‘গোল্ড ফ্লেক’ মামলায় হাইকোর্টে ধাক্কা ‘আইজেএম গোল্ড স্ট্যাগ’-এর

Photo: ‘গোল্ড ফ্লেক’ মামলায় হাইকোর্টে ধাক্কা ‘আইজেএম গোল্ড স্ট্যাগ’-এর (AI)

‘গোল্ড ফ্লেক’ নিয়ে বড় আইনি লড়াইয়ে আপাতত আইটিসি-র পক্ষেই রায় দিল কলকাতা হাইকোর্ট। ‘গোল্ড’ শব্দটি সাধারণ শব্দ হলেও বছরের পর বছর ধরে ব্যবহারের ফলে তা আইটিসি-র সিগারেটের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে গিয়েছে যে আলাদা বাণিজ্যিক পরিচয় তৈরি হয়েছে। প্রাথমিকভাবে এমনটাই মনে করছে আদালত।

হাইকোর্টের বিচারপতি সব্যসাচী ভট্টাচার্য ও বিচারপতি সুপ্রতিম ভট্টাচার্যের ডিভিশন বেঞ্চ ‘আইজেএম গোল্ড স্ট্যাগ’ নিয়ে একক বেঞ্চের দেওয়া অন্তর্বর্তী নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখেছে। সেই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে করা আপিলও খারিজ হয়েছে। মামলায় আবেদনকারীর পক্ষের মূল বক্তব্য ছিল, ‘গোল্ড’ একটি সাধারণ এবং প্রশংসাসূচক শব্দ। ফলে শুধুমাত্র এই শব্দের উপর আইটিসি একচেটিয়া অধিকার দাবি করতে পারে না।

তাঁদের আরও দাবি, ট্রেডমার্ক রেজিস্ট্রেশনের সময় এআইটিসি নিজেই ‘গোল্ড’ শব্দের উপর একচ্ছত্র অধিকার নিয়ে সতর্কতা দিয়েছিল। তাই পরে সেই শব্দকে কেন্দ্র করে অধিকার দাবি করা যায় না। হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ, কোনও সাধারণ শব্দ দীর্ঘদিন ধরে কোনও নির্দিষ্ট পণ্যের সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত হয়ে গেলে ক্রেতার মনে সেটি নির্দিষ্ট একটি সংস্থার পণ্যের পরিচয় তৈরি করে। তখন সেই শব্দ ‘সেকেন্ডারি মিনিং’ বা আলাদা বাণিজ্যিক অর্থ পেতে পারে।


আইটিসির-র ক্ষেত্রে ‘গোল্ড’ শব্দটি সিগারেটের সঙ্গে ১৯০৫ সাল থেকে ব্যবহার হয়ে আসছে। এই দীর্ঘ ব্যবহারের বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে আদালত। আবেদনকারীর পক্ষের যুক্তি ছিল, ‘গোল্ড’ শব্দটিকে তুলনা থেকে বাদ দিলে আইটিসি-র নাম দাঁড়ায় ফ্লেক। আর প্রতিপক্ষের নাম ‘আইজেএম’ (IJM) ও ‘স্ট্যাগ’ (Stag)। ফলে দুই ব্র্যান্ডের মধ্যে বিভ্রান্তির প্রশ্নই ওঠে না।

এই যুক্তিও আদালত গ্রহণ করেনি। আদালতের নজরে শুধু একটি শব্দ আলাদা করে দেখলে হবে না। ক্রেতার চোখে প্যাকেটের সামগ্রিক চেহারা ও উপস্থাপনাই গুরুত্বপূর্ণ। সিগারেটের প্যাকেটে বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্য সতর্কীকরণ থাকে। আপিলকারী পক্ষ তাই বলেছিল, প্যাকেটের ৮৫ শতাংশ জায়গা যখন সরকারি সতর্কবার্তায় ঢাকা থাকে। তখন ব্র্যান্ডের জন্য বাকি ১৫ শতাংশ জায়গাই তুলনার ক্ষেত্রে দেখা উচিত। হাইকোর্ট সেই পদ্ধতি মানতে রাজি হয়নি।

আদালতের বক্তব্য, একজন সাধারণ ক্রেতা সিগারেটের প্যাকেট কেনার সময় প্যাকেটের মাত্র একটি অংশ আলাদা করে পরীক্ষা করেন না। তিনি পুরো প্যাকেটটাই একসঙ্গে দেখেন। আর ব্র্যান্ড দেখানোর জায়গা যখন মাত্র ১৫ শতাংশ, তখন সেই অল্প জায়গার মধ্যে ব্যবহৃত রং, নকশা, লেখা ও বিন্যাসে সাদৃশ্য থাকলে ক্রেতার বিভ্রান্তির সম্ভাবনা আরও বাড়তে পারে।

আদালতের পর্যবেক্ষণ, ক্রেতা প্যাকেটকে টুকরো টুকরো করে বিচার করেন না। সরকারি স্বাস্থ্য সতর্কবার্তাও প্যাকেটের সামগ্রিক ছবির অংশ। ফলে ‘গোল্ড ফ্লেক’ এবং ‘আইজেএম গোল্ড স্ট্যাগ’-এর প্যাকেটের সামগ্রিক উপস্থাপনা দেখে বাজারে বিভ্রান্তির সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

মামলার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল, ‘আইজেএম গোল্ড স্ট্যাগ’ রেজিস্টার্ড হওয়া সত্ত্বেও তার বিরুদ্ধে আইটিসি কি মামলা করতে পারে? আদালত বলেছে, ট্রেডমার্ক আইনের ২৮ থেকে ৩০ নম্বর ধারা এমন কোনও সম্পূর্ণ বাধা তৈরি করে না যার কারণে মামলা করাই যাবে না। বিশেষ করে আইটিসি যখন প্রতিপক্ষের ট্রেডমার্কের বৈধতাই প্রশ্নের মুখে তুলেছে, তখন আইনের ধারা ১২৪-এর অধীনে সেই বিষয় আদালতে তোলা যেতে পারে। প্রয়োজনে মামলা চলাকালীন অন্তর্বর্তী নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার ক্ষমতাও আদালতের রয়েছে বলে জানিয়েছে ডিভিশন বেঞ্চ।

আদালত আরও জানিয়েছে, ‘ফেজিং অফ’ (passing off)-এর দাবি সাধারণ আইনি অধিকারের ভিত্তিতে তৈরি। শুধু প্রতিপক্ষের কোনও রেজিস্টার্ড ট্রেডমার্ক রয়েছে বলেই এই ধরনের মামলা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যায় না। অর্থাৎ, কোনও ব্র্যান্ডের পরিচিতি নকল করে ক্রেতাকে বিভ্রান্ত করার অভিযোগ থাকলে সেই বিষয়েও আইনি পদক্ষেপের সুযোগ থাকে। মামলাটি কলকাতায় করা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। সেই আপত্তিও খারিজ করেছে আদালত।

ইন্ডিয়ান টোব্যাকো কোম্পানির কলকাতায় প্রধান নিবন্ধিত কার্যালয় থাকায় ট্রেডমার্ক ও কপিরাইট আইনের সংশ্লিষ্ট ধারার অধীনে কলকাতা হাইকোর্টে মামলা করার যথেষ্ট ভিত্তি রয়েছে বলে জানিয়েছে ডিভিশন বেঞ্চ। শেষ পর্যন্ত প্রতিপক্ষ প্রবীণ কুমারের দায়ের করা আপিল খারিজ করে দিয়েছে ডিভিশন বেঞ্চ। ফলে একক বেঞ্চের দেওয়া আইটিসির পক্ষে অন্তর্বর্তী নিষেধাজ্ঞা বহাল রইল।

আরও পড়ুন: ডিম-কাণ্ডে ফের হাইকোর্টে মহুয়া, ‘নিরাপত্তাহীনতা’-র অভিযোগ, খারিজ দ্রুত শুনানির আর্জি

‘গোল্ড’ শব্দটি একেবারে সাধারণ বলেই যে কোনও সংস্থা তা ব্যবহার করতে পারবে, বিষয়টি এত সরল নয়। দীর্ঘদিনের ব্যবহারে কোনও সাধারণ শব্দ যদি নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের পরিচয় হয়ে ওঠে, তাহলে আইনে তার আলাদা গুরুত্ব তৈরি হতে পারে। আর প্যাকেটের ক্ষেত্রে শুধু একটি অংশ নয়, ক্রেতার চোখে ধরা পড়া গোটা ছবিটাই বিবেচনা করতে হবে।