বদলেছে ঠিকানা, বদলায়নি রীতি- রায় চৌধুরী পরিবারের ৩০০ বছরের দুর্গাপুজোয় রয়েছে ইতিহাসের ছোঁয়া

Photo: Statesman (২০২৬ সালের দুর্গাপুজোয় মায়ের প্রতিমা)

জমিদারি আভিজাত্য আর প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা পারিবারিক পরম্পরা, এই তিনের মেলবন্ধনেই স্বতন্ত্র রূপ পেয়েছে রায় চৌধুরী পরিবারের দুর্গাপুজো। প্রায় ৩০০ বছরের প্রাচীন পুজো শুধু দেবী আরাধনার উৎসব নয়, বরং এক বনেদি পরিবারের ইতিহাস ও বিশ্বাসের এক অনন্য কাহিনি। ঢাকার বালিয়াটি জমিদারবাড়ি থেকে কলকাতায় এসে থিতু হওয়া ছয় আনী জমিদারবংশের উত্তরসূরিরা আজও নিষ্ঠার সঙ্গে বহন করে চলেছেন সেই ঐতিহ্যের ধারা।

সময় বদলেছে, বদলেছে ঠিকানা, এসেছে নতুন প্রজন্ম। কিন্তু তারপরেও বদলায়নি পুজোর নিজস্ব রীতিনীতি, দেবী আরাধনার নিয়ম কিংবা পরিবারের আবেগ। আর সেই পরম্পরার হাত ধরেই ২০২৬ সালে, দীর্ঘ ২৪ বছর পর ফের নরেশ রায় চৌধুরীর বংশধরদের দায়িত্বে শোভাবাজারে অনুষ্ঠিত হচ্ছে এই ঐতিহ্যবাহী দুর্গোৎসব। মূলত ছয় আনী জমিদারবংশের দুর্গাপুজো এবং তার দীর্ঘদিনের রীতিনীতি ঘিরে চলছে এই পুজো।

Photo: Statesman (২০২৬ সালের দুর্গাপুজোয় মায়ের প্রতিমা)

দেশভাগের বহু আগেই ছয় আনী জমিদারবংশের উত্তরসূরিরা কর্মসূত্রে কলকাতায় চলে আসেন। পরবর্তীকালে এখানেই তাঁরা সংসার গড়ে তোলেন। এই বংশের অন্যতম সদস্য ছিলেন জমিদার ভূপেন্দ্রমোহন রায় চৌধুরী। তাঁর তিন ছেলে ছিলেন ভবেশ, দেবেশ ও নরেশ রায় চৌধুরী। দেবেশ ছিলেন দত্তকপুত্র। ফলে দুর্গাপুজোর দায়িত্ব ভাগ হয়ে যায় ভবেশ ও নরেশের পরিবারের মধ্যে। দুই পরিবারের মধ্যে ১২ বছরের ব্যবধানে পালা করে পুজো অনুষ্ঠিত হয়।


ভবেশের তিন ছেলে শিশির, মিহির ও সমীর রায় চৌধুরী। অন্যদিকে, নরেশের তিন ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে। তিন ছেলে কৌশিক, তাপস ও অজয় রায় চৌধুরী। এদিকে দুই মেয়ে হলেন সাধনা ও শোভনা। পরবর্তীতে দুজনের বিয়ে হয়ে যাওয়ায় পদবি পরিবর্তন হয়ে যায়। ২০০২ সালে নরেশের বংশধরদের দায়িত্বে পুজো হওয়ার পর দীর্ঘ ২৪ বছর বাদে ২০২৬ সালে ফের তাঁদের বাড়িতে দুর্গাপুজোর আয়োজন। নরেশ রায় চৌধুরীর পরিবারের সদস্যরা বর্তমানে কলকাতার শোভাবাজার এলাকার বাসিন্দা। অন্যদিকে, ভবেশের পরিবারের পালা পড়েছিল ২০১৪ সালে। ফের ২৪ বছর পরে তাঁদের বাড়িতেও দুর্গাপুজো অনুষ্ঠিত হবে। এইভাবেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বেঁচে রয়েছে পারিবারিক ঐতিহ্য।

Photo: Social Media (বালিয়াটি জমিদার বাড়ি)

রায় চৌধুরী পরিবারের পুজো বৈষ্ণব মতে অনুষ্ঠিত হয়। এখানে দেবীকে অন্ন, চাল কিংবা নুনযুক্ত কোনও খাবার ভোগ হিসেবে নিবেদন করা হয় না। সন্দেশও দেওয়া যায় না। কারণ তা ছানা দিয়ে তৈরি করা হয়। তার পরিবর্তে প্যাঁরা বা গুজিয়ার মতো উপযুক্ত মিষ্টি মা-কে ভোগ হিসেবে নিবেদন করা হয়। লুচি, পায়েস, মালপোয়া, নারু, মুড়কি, মোয়া, সুজি এবং বিভিন্ন রকম ফল থাকে দেবীর ভোগের তালিকায়। বাড়িতে তৈরি ক্ষীরও নিবেদন করা যায়। এই বাড়িতে মায়ের পুজোয় বলির কোনও প্রথা নেই। যদিও এককালে চালকুমড়ো বলি দেওয়ার রীতি ছিল।

Photo: Statesman (পদ্মা পূজা)

পঞ্চমী থেকে নবমী পর্যন্ত দেবীকে সম্পূর্ণ নিরামিষ ভোগ নিবেদন করা হয়। এই পরিবারের দুর্গাপুজোর অন্যতম বিশেষ আকর্ষণ দশমীর কনকাঞ্জলি প্রথা। তবে এখানে চাল ফেলার নিয়ম নেই। বিসর্জনের সময় বাড়ির বড় বউ জলভরা ঘট নিয়ে অন্য ঘরে বসে থাকেন। দেবীর বিসর্জন সম্পন্ন হলে সেই ঘটের জল পরিবারের সকলের গায়ে ছিটিয়ে দেওয়া হয়। এরপর ছোটরা বড়দের প্রণাম করে, মিষ্টিমুখের মধ্যে দিয়ে পালিত হয় বিজয়া।

Photo: Statesman (২০২৬ সালের দুর্গাপুজোয় মায়ের প্রতিমা)

দশমীর সকালে ঘট বিসর্জন, দুপুরে পারিবারিক রীতি মেনে মাছ-ভাত খাওয়া এবং বিকেলে সিঁদুর খেলার পর প্রতিমা বিসর্জন। সব মিলিয়ে রায় চৌধুরী পরিবারের দুর্গাপুজো শুধুই ধর্মীয় আচার নয়, বরং ইতিহাস, পারিবারিক বন্ধন এবং বনেদি বাঙালিয়ানার এক জীবন্ত উত্তরাধিকার।