নেতাজির পাশে বিউগল বাজাতে দেখা যায়- এই ব্যক্তিকে চেনেন, এঁর উত্তরাধিকারী কোথায় জানেন?

Image: SNS

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে নেতাজির নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। তবে বর্তমানে তাঁর সেই অবদানকে অনেকে ভূলুন্ঠিত করতে চাইছে। আর সেই প্রেক্ষাপটেই নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আরও বেশি করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছেন। দিকে দিকে নেতাজিকে নিয়ে কুৎসা রটানো বা মূর্তি ভাঙার মতো ঘটনা, নেতাজির আদর্শকে আরও বেশি করে চর্চার অবকাশ তৈরি করে দিয়েছে। নেতাজির সঙ্গে জড়িত বা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ঘটনা আরও বেশি করে আলোচনা করতে হবে আমাদের। গতকাল গিয়েছে বিশ্ব ফটোগ্রাফি দিবস। নেতাজির একটি ছবি খুবই পরিচিত। যেখানে নেতাজি পতাকা তুলছেন আর তার পাশে দাঁড়িয়ে বিউগল বাজাচ্ছেন এক ভদ্রলোক। ছবিতে তাঁকে দেখা গেলেও তাঁর সম্পর্কে বিশেষ একটা তথ্য সাধারণত জানা যায় না।

বিউগল বাজানো ওই ব্যক্তির নাম বঙ্কিমচন্দ্র ঘোষ। নিবাস হাওড়া। ১৯১৪ সালে হাওড়া শহরের রমেন্দু প্রসাদ মজুমদার লেনে জন্মগ্রহণ করেন। খুব ছোট বয়সেই বাবাকে হারান। ফলে পড়াশোনা শুরু হয় একটু দেরিতে। ডানপিটে স্বভাবের বঙ্কিম ওরফে ‘বকি’-র মনে ছোট থেকেই দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিভিন্ন ঘটনা রেখাপাত করত। ‘অসহযোগ আন্দোলন’, ‘ক্ষীরের তলার ট্রেন অবরোধ’, থানা বা কোর্টে ব্রিটিশ পতাকা নামিয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মতো ঘটনা কিশোর বয়স থেকেই তাঁর মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। যা তাঁকে পরবর্তীকালে স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ দিতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। জেলবরণও করেছিলেন তিনি।


তখনও নেতাজির সংস্পর্শে আসেননি তিনি। তবে দেশের জন্য, ব্রিটিশ পরাধীনতা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য তাঁর মন তখন চঞ্চল। আর এখান থেকে তিনি একদিন নিয়ে নিলেন এক সিদ্ধান্ত। কয়েকজনের সঙ্গে চলে গেলেন রাইটার্স বিল্ডিং-এ। সেখানে ব্রিটিশ পতাকা নামানোর কর্মসূচি নিয়ে ফেললেন। আর সেটা করতে গিয়েই রাইটার্স বিল্ডিং-এর সামনে থেকে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হলেন। এরপর শুরু হল বিচারের পালা। বঙ্কিমচন্দ্রের সঙ্গেও আরও ছ’জন ছিলেন সেদিন। ব্যাঙ্কশাল কোর্টে তাঁদের বিচার হল। ১৯৩৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি তাঁদের সশ্রম কারাদণ্ডের নির্দেশ দেওয়া হল। ১৫ থেকে ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রেসিডেন্সি জেলে বন্দি ছিলেন। এরপর তাঁদের হিজলি জেলে স্থানান্তরিত করা হয়। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর ভলান্টিয়ার্স হিসেবি যোগ দেন তিনি।

আরও পড়ুন: সুভাষচন্দ্র :কোচবিহার ও ‘যুদ্ধাপরাধী’ বিতর্ক

১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ফরওয়ার্ড ব্লক দল গঠন করেন। বঙ্কিমচন্দ্র ঘোষ ওরফে ‘বকি’ ফরওয়ার্ড ব্লকে যোগ দেন। ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে রামগড়ের আপস বিরোধী সম্মেলনে এসেছিলেন নেতাজি। সেখানে পতাকা উত্তোলন করেন তিনি। আর নেতাজির পতাকা উত্তোলনের সময় সামরিক পোশাকে সজ্জিত হয়ে বিউগল বাজিয়েছিলেন হাওড়া সেই ডানপিটে ছেলে বঙ্কিমচন্দ্র ঘোষ ওরফে ‘বকি’। সেই ছবি আমরা প্রায়শই দেখি। কিন্তু জানি না তাঁর পরিচয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর হাওড়ার নীলমণি মল্লিক লেনে বাকি জীবন কাটিয়ে দেন। না পেয়েছেন পরিচিতি, না পেয়েছেন স্বীকৃতি। বঙ্কিমচন্দ্রের মতো আরও কত দেশপ্রেমিক যোদ্ধা অন্তরালে থেকে গিয়েছেন, তাঁদের খোঁজ আমরা রাখি না।

রামগড়ের আপস-বিরোধী সম্মেলন সফল করার পিছনে বঙ্কিমচন্দ্র ঘোষের মত স্বেচ্ছাসেবকদের অবদান ছিল অবস্মরণীয়। এর ঠিক এক বছর পর ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ‘হলওয়েল মনুমেন্ট’ আন্দোলনের ডাক দেন। ব্ল্যাক হোলের স্মৃতিস্তম্ভ অপসারণের কর্মসূচি নেওয়া হয়। সেই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন বঙ্কিমচন্দ্র ঘোষ এবং গ্রেপ্তার হন। তবে এবার গ্রেপ্তার হলেও কারাবন্দি করা হয়নি তাঁকে। ব্যাঙ্কশাল কোর্ট তাঁকে ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেয়।

১৯৪১ সাল নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর মহানিষ্ক্রমণের সাল হিসেবে পরিচিত। সেই বছরই ব্রিটিশ সরকার নেতাজির ফরওয়ার্ড ব্লক দলকে বেআইনি হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর দলের নির্দেশে বঙ্কিমচন্দ্র ঘোষ গোপনে দলের হয়ে কাজ করতে থাকেন। ১৯৪৬ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময়ও তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় দেখা যায়। আক্রান্ত মানুষদের পাশে এসে দাঁড়ান তিনি এবং তাঁদের সাহায্য করেন।

১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারতবাসীর সেই কাঙ্ক্ষিত দিন। যে দিনটার অপেক্ষায় ছিল জম্মু-কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী। তবে নেতাজি দ্বিখণ্ডিত ভারতবর্ষের স্বপ্ন দেখেননি। তাই তাঁর অনুগামীরাও দ্বিখণ্ডিত স্বাধীনতা মেনে নিতে পারেননি। স্বাধীনতার দিন কলকাতার বুকে নেতাজির আরেক ছায়াসঙ্গী হরেন্দ্রনাথ ঘোষ, আজাদ হিন্দ সরকারের মন্ত্রী দেবনাথ দাস, নেতাজির ভ্রাতুষ্পুত্র দ্বিজেন্দ্রনাথ বসুর নেতৃত্বে প্রতিবাদ শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। তাতে অংশ নেন ‘বকি’। স্বাধীনতার পর ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ফরওয়ার্ড ব্লক দলে সক্রিয় নেতৃত্ব দিয়েছেন। কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা না পাওয়ার আক্ষেপ নিয়েই ২০০৬ সালের ১২ অক্টোবর নিজ বাসভবনে মৃত্যুবরণ করেন।

আরও পড়ুন: স্বাধীনতার প্রথম দিনে পন্ডিচেরিতে শ্রীঅরবিন্দ

তবে তাঁর মৃত্যুর পর হাওড়া প্রশাসনের তত্বাবধানে শরৎ সদনে একটি আর্কাইভ খোলা হয়েছে। সেই আর্কাইভে  বঙ্কিমচন্দ্র ঘোষ তথা ‘বকি’র স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর অবদান চিত্র সহকারে তুলে ধরা হয়েছে। তিনি যতদিন জীবিত ছিলেন ততদিন নেতাজির আর্দশ বুকে আগলেই বেঁচে ছিলেন। বর্তমানে তাঁর দুই ছেলে এবং দুই মেয়ে জীবিত থাকলেও তাঁর আদর্শ এবং নেতাজির ভাবধারাকে বহন করে নিয়ে চলেছেন তাঁর জামাতা শিবসাধন দে।

শিবসাধন দে শুধু নেতাজির আর্দশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন না তাঁর শ্বশুড় মশাইয়ের ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছেন। স্বাধীনতা সংগ্রামে বঙ্কিমচন্দ্রের অবদান যেমন আর্কাইভ করার চেষ্টা করে চলেছেন তেমনি নেতাজির আদর্শকে বাঁচিয়ে রাখতে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। নতুন প্রজন্ম যাতে নেতাজিকে জানতে, তাঁর আদর্শ বুকে নিয়ে বাঁচতে পারে তার জন্য একের পর এক বই লিখে চলেছেন। তাঁর মধ্যে রয়েছে ‘ছাত্রবেলায় সুভাষ’, ‘২১ অক্টোবর’, ‘স্বাধীনতা সংগ্রামে হাওড়া’, ‘বিপ্লবী হরেন্দ্রনাথ ঘোষ ও সমকালী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট’ ইত্যাদি।

হাওড়ার নীলমণি লেনে এক অজ্ঞাত গলিতে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর স্মৃতি আগলে রেখে বেঁচেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র ঘোষ। বর্তমানে সেখানেই রয়েছে তাঁর উত্তরাধিকারীরা। তাঁর স্মৃতি এবং নেতাজির আদর্শকে বর্তমানে বাঁচিয়ে আরও বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে। আর তাঁদের সেই ব্যাটন নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন হাওড়ার আরেক মানুষ শিবসাধন দে।

দেখুন: নিউ মার্কেটের আগুনের পর ফায়ার অডিটে জোর, হোটেল-রেস্তরাঁ থেকে হাসপাতালে নজরদারি সরকারের