• facebook
  • twitter
  • youtube
Saturday, 11 July, 2026

বিচার ভবনে আসছে দুটি এক্সক্লুসিভ এনআইএ কোর্ট

রাজ্যে এনআইএ (ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি)-এর মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে বড় পদক্ষেপের পথে কলকাতা হাইকোর্ট।

বিচার ভবনে আসছে দুটি এক্সক্লুসিভ এনআইএ কোর্ট

রাজ্যে এনআইএ (ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি)-এর মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে বড় পদক্ষেপের পথে কলকাতা হাইকোর্ট। বিচার ভবনে তৈরি হতে চলেছে দুটি এক্সক্লুসিভ এনআইএ স্পেশাল কোর্ট। সেই লক্ষ্যেই কলকাতা হাইকোর্টে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি তপব্রত চক্রবর্তীর নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।

জঙ্গি কার্যকলাপ, নাশকতা ও রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র-সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে এনআইএ-র তদন্তাধীন মামলার চাপও। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে এনআইএ-র বিশেষ আদালত বলতে কার্যত বিচার ভবনের সিবিআইয়ের তৃতীয় আদালত এবং এনআইএ-র দ্বিতীয় আদালত। ফলে নতুন মামলার পাশাপাশি পুরনো মামলাগুলির নিয়মিত শুনানি ও দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করতে সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে এনআইএ কর্তৃপক্ষকে।

এই পরিস্থিতির সমাধানেই কলকাতা হাইকোর্টে অনুষ্ঠিত বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি তপব্রত চক্রবর্তী, অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল ধীরাজ ত্রিবেদী, এনআইএ-র স্পেশাল কৌঁসুলি অরুণ কুমার মাইতি, ভাস্কর প্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়, দেবাশীষ টন্ডন (পিপি), কলকাতা জোনাল এনআইএ-র এসপি, রেজিস্ট্রার জেনারেল অভনি পাল সিং, রেজিস্ট্রার (জুডিশিয়াল), কলকাতা নগর দায়রা আদালতের মুখ্য বিচারক সুদীপ দে এবং কলকাতা হাইকোর্টের অন্যান্য পদস্থ আধিকারিকরা।

সূত্রের খবর, বিচার ভবনের চতুর্থ তলায় দুটি আদালতকক্ষ ইতিমধ্যেই চিহ্নিত করা হয়েছে। ওই কক্ষগুলির পরিকাঠামো খতিয়ে দেখতে সম্প্রতি বিচার ভবনে যান মুখ্য বিচারক, অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল ধীরাজ ত্রিবেদী, এনআইএ-র স্পেশাল কৌঁসুলি অরুণ কুমার মাইতি, ভাস্কর প্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়, দেবাশীষ টন্ডন (পিপি), কলকাতা জোনাল এনআইএ-র এসপি, পিডব্লিউডি-র আধিকারিক এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট আধিকারিকরা। আদালতকক্ষ দুটির নিরাপত্তা, পরিকাঠামো ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সুবিধা খতিয়ে দেখা হয়েছে। পরিদর্শনের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সুপারিশ কলকাতা হাইকোর্টে পাঠানো হবে। পুরো প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল ধীরাজ ত্রিবেদীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে জানা গিয়েছে। সমস্ত দিক বিবেচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

কেন এত তৎপরতা?

সূত্রের খবর, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী এনআইএ-র মামলার জন্য পৃথক এক্সক্লুসিভ স্পেশাল কোর্ট গঠন করা হচ্ছে। উদ্দেশ্য একটাই—এনআইএ-র মামলাগুলির নিয়মিত শুনানি নিশ্চিত করা এবং দ্রুত বিচার সম্পন্ন করা। সেই নির্দেশ মেনেই কলকাতা হাইকোর্ট বিচার ভবনে দুটি এক্সক্লুসিভ এনআইএ কোর্ট চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। বিষয়টি নিয়েই বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বৈঠকে।

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে নড়েচড়ে বসেছে রাজ্যগুলি

এনআইএ মামলার জন্য এক্সক্লুসিভ আদালত গঠনের বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট ইতিমধ্যেই ১৭টি রাজ্যকে নোটিশ জারি করেছে। এনআইএ-র মামলাগুলির দ্রুত ও কার্যকর বিচার নিশ্চিত করতে আদালত স্বতঃপ্রণোদিত ফৌজদারি মামলা রুজু করেছে এবং দেশের সমস্ত হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতিদের বিষয়টি বিবেচনার নির্দেশ দিয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টে শুনানির সময় কেন্দ্রের পক্ষে অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল ঐশ্বর্য ভাটি স্ট্যাটাস রিপোর্ট দাখিল করে জানান, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক ২০২৬ সালের ৭ জানুয়ারি একটি অফিস মেমোরান্ডাম জারি করেছে। সেখানে এনআইএ-র বিশেষ আদালত গঠন ও পরিচালনার ক্ষেত্রে কেন্দ্র কীভাবে রাজ্যগুলির ব্যয় বহন করবে, তার বিস্তারিত নীতিমালা নির্ধারণ করা হয়েছে।

সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনায় স্পষ্ট জানানো হয়েছে, আদালত ভবন নির্মাণ বা জমি কেনার খরচ কেন্দ্র বহন করবে না। নিরাপত্তার স্বার্থে সংশ্লিষ্ট আদালত ভবনের মধ্যেই একটি নির্দিষ্ট আদালতকক্ষ এনআইএ-র জন্য বরাদ্দ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে সরকারি ভবনে ভাড়া নিয়ে আদালত চালানো যাবে। একান্ত প্রয়োজনে বেসরকারি ভবন ভাড়া নেওয়া গেলেও নিরাপত্তার সম্পূর্ণ দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারকেই নিতে হবে।

কেন্দ্র আরও জানিয়েছে, আদালতের অবকাঠামো উন্নয়ন, সংস্কার, রক্ষণাবেক্ষণ, কর্মীদের বেতন, বিচারকের গাড়ি, আসবাবপত্র, কম্পিউটার, ইন্টারনেট, টেলিফোন, ফটোকপিয়ার, এয়ার কন্ডিশনার, বিদ্যুৎ, জল, অফিস পরিচালনা, স্টেশনারি, বই ও জার্নালসহ বিভিন্ন খাতে হওয়া ব্যয় নির্ধারিত নিয়মে রাজ্যগুলিকে ফেরত দেওয়া হবে।

বিশেষ আদালতের জন্য একটি নির্দিষ্ট কর্মী কাঠামোও অনুমোদন করা হয়েছে। সেখানে থাকবেন একজন বিশেষ বিচারক, একজন নথি রক্ষক, একজন স্টেনোগ্রাফার, দু’জন আপার ডিভিশন সহকারী, দু’জন লোয়ার ডিভিশন সহকারী, দু’জন টাইপিস্ট, একজন চালক, একজন প্রসেস সার্ভার, তিনজন পিয়ন, একজন নিরাপত্তারক্ষী এবং একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী।

কেন্দ্রের সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি বিশেষ আদালতের জন্য বছরে সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা পর্যন্ত পুনরাবৃত্তিমূলক ব্যয় এবং আদালত চালুর প্রথম ২৪ মাসে সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা পর্যন্ত এককালীন ব্যয় ফেরত দেওয়া হবে। তবে প্রকৃত ব্যয় ও যথাযথ হিসাবের ভিত্তিতেই এই অর্থ প্রদান করা হবে।

সুপ্রিম কোর্ট তার পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে, কেন্দ্র ব্যয় বহনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিলেও পৃথক আদালতকক্ষের ব্যবস্থা করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারেরই।

এরপর আদালত অসম, বিহার, ছত্তিশগড়, দিল্লি, গুজরাট, জম্মু ও কাশ্মীর, ঝাড়খণ্ড, কর্নাটক, কেরল, মহারাষ্ট্র, মণিপুর, পাঞ্জাব, তামিলনাড়ু, পশ্চিমবঙ্গ, অন্ধ্রপ্রদেশ, রাজস্থান এবং তেলেঙ্গানা—এই ১৭টি রাজ্যের মুখ্যসচিবদের নোটিশ জারির নির্দেশ দিয়েছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলির অ্যাডভোকেট জেনারেলদের ব্যক্তিগতভাবে অথবা ভার্চুয়ালি আদালতে হাজির থাকার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

কেন্দ্র আদালতকে জানিয়েছে, এনআইএ কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারগুলিকে এই নির্দেশের বিষয়ে অবহিত করবে এবং সেটিকেই নোটিশ হিসেবে গণ্য করা হবে।

এ ছাড়া অন্যান্য কেন্দ্রীয় আইনের অধীন বিশেষ ফৌজদারি আদালত গঠনের বিষয়েও সরকার ইতিবাচকভাবে ভাবছে বলে সুপ্রিম কোর্টকে জানানো হয়েছে। মামলাটি এবং সংশ্লিষ্ট জামিনের আবেদন ২৪ মার্চ, ২০২৬-এ শুনানির জন্য তালিকাভুক্ত হয়েছিল। একই সঙ্গে এ পর্যন্ত দাখিল হওয়া সমস্ত স্ট্যাটাস রিপোর্ট নতুন স্বতঃপ্রণোদিত মামলার সঙ্গে একত্রে নথিভুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।

সব মিলিয়ে, বিচার ভবনে দুটি এক্সক্লুসিভ এনআইএ কোর্ট চালুর প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। কলকাতা হাইকোর্টের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে এনআইএ-র গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলির দ্রুত শুনানি ও নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আসবে বলেই মনে করছেন আইনজীবী মহলের একাংশ।