গণতন্ত্রে সবারই সমান অধিকার ভোট দেওয়া, ভোট না দেওয়াটাও

Written by SNS May 24, 2024 1:40 pm

বরুণ দাস

‘দৃশ্যত গণতন্ত্র হচ্ছে এমন এক ব্যবস্থা যেখানে কোনও উপযুক্ত ইসু্য ছাড়া প্রচুর অর্থ খরচ করে অনেকগুলো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ও তাঁরাই প্রার্থী হন যাঁরা খুব সহজেই বিনিময়যোগ্য কিংবা বিক্রি হয়ে যান৷’ — গোর ভিদাল (মার্কিন লেখক)

দেশ-কাল ভেদে গণতন্ত্র নিয়ে মার্কিন লেখক গোর ভিদাল-এর কথার প্রাসঙ্গিকতা স্বীকার করতেই হয়৷ স্বাধীনতার পর গত শতকের সেই ’৫২ থেকে চলতি একুশ শতকের ’২৪ পর্যন্ত বিধানসভা ও লোকসভা মিলিয়ে কম নির্বাচন তো দেখলেন না ভারতের জনগণ৷ সঙ্গে পৌর নির্বাচন সহ ত্রিস্তর পঞ্চায়েত নির্বাচন৷ ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশ এই উপমহাদেশের নির্বাচন নিয়ে মার্কিন লেখক গোর ভিদাল ঠিকই বলেছেন৷
উল্লেখ্য, একুশের বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে বাংলার কয়েকটি বামদল যৌথভাবে লিফলেট প্রকাশ করে বলেছিল, ‘নো ভোট ফর বিজেপি’৷ বাংলার বিশিষ্টজনরাও যৌথভাবে প্রকাশিত ওই লিফলেট-এর বয়ান আউড়ে বলেছিলেন, ‘নো ভোট ফর বিজেপি’৷ চব্বিশের অষ্টাদশ লোকসভা নির্বাচনেও কয়েকটি বামদল ও গণমঞ্চ সংবাদমাধ্যমে বিবৃতি দিয়ে একই বক্তব্য পেশ করেছে৷ বিজেপিকে ভোট না দেওয়ার আবেদন৷

রাজনৈতিক দলগুলি তাদের বিরোধীপক্ষকে ভোট না দেওয়ার গণ-আবেদন জানাতেই পারেন৷ কিন্ত্ত কোনও গণমঞ্চ কিংবা বুদ্ধিজীবী-বিশিষ্টজনরা কি এমন কোনও আবেদন জানাতে পারেন? কে কাকে ভোট দেবেন বা দেবেন না, সেটা তাঁদের একান্তই নিজস্ব ব্যাপার৷ এতে অন্যদের অকারণে নাক গলানোর নৈতিক অধিকার আছে কি? বিশিষ্টজনরা এমন দাবি করেন কোন যুক্তিতে? তাঁদের যুক্তির ভিত্তিটাই বা কী?
বুদ্ধিজীবী-বিশিষ্টজন বলেই কি তাঁরা অন্যদের মাথা কিনে নিয়েছেন? কোন যুক্তিতে মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়ে বা পরিসরে তাঁরা নাক গলানোর দুঃসাহস দেখাচ্ছেন? সমাজের অ-বিশিষ্টজনরা কি মানুষ নন? তাঁদের ভালোমন্দ বোঝার ক্ষমতা নেই? অন্যের নির্দেশে বা কথায় তাঁদের চলতে হবে? বিশেষ করে ভোট দেওয়ার মতো একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপারে? তাঁরা কী ভাবেন নিজেদেরকে? সবকিছু জেনেবুঝে বসে আছেন?

বিজেপির রাজনীতি ভালো কী মন্দ তা নিয়ে আপাতত বিতর্ক বা আলোচনায় যাওয়া হচ্ছে না৷ কারণ এই উত্তর সম্পাদকীয় প্রতিবেদনের উদ্দেশ্যও তা নয়৷ আমাদের আলোচনার বিষয় ‘নো ভোট ফর বিজেপি৷’ আমরা কেবল বুঝতে চাইছি এমন কোনও আবেদন আদৌ করা যায় কিনা? গণতন্ত্রে সবারই সমান অধিকার৷ ভোট দেওয়া যেমন গণতান্ত্রিক অধিকার, ঠিক তেমনই ভোট না দেওয়াটাও নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকার৷

কারণ বিজেপির রাজনীতি আমাদের কারও কারও কাছে খারাপ লাগলেও কারও কারও কাছে তো ভালো লাগতেই পারে এবং লাগে বলেই না তারা দুই সাংসদ থেকে তিনশো তিন-এ পৌঁছেছে৷ চব্বিশের লক্ষমাত্রা তারা ধার্য করেছে ‘তিনশো সত্তর’৷ জোট অর্থাৎ এনডিএ মিলিয়ে চারশো৷ আমার পছন্দ না হলে আমি তাদেরকে অবশ্যই ভোট দেব না, কিন্ত্ত যাঁদের ভালো লাগে, তাঁরা কেন তাঁদের পছন্দের দলকে ভোট দেবেন না?

ভারতীয় জনতা পার্টি তথা বিজেপির বিরুদ্ধে অভিযোগ অনেক৷ তারা ধর্ম (নাকি অধর্ম?) নিয়ে রাজনীতি করে৷ বিজেপি সাম্প্রদায়িক দল৷ বিজেপি বিভেদ-বিদ্বেষের ধারক-বাহক৷ বিজেপি গোটা দেশজুড়ে হিন্দুত্ব কায়েম করতে চায়৷ তারা হিন্দু-হিন্দু-হিন্দুস্থান স্লোগানে বিশ্বাসী৷ বিজেপি মনুবাদে আস্থা রাখে৷ যেখানে নারীকে ‘নরকের দ্বার’ বলা হয়েছে৷ তারা গণতন্ত্রের আড়ালে আসলে ফ্যাসিবাদকে প্রতিষ্ঠা দিতে চায়৷
বিজেপি ফেলে আসা অতীতকে নিয়ে বড় বেশি মাতামাতি করতে পছন্দ করে৷ প্রাচীন ভারতবর্ষ একসময় প্লাস্টিক সার্জারিতে উন্নত ছিল, গণেশের মুখে হাতির মুণ্ডুই তার প্রমাণ৷ এমনকি, বিমান আবিষ্কারও ভারতেরই কৃতিত্ব৷ এদেশের মহাকাব্যে পুষ্পরথের কথা আছে যে৷ পুরান-মহাকাব্যের কথা ও কাহিনিকে তারা ইতিহাসের আলোয় দেখতে ইচ্ছুক৷ এমনকি, পুরান-মহাকাব্যকে তারা ইতিহাস বলে স্বীকৃতিও দিতে চায়৷

আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে বুড়ো আাঙুল দেখিয়ে তারা জ্যোতির্বিজ্ঞান নয়, প্রাচীন জ্যোতিষশাস্ত্রকে স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটির পাঠ্যপুস্তকে সংযোজন করতে চায়৷ অ্যাস্ট্রোনমিকে এড়িয়ে অ্যাস্ট্রোলজিকে প্রাধান্য দিতে চাইছে তারা৷ অনেকেরই সঙ্গত প্রশ্ন, সামনের দিকে না এগিয়ে তারা কি পিছন পানে ফিরে যেতে বেশি আগ্রহী? ‘যাহা কিছু প্রাচীন তাহা সব ভালো’— এই সাবেকি বাক্যকেই কি তারা গুরুত্ব দিতে চায়?

এখানেই কিন্ত্ত শেষ নয়৷ আরও হরেক কিসিমের অভিযোগ আছে তাদের বিরুদ্ধে৷ জাতি-বিদ্বেষ তাদের অস্থি-মজ্জায় (ডিএনএ’তে) মিশে আছে৷ বিজেপি ভারতের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষকে অবিশ্বাস করে৷ তাদেরকে ঘৃণা করে৷ তাদেরকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক করে রাখতে আগ্রহী৷ তাদের খাওয়া-পরা নিয়ে নিজেদের মতামত চাপিয়ে দিতে ইচ্ছুক৷ তারা দাড়ি রাখবে কী লুঙ্গি-টুঙ্গি পরবে তাও ঠিক করে দেবে বিজেপি৷

ব্যক্তিজীবনে তাদের (সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের) সন্তান-সন্ততির সংখ্যাও বিজেপি নির্ধারণ করে দেবে৷ কোনও দম্পতি একটি-দু’টি নাকি চার-পাঁচটি সন্তান জন্ম দেবে, তা নিজেদের পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না৷ তা নির্ধারণ বা নিয়ন্ত্রণ করে দেবে বিজেপি৷ অন্য সম্প্রদায়ের সঙ্গে তাদের ভাব-ভালোবাসা কিংবা বিবাহ চলবে না৷ বিজেপির কল্যাণে ‘লভ জেহাদ’ নামক শব্দবন্ধটি এখন আমাদের অনেকেরই কমবেশি জানা৷
এমনকি, ভারত-পাকিস্তান, ভারত-বাংলাদেশ কিংবা ভারত-আফগান ক্রিকেট, হকি কিংবা ফুটবল খেলায় তারা ভারত ছাড়াও কোন দেশকে সমর্থন করবে, তাও বিজেপি ঠিক করে দেবে৷ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মহিলারা স্কুল-কলেজে বোরখা কিংবা হিজাব পরবে কিনা তাও বলে দেবে তারা৷ অভিন্ন দেওয়ানি বিধি লাগু করে তারা এক ‘অখণ্ড ভারত’ নির্মাণের গুরুদায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছে৷

এই গুরুদায়িত্ব পালনে তারা বদ্ধপরিকর৷ এজন্য দেশের মানুষকে তারা ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছে৷ তাদের এনপিএ-এনআরসি এবং সবশেষে সিএএ (নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন-২০১৯) নিয়ে দেশের মানুষ দারুণ দিশেহারা৷ বিজেপি শাসিত অসম রাজ্যে কয়েক লক্ষ মানুষ (হিন্দু-মুসলমান) ডিটেনশন ক্যাম্পে বন্দিজীবন কাটাচ্ছেন৷ কয়েকজন ওই বন্দিশিবিরে মারাও গেছেন৷ তাঁদের সৎকার করার জন্য কেউ নেই৷

কার ধর্মীয় উপাসনালয় কোথায় থাকবে, তা ঠিক করে দেবে বিজেপি৷ কোনটা ভাঙা হবে আর কোনটা দয়া-দাক্ষিণ্য করে রাখা হবে তাও তারা ঠিক করে দেবে৷ যেমন অযোধ্যায় প্রায় পাঁচশো বছরের পুরনো অব্যবহূত বাবরি মসজিদ ভেঙে তাদেরই উদ্যোগে রামমন্দির নির্মাণ করা হয়েছে৷ এমনই সব গুরুতর অভিযোগ বিজেপির বিরুদ্ধে৷ না, এই অভিযোগের একটিও বিজেপি কখনও অস্বীকার করে না৷
তার মানে তো এই দাঁড়ায়, তাদের (বিজেপির) বিরুদ্ধে তোলা ভয়ঙ্কর অভিযোগগুলো একেবরেই মনগড়া বা মিথ্যে নয়৷ উত্তরপ্রদেশে বিজেপির বর্ষীয়ান মুখ্যমন্ত্রী কল্যাণ সিংয়ের রাজত্বে করসেবকদের বাবরি-ধ্বংসের পর গুজরাত-দাঙ্গার কথা আমরা জানি৷ সে সময়কার বিজেপির জোট সরকারের বর্ষীয়ান প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারি বাজপেয়ি যাঁকে রাজধর্ম পালনের নির্দেশ দিয়েছিলেন, তিনিই এখন দিল্লির সিংহাসনে৷

কিন্ত্ত এতদসত্ত্বেও বলতে হয়, স্বাধীন ভারতের নির্বাচন কমিশন যে দলটিকে স্বীকৃতি দিয়েছে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার এবং জয়ী হয়ে মসনদে বসার, তাকে ভোট না দেওয়ার আহ্বান জানানো কতটা সংবিধান-সম্মত? বিশেষ করে সমাজের তথাকথিত বিশিষ্টজনদের৷ সমাজের বুদ্ধিজীবীশ্রেণি বা বিশিষ্টজনেরা কি ভারতের সংবিধানের ঊর্ধ্বে? দেশের সংবিধান কি তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়? কী বলছেন অভিজ্ঞ আইনজীবীরা?
বিজেপির বিরুদ্ধে অভিযোগের তালিকা নিয়ে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনে যাওয়া যেতেই পরে৷ তাদের নির্বাচনে লড়াইয়ের স্বীকৃতি বাতিল করার আবেদনও জানানো যেতে পারে৷ এমনকি, আইনের প্রশ্রয়ও নেওয়া যেতে পারে৷ মহামান্য আদালতের শরণাপন্ন হয়ে দলের রাজনৈতিক স্বীকৃতি বাতিলের আবেদন করা যেতে পারে৷ আমাদের সংবিধানের কোথাও রাজনীতির সঙ্গে ধর্মীয় বিষয়কে সম্পৃক্ত করার কথা নেই৷

সংবিধানকে এড়িয়ে বিজেপি কী করে বছরের পর বছর নির্বাচনে লড়ছে? কী করেই বা তারা দু’দফায় দেশের শাসন-ক্ষমতায় নিজেদেরকে শামিল করছে? এবং তৃতীয়বারের জন্য ঝাঁপাচ্ছে? গণমঞ্চ, নাগরিক মঞ্চ কিংবা সমাজের বুদ্ধিজীবী শ্রেণি বা বিশিষ্টজনরা আইনিপথে না গিয়ে ক্ষয়িষ্ণু বামজোটের সঙ্গে গলা মিলিয়ে স্লোগান তুলে দিলেন ‘নো ভোট ফর বিজেপি’৷ এটা তো মানুষের ব্যক্তি অধিকারে সরাসরি হস্তক্ষেপ?
সমাজের বিশিষ্টজন আর বুদ্ধিজীবীদের এমন নির্বুদ্ধিতার নির্বিকল্প পরিচয় পেয়ে অনেকেই আড়ালে হাসাহাসি করছেন৷ কেউ কেউ প্রকাশ্যে বিতর্কেও শামিল হচ্ছেন৷ যেমন, বৈদু্যতিন মাধ্যমের ব্যতিক্রমী সাংবাদিক অনুপম কাঞ্জিলাল তো এর তীব্র বিরোধিতা করে চলেছেন৷ তিনি সমাজের বুদ্ধিজীবীশ্রেণি বা বিশিষ্টজনদের নৈতিক অধিকার বা এক্তিয়ার নিয়েই সরাসরি প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন৷ তাঁর কথায়, ‘এমনটা আবার হয় নাকি?’

হয় না জানি, কিন্ত্ত হচ্ছে তো বটে৷ আমরা অনকে তা মেনেও নিচ্ছি৷ কেউ আর প্রতিবাদে শামিল হচ্ছি না৷ আসলে নিজের গায়ে উত্তাপ না লাগা পর্যন্ত আমরা কেউ পিঠ ফিরে শুতে রাজি নই৷ এ এক বিচিত্র মানসিকতা আমাদের৷ যাদের (বিজেপি) এককথায় ফ্যাসিস্ত বলছি, তাদের সঙ্গে আমাদের আচরণেই বা তফাৎ রইলো কোথায়? আমাদের আচরণের মধ্যেও তো ওই একই লক্ষণ (স্বৈরতান্ত্রিক) দেখা যাচ্ছে৷
সত্যি সেলুকাস, কী বিচিত্র এই ভারতবর্ষ (পড়ুন বাংলা)? এখানে সবই হয়৷ হয়ে থাকে৷ যা আদৌ হওয়ার নয়, তাও৷ আমার অপছন্দের মানুষ বা দলের বিরুদ্ধে যা খুশি তাই করতে পারি৷ ন্যায়-নীতি-নৈতিকতার সবটুকু গঙ্গার জলে বিসর্জন দিয়েও৷ কোনও কিছুরই পরোয়া করার নূ্যনতম প্রয়োজন বোধও করি না৷ একই অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েও৷ অথচ গণতন্ত্রে ন্যায়-নীতি-নৈতিকতার মূল্য অপরিসীম৷

এই নিবন্ধের শুরু হয়েছিল বুদ্ধিজীবীশ্রেণি বা বিশিষ্টজনদের আবেদন— ‘নো ভোট ফর বিজেপি’ প্রসঙ্গ দিয়ে৷ আর শেষে ফিরে আসতে হয় মার্কিন লেখক গোর ভিদালের কথায়ও৷ সত্যিই তাঁর পর্যবেক্ষণ যথার্থ৷ ‘দৃশ্যত গণতন্ত্র হচ্ছে এমন এক ব্যবস্থা, যেখানে কোনও উপযুক্ত ইসু্য ছাড়া প্রচুর অর্থ খরচ করে অনেকগুলো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ও তারাই প্রার্থী হন যারা খুব সহজেই বিনিময়যোগ্য কিংবা বিক্রি হয়ে যান৷’