ও সহকারী কোচের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠায় তাদের সাময়িকভাবে নির্বাসিত করা হয়েছে। গুরুতর অভিযোগের ভিত্তিতে আইএফএ কলকাতা পুলিশের দ্বারস্থ হয়েছে এবং ফিক্সিংয়ের ঘটনাগুলির তদন্তভার পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে। আবার ওয়াকওভার বিতর্ক অন্য কথা বলছে। শুধু ফিক্সিং নয়, লিগের মধ্যে কিছু ক্লাবের ওয়াকওভার দেওয়ার প্রবণতাও ‘উদ্দেশ্য-প্রণোদিত’ বলে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। যা প্রকারান্তরে এক ধরনের ম্যাচ গড়াপেটার শামিল বলে মনে করা হচ্ছে। মোহনবাগান ক্লাব তাদের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ মেসারার্সের বিরুদ্ধে খেলেনি। ফলে, মেসারার্স অবনমন বাঁচানোর গুরুত্বপূর্ণ ৩ পয়েন্ট পেয়ে যায়। এই ঘটনাগুলি ময়দানের ঐতিহ্য ও সততাকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
Advertisement
বাংলার ফুটবলের অবনতি ও জাতীয় দলে বাঙালি ফুটবলারদের শূন্যতার কথা উঠছে। এই প্রসঙ্গে বলা যায়, কলকাতা লিগে এই ধরনের অনিয়ম এবং সামগ্রিক অব্যবস্থাপনার কারণেই বাংলার ফুটবলার তৈরির প্রক্রিয়া বড়সড় ধাক্কা খেয়েছে। যার ফলে একসময়কার প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ কলকাতা লিগ এখন তার আকর্ষণ ও খেলার মান উভয়ই হারিয়েছে। এর ফলে তরুণ বাংলার ফুটবলাররা সঠিক প্ল্যাটফর্ম এবং উন্নত প্রশিক্ষণের সুযোগ পাচ্ছেন না।
অন্য রাজ্যের দাপট কলকাতা ফুটবলে। ভালো পরিকাঠামো ও পেশাদারিত্বের অভাবের সুযোগ নিয়ে মহারাষ্ট্র, গোয়া বা উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলো থেকে প্রতিভাবান ফুটবলাররা উঠে আসছেন, যাঁরা এখন জাতীয় দলের নিয়মিত মুখ। জাতীয় দলে একটা সময় ছিল যখন সুব্রত ভট্টাচার্য, ভাস্কর গাঙ্গুলি, মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য, মানস ভট্টাচার্য, বিদেশ বসু, প্রশান্ত ব্যানার্জি, শিশির ঘোষ ও প্রসূন ব্যানার্জির মতো কিংবদন্তী বাংলার ফুটবলাররা জাতীয় দলে নেতৃত্ব দিয়েছেন। বর্তমানে পরিস্থিতি এমন যে ভারতীয় জাতীয় দলে হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোনও বাংলার ঘরের ফুটবলার নেই। এমনকি, রাজ্য সরকারের ক্রীড়ামন্ত্রীও ফুটবলার নির্বাচনে ‘এই বিষয়ে অভিযোগ তুলেছেন। যা এই গভীর সংকটের ইঙ্গিত দেয়। সেই কারণে সংকট নিরসনে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ চাই।
বাংলার ফুটবলকে তার হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে গেলে কেবল ম্যাচ ফিক্সিংয়ের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নিলেই চলবে না, প্রয়োজন সামগ্রিক সংস্কার। তার জন্যে ক্লাবগুলো এবং আইএফএকে ফুটবলের প্রশাসনে আরও বেশি পেশাদারিত্ব ও স্বচ্ছতা আনতে হবে। তৃণমূল পর্যায় থেকে প্রতিভাকে খুঁজে বের করে উন্নত প্রশিক্ষণ ও পরিকাঠামো দেওয়া জরুরি। কলকাতা প্রিমিয়ার লিগের মান ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়াতে হবে। যাতে এখান থেকে উঠে আসা খেলোয়াড়রা জাতীয় স্তরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার যোগ্য হন। কলকাতার ফুটবল এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার বেড়াজাল ছিন্ন করে বাংলার ফুটবল আবার কবে তার পুরোনো জৌলুস ও জাতীয় দলে নিজের স্থান পুনরুদ্ধার করতে পারে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
Advertisement



