‘আমি জাতীয় কোচ থাকলে কিছুতেই ব্রাজিলের বিরুদ্ধে দল নামাতাম না’- সুনীল ছেত্রীদের প্রাক্তন হেডস্যার কেন এমন বললেন?

Photo: Representational Image

পাঁচবারের বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের বিরুদ্ধে ভারতের ফ্রেন্ডলি ম্যাচ নিয়ে ক্রমশ আগ্রহ বাড়ছে ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে। আগামী ৩ অক্টোবর যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে এই ঐতিহাসিক ম্যাচ আয়োজনের প্রস্তুতিও জোর কদমে শুরু করে দিয়েছে সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন ও পশ্চিমবঙ্গ সরকার। কিন্তু ভারতীয় ফুটবলের যা দৈন্যদশা, তাতে বিশ্বের পাঁচ নম্বর ব্রাজিলের বিরুদ্ধে মাঠে নামলে বিশ্বের ১৩৮ নম্বর ভারতের কী হাল হবে, সেই প্রশ্নও তুলছেন অনেকে। প্রায় ৭০-৮০ কোটি টাকা খরচ করে ব্রাজিলকে ভারতে এনে এ দেশের ফুটবলের মানে কতটা উন্নতি হবে, সে প্রশ্নও তুলছেন অনেকে।

সম্প্রতি ভারতীয় ফুটবলের অন্যতম কিংবদন্তি বাইচুং ভুটিয়া বলেছেন, ব্রাজিলের বিরুদ্ধে এই ফ্রেন্ডলি ম্যাচে এ দেশের ফুটবলে ছিঁটেফোঁটাও উন্নতি হবে না। বরং যে বিপুল পরিমাণ টাকা খরচ করে ব্রাজিল দলকে এখানে আনা হচ্ছে, সেই টাকা ফুটবলের উন্নতিতে ব্যয় করলে দেশের ফুটবলে উন্নতি হত। তাই এই ম্যাচকে ভারতীয় ফুটবলপ্রেমীদের বয়কট করা উচিত বলে মনে করেন প্রাক্তন ভারত অধিনায়ক।

এ বার প্রায় একই সুরে কথা বললেন ভারতীয় দলের প্রাক্তন হেড কোচ ইগর স্টিমাচও (Igor Stimac)। তাঁর মতে, ব্রাজিলের বিরুদ্ধে খেলতে নামলে ভারতীয় ফুটবলকে যথেষ্ট অস্বস্তির মধ্যে পড়তে হবে। তাই এই কাজটা সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন না করলেই ভালো করত। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, ‘আমি ভারতীয় দলের কোচ থাকলে কিছুতেই এই ম্যাচে দল নামাতে রাজি হতাম না’।


আরও পড়ুন: ৪৬ বছরেই ফের ফুটবলে রোনাল্ডিনহো! ইতালির ক্লাবে নতুন ভূমিকায় ব্রাজিলের কিংবদন্তি

২০১৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত ভারতীয় দলের হেড কোচ ছিলেন ক্রোয়েশিয়ার প্রাক্তন বিশ্বকাপ দলের খেলোয়াড় ইগর স্টিমাচ (Igor Stimac)। তাঁর প্রশিক্ষণে ভারত খেলেছিল মোট ৫৩টি ম্যাচ। তার মধ্যে জয় পায় ১৯টিতে, হারে ২০টিতে এবং ড্র হয় ১৪টিতে। এই সময়ে ভারত ৭১টি গোল করেছিল এবং হজম করেছিল ৭৬টি গোল।

১৯৯৮-এর ফিফা বিশ্বকাপে দাভর সুকেরের সতীর্থ হিসেবে ব্রোঞ্জজয়ী স্টিমাচ, স্টিফেন কনস্ট্যান্টাইনের বিদায়ের পর ২০১৯-এর ১৫ মে জাতীয় দলের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। ২০২৪-এর জুনের শুরুতে দোহায় কাতারের বিরুদ্ধে বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জন পর্বের ম্যাচটিই ছিল ভারতের কোচ হিসেবে স্টিমাচের শেষ ম্যাচ (Igor Stimac)।

সেই ম্যাচে ভারত ১-২ গোলে হেরে যায়। এই হারের ফলে দ্বিতীয় রাউন্ড থেকে বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জন পর্ব থেকে ছিটকে যায় ‘ব্লু টাইগার্স’। কাতার ও কুয়েতের পিছনে গ্রুপে তৃতীয় স্থানে শেষ করে ভারত। সেই রাউন্ডের বাধা টপকাতে পারলে ভারত ২০২৬ বিশ্বকাপের মূলপর্বে কাছাকাছি চলে যেতে পারত। কিন্তু তা না পারায় তাঁকে সরিয়ে দেয় কল্যাণ চৌবের নেতৃত্বাধীন এআইএফএফ।

বছর দুয়েক আগেই ভারতীয় ফুটবলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেলেও এখনও এই দেশের ফুটবল নিয়ে খবরাখবর রাখেন তিনি। ব্রাজিল দলের ভারতে এসে খেলার খবরও জানেন তিনি। তবে এই খবর তাঁকে বেশ অবাক করেছে বলে জানিয়েছেন স্টিমাচ।

সমাজমাধ্যমে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার সঙ্গে ভারত খেললে তাতে অস্বস্তি বাড়বে বই কমবে না। লিওনেল মেসিকে এত টাকা খরচ করে আনা হল, তার সঙ্গে অনেকেই ছবি-টবি তুললেন, প্রচুর হই-হল্লা হল। এত টাকা (প্রায় আশি কোটি) ভারতের ফুটবলের উন্নতিতে খরচ করা হলে তো এ দেশের ফুটবল অনেক লাভবান হত। এটা পাগলামি ছাড়া আর কিছুই না’।

আরও পড়ুন: নিলামের আসরে মেসির জার্সি বনাম রোনাল্ডোর জার্সি, কোন মহাতারকার জার্সির দাম উঠল ছয় গুণের বেশি?

ব্রাজিলের সঙ্গে ভারত ম্যাচ খেললে এ দেশের ফুটবল মহলে অস্বস্তি খুবই বাড়বে বলে মনে করেন সুনীল ছেত্রীদের (Sunil Chhetri) প্রাক্তন হেডস্যার, যাঁর আমলে ধারাবাহিক সাফল্য পেয়েছিল ভারতীয় দল। তাঁর ধারনা, ‘ব্রাজিল-ভারত ম্যাচটা আসলে কিছু টাকা রোজগারের জন্য করা হচ্ছে। পুরোটাই মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি। দেশের ফুটবলের উন্নতির সঙ্গে ব্রাজিল ম্যাচের কোনো সম্পর্ক নেই। এতে ভারতীয় ফুটবলের কিছুই ভালো হবে বলে মনে হয় না আমার। উল্টে আরো অস্বস্তি বাড়বে’।

এর পরেই বলেন সেই সাঙ্ঘাতিক সাফ কথা, ‘আমি জাতীয় কোচের দায়িত্বে থাকলে কিছুতেই এই ম্যাচে দল নামাতে রাজি হতাম না। যখন ভারতের কোচ ছিলাম, তখন আমাকে দক্ষিণ আমেরিকায় দল নিয়ে যেতে বলা হয়েছিল। সেখানকার কয়েকটি দেশের বিরুদ্ধে খেলার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আমি রাজি হইনি। কারণ, ভারতীয় ফুটবল আর ওদের ফুটবলের মানে অনেক ফারাক।

ওখানে গিয়ে শুধু অস্বস্তিই বাড়ত আমাদের। তাই যেতে চাইনি। এখনও ভারতের কোচ থাকলে ব্রাজিলের বিরুদ্ধে খেলতে রাজি হতাম না। এর যা ফল হবে, তাতে ভারতীয় ফুটবলের উল্টে আরও ক্ষতি হবে। বাংলাদেশের বিরুদ্ধেই যদি ভারত ভালো না খেলতে পারে, তা হলে বিশ্বের অন্যতম সেরা দলের বিরুদ্ধে কী খেলবে’?

শুধু ব্রাজিল নয়, বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া দল কেপ ভার্দের বিরুদ্ধেও খেলার কথা ভারতের। এমনকী, নভেম্বরে নিউজিল্যান্ডে গিয়েও তাদের জাতীয় দলের বিরুদ্ধে দুটি ম্যাচে খেলার কথা ভারতীয় দলের। নিউজিল্যান্ডও এ বার বিশ্বকাপের মূলপর্বে অংশ নিয়েছিল। ব্রাজিল শেষ ১৬ থেকে ছিটকে যায়, কেপ ভার্দে শেষ ৩২-এ জায়গা করে নিতে পারলেও নিউজিল্যান্ড নক আউটে উঠতে পারেনি। কিন্তু বিশ্বকাপের মূলপর্বে খেলার দলের সঙ্গে ভারত কতটা পেরে উঠবে, নাকি অনেক গোল খেয়ে লজ্জার হার স্বীকার করে নেবে, এই প্রশ্নও তুলছেন অনেকে। তাঁদের মধ্যে স্টিমাচ অন্যতম।

দেখুন: যুবভারতীর মাঠে পা রেখেই চিন্তায় ব্রাজিল কর্তারা!