রনজিৎ দাস
আবেগ সরিয়ে কঠোর হতে হবে, নচেৎ বাংলার ফুটবল যে তিমিরে ছিল সেখানেই থাকবে। এক পরিবর্তনে অনেক প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু যা ঘটেছে, তা একরাশ হতাশা ছাড়া আর কিছুই হয়নি। আইএফএ-তে ময়দানের সকল ক্লাবের যথার্থ প্রতিনিধিত্ব নির্বাচন হয়, হয়নি। পরিবর্তনে কঠোরতা থাকবে, হয়নি। বিশ্বাসের মানুষ আত্মসমর্পণ কেবল করেননি, এমনভাবে চুপ থেকেছেন—ময়দানে শেষপর্যন্ত নীরবতা নেমে এসেছে। বাংলার সংস্কৃতির জগতের বুদ্ধিজীবীদের মতন বাংলার ঐতিহ্যের ফুটবলে অবক্ষয় দেখে প্রাক্তন ফুটবলাররা কোনও অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে সাহস পাননি। একঝাঁক প্রাক্তন ফুটবলারের সামনে আইএফএ কলকাতা প্রিমিয়ার লিগের সূচি তৈরিতে লটারি করার সময় স্বচ্ছতার অভাব ছিল। তা দেখে সবাই নীরবতায় সমর্থন করে গেলেন।
Advertisement
সেই সময় একজন প্রাক্তন ফুটবলারকে সত্যতা যাচাই করতে এগিয়ে আসতে দেখা যায়নি। শেষপর্যন্ত সেই কলকাতা লিগেই ম্যাচ ফিক্সিং কাণ্ড প্রমাণিত হলো। বাংলার ঐতিহ্যের কলকাতা ফুটবল, সারা ভারতবর্ষের ফুটবলাররা যে লিগে খেলার জন্য আকুতি-মিনতি করতেন, সেই কলকাতা লিগের গায়ে কালি লাগলেও, প্রাক্তন ফুটবলাররা মুখ খোলার হিম্মত দেখাননি। বরং এই কলঙ্কিত লিগ শেষ হতে না হতেই আরও অস্বচ্ছতায় বেঙ্গল সুপার লিগ চালু হলো। স্বচ্ছতার ছিটেফোঁটাও যেখানে ছিল না, হওয়ার কথাও নয়— সেখানেই একঝাঁক প্রাক্তন ফুটবলাররা ঝাঁপিয়ে পড়লেন। কেউ একবার বললেন না যে, কলকাতা লিগের ম্যাচ ফিক্সিং নিয়ে তদন্ত প্রক্রিয়া শেষ হোক, তারপর স্বচ্ছতা নিয়ে বেঙ্গল সুপার লিগ হবে। দেখা হবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় এই লিগের মাধ্যমে বাংলার ফুটবলে কতটা উন্নতি হবে। না, কেউ এগিয়ে আসেননি। আসবেন কেন, বাংলার ফুটবল ও বাঙালি ফুটবলাররা বঞ্চিত হতে হতে শেষ হলে হোক— নিজেদের আখের গোছাতেই সবাই ব্যস্ত ছিলেন। খিদিরপুর ক্লাবের মতন ঐতিহ্যের ক্লাব ম্যাচ ফিক্সিংয়ে জড়িয়ে পড়লো, এই ক্লাব থেকে যে প্রাক্তন ফুটবলাররা জীবনে প্রতিষ্ঠা পেলেন, তারা বুক ঠুকে বলতে পারলেন না তাদের প্রিয় ক্লাব এককভাবে এই সিস্টেমে জড়িয়ে পড়তে পারে না। এত প্রভাবশালীদের ক্লাব থাকতে এককভাবে কেউ এই কাজ করতে পারে না। এই সিস্টেমের গলদ অনেক গভীরে, সঠিক তদন্ত হোক। কেবল পুলিশের উপর দায় ঝেড়ে ফেলা কেন?
Advertisement
কেন প্রাক্তন ফুটবলারদের দিয়ে আগে আইএফএ নিজস্ব তদন্ত সারলো না? লিগের লটারি ও সূচি করছে আইএফএ, গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের মাঠ ঠিক করছে আইএফএ, প্রতি ম্যাচে তাদের নিয়োজিত কর্মীরা থাকছেন— অথচ কেউ কিছুই বুঝতে পারলেন না? কেবল একটা ক্লাব জড়িত ছিল? কলকাতা লিগকে বাঁচাতে প্রাক্তন ফুটবলাররা সমবেত হয়ে এগিয়ে আসলেন না। এখন ইস্টবেঙ্গল ও মোহনবাগানের মত দলে বাঙালি ফুটবলার নেই বললেই চলে, কারুর এতটুকু ভ্রূক্ষেপ নেই। আইএফএ কেমন চলছে, কেউ ভয়ে তার খোঁজ নিতে সামনে আসে না। কেন আইএফএ-র কোষাধ্যক্ষ অভিমানে পদ ছেড়ে ‘মেরুদণ্ড বিক্রি নেই’ বলে নিজের প্রোফাইলে অসহায়তা প্রকাশ করেছেন। যে আইএফএ অফিসের স্থায়ী কর্মীরা দিনরাত পরিশ্রম করে সংস্থায় কাজ করেন, তাদের প্রতি কি সঠিক নজর দেওয়া হয়? আইএফএ-তে এখন কাদের ভিড়—কোন স্কুলের থেকে কী যোগ্যতা নিয়ে এত সহজে আইএফএ-র নিয়োগ পাওয়া যায়। বাংলার বিভিন্ন দলগঠনে আগে ময়দানের কর্মকর্তাদের গুরু দায়িত্ব দেওয়া হতো— এখনও কারা সেই দায়িত্ব পাচ্ছেন?
দিনের পর দিন কলকাতা লিগ নিয়ে এক নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বিপক্ষে অভিযোগের তীর উঠেছে, রেফারি দিয়ে তারা প্রতিপক্ষকে জোর করে হারিয়ে দিচ্ছে— কেউ পদক্ষেপ নেননি। জেলার মাঠগুলোর কী করুণ অবস্থা তা নিয়ে সমীক্ষা হয়েছে?
তিলে তিলে বাংলার ফুটবল শেষ হয়ে গেল। সময় হয়েছে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার, অনেক হয়েছে— আমাদের সকলের ভালোবাসার কলকাতা ফুটবলকে তার অতীত ঐতিহ্যে ফিরিয়ে আনতেই হবে। এবং এর নেতৃত্ব দিতে হবে ঐক্যবদ্ধ ক্লাবজোটকে। অন্যায় দেখেও যে প্রাক্তন ফুটবলাররা চোখ বন্ধ করে থেকেছেন, তাদের ছাড়াও আরও অনেক অনেক প্রাক্তন ফুটবলার আছেন— যাদের ঘাম ও রক্তে বাংলার ফুটবল সমৃদ্ধ হয়েছে, তাদেরকে হাতজোড় করে আহ্বান জানিয়ে সামনে নিয়ে আসতে হবে। এই কাজে সংবাদ মাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থেকে যায়। ধারাবাহিকভাবে সীমিত ক্ষমতায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রচারে ফুটবলমহলকে সতর্ক করা যায়। কলকাতা ফুটবলকে অনৈতিকতার পথ দেখিয়েছে যাঁরা, তাদের সতর্ক করতে হবে।
বাংলায় এত ক্লাব, এত ফুটবলার— আমাদের হীনম্মন্যতা কেন থাকবে? বাংলার ফুটবলকে বাঁচাতেই হবে। সলতে পাকানোর কাজ হয়তো কেউ কেউ শুরু করে দিয়েছেন, তাকে আরও জোরদার করতে হবে। মনে রাখতে হবে আমাদের প্রাণ বাংলার ফুটবল।
Advertisement



