রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় একাধিক মসজিদ থেকে লাউডস্পিকার খুলে ফেলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক। রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের দীর্ঘদিনের নির্দেশিকা এবং আদালতের নির্ধারিত শব্দদূষণ সংক্রান্ত বিধি কার্যকর করতে প্রশাসনের উদ্যোগের পরই পুলিশের বিরুদ্ধে ‘গা-জোয়ারি’র অভিযোগ তুলেছে আইএসএফ এবং পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য জমিয়েত উলামা। অন্যদিকে, বিজেপি রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের মন্তব্য, ‘মসজিদে নামাজ পড়ুন। মন্দিরে মন্ত্রপাঠ করুন। মাইক বাজানোর কী দরকার? বাড়িতে ধর্ম করুন।’ তাঁর এই বিতর্ক আরও উসকে দিয়েছে।
আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকী এবং পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য জমিয়েত উলামার সভাপতি সিদ্দিকুল্লা চৌধুরীর অভিযোগ, পুলিশ আদালতের নির্দেশের ভুল ব্যাখ্যা করছে। তাঁদের দাবি, ১৯৯৬ সালের কলকাতা হাইকোর্টের তৎকালীন বিচারপতি ভগবতী প্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় রায়ে কোথাও মসজিদ বা উপাসনালয় থেকে মাইক খুলে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়নি, বরং নির্ধারিত ডেসিবেলসীমা মেনে ব্যবহারের কথা বলা হয়েছিল। প্রয়োজনে আইনি পদক্ষেপেরও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তাঁরা।
তবে আদালতের রায়ের ব্যাখ্যায় আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশের বক্তব্য, বিষয়টি কোনও নির্দিষ্ট ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নয়, বরং সব ধরনের উপাসনালয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রেই একই আইন প্রযোজ্য। ১৯৯৬ সালে কলকাতা হাইকোর্টের ঐতিহাসিক রায়ে স্পষ্ট বলা হয়েছিল, ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার থাকলেও অন্যের শান্তিপূর্ণ জীবনযাপনের অধিকারে হস্তক্ষেপ করা যায় না। হাসপাতাল, আদালত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ১০০ মিটার এলাকাকে ‘সাইলেন্স জোন’ ঘোষণা, আবাসিক এলাকায় উচ্চক্ষমতার লাউডস্পিকার ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ এবং পরীক্ষার সময় শব্দদূষণ রোধে বিশেষ নির্দেশও দিয়েছিল আদালত।
১৯৯৬ সালে তৎকালীন কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি ভগবতী প্রসাদ বন্দোপাধ্যায় তার নির্দেশ নামায় একেবারে নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করে দিয়েছিলেন একনজরে দেখে নেওয়া যাক….
এলাকা
দিন (সকাল ৬টা–রাত ১০টা)
রাত (রাত ১০টা–সকাল ৬টা)
শিল্পাঞ্চল
৭৫ dB(A)
৭০ dB(A)
বাণিজ্যিক এলাকা
৬৫ dB(A)
৫৫ dB(A)
আবাসিক এলাকা
৫৫ dB(A)
৪৫ dB(A)
সাইলেন্স জোন
৫০ dB(A)
৪০ dB(A)
এছাড়া সুপ্রিম কোর্টের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ ছিল রাত ১০টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত খোলা জায়গায় লাউডস্পিকার বা পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেম ব্যবহার করা যাবে না (আইনে নির্দিষ্ট সীমিত ব্যতিক্রম ছাড়া)।
পরবর্তীকালে ২০০৫ সালে সুপ্রিম কোর্ট সেই নীতিকেই আরও শক্তিশালী করে। সর্বোচ্চ আদালত জানায়, রাত ১০টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত লাউডস্পিকার বা উচ্চ শব্দের যন্ত্র ব্যবহার করা যাবে না, আইনসম্মত বিশেষ অনুমতি ছাড়া। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের নির্ধারিত ডেসিবেলসীমা কঠোরভাবে মানার নির্দেশ দেয় আদালত। সুপ্রিম কোর্ট তার রায়ে কলকাতা হাইকোর্টের ১৯৯৬ সালের সিদ্ধান্তকে জনস্বার্থে অগ্রগামী উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করে স্পষ্ট জানায়, শব্দদূষণ রোধে প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা বরদাস্ত করা যাবে না।
ফলে আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, উৎসব, ধর্মীয় অনুষ্ঠান, রাজনৈতিক সভা বা সামাজিক আয়োজন সব ক্ষেত্রেই নির্ধারিত সময়সীমা ও ডেসিবেলসীমা মেনে চলা এখন কেবল প্রশাসনিক নির্দেশ নয়, আদালত-স্বীকৃত আইনি বাধ্যবাধকতা।