বৃহস্পতিবার বিশ্বকাপের আসরে তথাকথিত কোনও বড় দলের ম্যাচ না থাকলেও চারটি ম্যাচে ১৪টি গোল হয় এবং একটি দল নক আউট পর্বে প্রবেশও করে গেল। কানাডা যেখানে হাফ ডজন গোল করে জেতে, সেখানে চার গোল করে জয় পায় সুইজারল্যান্ড।
বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের দ্বিতীয় রাউন্ড থেকেই ক্রমশ জানা যাচ্ছে নক আউট পর্বে কারা খেলবে। যেমন বৃহস্পতিবার মেক্সিকো দক্ষিণ কোরিয়াকে ১-০-য় হারিয়ে ‘এ’ গ্রুপ থেকে উঠে পড়ল নক আউট পর্বে। তবে অন্য গ্রুপগুলিতে এখনও চলছে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। গ্রুপ বি-র ম্যাচে যেমন অপর আয়োজক কানাডা ৬-০-য় হারায় এশিয়ার অন্যতম সেরা দল কাতারকে।
৪০ বছর আগে যে শহরে ‘ঈশ্বরের হাত’ (The Hand of God)-এর ঘটনা ঘটেছিল, সেই মেক্সিকোতেই আজ দেখা গেল ‘ঈশ্বরের হাঁটু’ (The Knee of God)। গোলকিপার রাউল রাঙ্গেল অলৌকিকভাবে চো গু-সুংয়ের একেবারে কাছ থেকে নেওয়া হেড প্রতিহত করেন। এর পর অদ্ভুত ক্ষিপ্রতায় ইয়াং হিউন-জুনের শটও ঠেকিয়ে দেন তিনি। সেই দৃশ্য দেখে অসংখ্য দক্ষিণ কোরীয় সমর্থক হতাশায় মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েন। এর ২৭ মিনিট আগে অবশ্য মেক্সিকোর সমর্থকদের উল্লাস ছিল তুঙ্গে। লুইস রোমো এমন একটি গোল করেছিলেন, যা নিশ্চিত করে দেয় যে হাভিয়ে আগুইরের দল শেষ ৩২-এর পর্বে মেক্সিকো সিটিতেই খেলবে। কারণ, এই নিয়ে টানা দ্বিতীয় জয় পেল তারা। দুই ম্যাচে ছয় পয়েন্ট নিয়ে তাই দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠে গেল মেক্সিকো।
গ্রুপ ‘বি’-তে অবশ্য জোর লড়াই চলছে কানাডা ও সুইজারল্যান্ডের বিরুদ্ধে। দুই দলই দুটি করে ম্যাচ খেলে চার পয়েন্ট নিয়ে প্রথম দুই স্থানে। বৃহস্পতিবার ‘বৃষ্টির শহর’ ভ্যাঙ্কুবারে যেন গোল-বৃষ্টি নামায় বিশ্বকাপের আরেক আয়োজক কানাডা। ম্যাচের আগে কানাডার কোচ জেসি মার্শ বলেছিলেন, “১-০ ব্যবধানে জিতলেও আমি খুশি থাকব।” কিন্তু তাঁর দলের ছেলেরা সেই প্রত্যাশাকে অনেকটাই ছাপিয়ে যান। তারকাদের মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল ছিলেন জোনাথন ডেভিড। ৯৬ বছরের বিশ্বকাপ ইতিহাসে কনকাকাফ অঞ্চলের ফুটবলারদের মধ্যে তিনিই প্রথম হ্যাটট্রিক করেন এবং গোলদাতাদের তালিকায় লিওনেল মেসির পাশে নিজের নাম লিখিয়ে নেন। সাইল লারিনও টুর্নামেন্টে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করে এই রাতকে স্মরণীয় করে তোলেন। গ্রুপের শীর্ষস্থান নিশ্চিত করতে কানাডাকে একই ভেন্যুতে সুইজারল্যান্ডের বিরুদ্ধে অন্তত একটি পয়েন্ট পেতেই হবে। ২৫ জুন এই ম্যাচে হাড্ডাহাড্ডি লড়া হবে।
লস অ্যাঞ্জেলিসে এ দিনই সুইজারল্যান্ড ৪-১-এ বসনিয়া-হার্জাগোভিনাকে হারিয়ে কানাডাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়। কোচ মুরাত ইয়াকিনের পরিবর্তগুলি যেন সুইস ঘড়ির কাঁটার মতোই নিখুঁতভাবে কাজ করে এদিন। বসনিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচ যখন গোলশূন্য অবস্থায় এবং আক্রমণভাগেও খুব একটা ধার দেখা যাচ্ছিল না, তখনই ৭২তম মিনিটে সুইজারল্যান্ডের কোচ একসঙ্গে তিনজন খেলোয়াড়কে মাঠে নামানোর পর ছবিটা বদলে যায়। এর পর আর বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি। গোলের দরজা খুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন রুবেন ভার্গাস। তাঁর তৈরি করা সুযোগ থেকেই অসাধারণ ভলিতে জালে বল জড়িয়ে দেন জোহান মানজাম্বি। ম্যাচ শেষে ভার্গাসের ঝুলিতে ছিল একটি গোল ও একটি অ্যাসিস্ট, আর মানজাম্বি করেন জোড়া গোল। সেই সঙ্গে তিনি জিতে নেন ম্যাচের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারও।
আটলান্টা স্টেডিয়ামে গ্রুপ ‘এ’-র ম্যাচে ১-১ ড্র করে চেক প্রজাতন্ত্র ও দক্ষিণ আফ্রিকা। ম্যাচ শেষ হওয়ার পর চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি তেবোহো মোকোয়েনা।
‘গড ব্লেস আফ্রিকা’ সংগীত যখন স্টেডিয়ামে বেজে উঠছিল, তখন তাঁর মনে পড়ছিল প্রয়াত দাদুর কথা—যিনি ছিলেন তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। তখনও তাঁর চোখে জল দেখা যায়। আর ম্যাচ শেষে যখন দক্ষিণ আফ্রিকার সমর্থকেরা ১৬ বছর পর বিশ্বকাপে দলের প্রথম পয়েন্ট অর্জনের উল্লাসে মেতে ওঠেন, তখন সেই সাফল্যের অন্যতম নায়ক হয়ে ওঠার আবেগে ভেসে যান এই অভিজ্ঞ ফুটবলার। মোকোয়েনার শেষ মুহূর্তের পেনাল্টি গোলই ম্যাচে সমতা ফেরায়। তার আগে দুর্দান্ত এক দলগত আক্রমণে গোল করে মিশাল স্যাডিলাক চেকদের এগিয়ে দিয়েছিলেন। এই ড্রয়ের ফলে দুই দলই শেষ ৩২-এ ওঠার লড়াইয়ে টিকে আছে ঠিকই। তবে সে জন্য পরের ম্যাচে তাদের যে কোনও এক পক্ষকে বড় ব্যবধানে জিততেই হবে। কারণ এই গ্রুপ থেকে ইতিমধ্যেই মেক্সিকো পরের পর্বে চলে গিয়েছে। আর একটি জায়গা পড়ে রয়েছে।




