বুধবার সকালে মহারাষ্ট্রের বারামতী বিমানবন্দরে ঘটে ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনা। আর সেই বিমানে ছিলেন মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী অজিত পাওয়ার। ১০০ ফুট উপর থেকে আছড়ে পড়ে মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রীর বিমান। তার পর একের পর এক বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে গোটা এলাকা। বিমান আছড়ে পড়ার আগে আরও এক বার অবতরণের চেষ্টা করেছিল অজিতের বিমান। বিমান যাত্রাপথ পর্যবেক্ষণ ওয়েবসাইট ‘ফ্লাইটরেডার ২৪’ এমনটাই জানিয়েছে। বিমানটিতে অজিত পাওয়ার ছাড়াও ছিলেন আরও চারজন। তাঁদের মধ্যে দু’জন ছিলেন উপমুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তারক্ষী এবং দু’জন ছিলেন বিমানকর্মী। অসামরিক বিমান পরিবহন নিয়ামক সংস্থা ডিজিসিএ জানিয়েছে, দুর্ঘটনায় পাঁচ জনেরই মৃত্যু হয়েছে।
বুধবার সকাল ৮টা নাগাদ একটি ব্যক্তিগত বিমানে মুম্বই থেকে বারামতীর উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলেন মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী তথা এনসিপি নেতা। অবিভক্ত এনসিপির রাজনৈতিক ঘাঁটি বারামতীতে বুধবার চারটি সভা করার কথা ছিল তাঁর। সামনেই জেলা পরিষদের নির্বাচন রয়েছে সেখানে। সেই ভোটের প্রচারেই যাচ্ছিলেন অজিত। কিন্তু তার আগেই দুর্ঘটনাটি ঘটল। সকাল পৌনে ৯টা নাগাদ অজিতকে নিয়ে বারমতী বিমানবন্দরে রানওয়ের ধারে আছড়ে পড়ে বিমান লিয়ারজেট ৪৫।
Advertisement
‘ফ্লাইটরেডার ২৪’-এর তথ্য অনুযায়ী, বিমানটি আছড়ে পড়ার আগেও এক বার রানওয়েতে নামার চেষ্টা করেছিল। তবে তা পারেনি। অবতরণের চেষ্টা প্রথম বার ব্যর্থ হওয়ার পরে আকাশে এক চক্কর কেটে দ্বিতীয় চেষ্টা করেন পাইলট ক্যাপ্টেন শাম্ভবী পাঠক। দ্বিতীয় বার রানওয়েতে নামার সময়েই ভেঙে পড়ে বিমানটি। বারামতী বিমানবন্দরের ম্যানেজার শিবাজি তাওয়াড়ে জানান, অবতরণের সময়ে রানওয়ের একটি ধারে ভেঙে পড়ে লিয়ারজেট ৪৫। মাটিতে আছড়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আগুন ধরে যায় তাতে। কী কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটল, তা এখনও জানা যায়নি। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, রানওয়ে থেকে প্রায় ১০০ ফুট দূরে আছড়ে পড়ে বিমানটি।
Advertisement
বিমানের গতিবিধি নজরদার সংস্থা ফ্লাইটরেডার ২৪ জানিয়েছে, সকাল ৮টা ৩৪ মিনিটে বিমানটি সংকেত পাঠানো বন্ধ করে দেয়। যদিও তা কিছুক্ষণের জন্যই। তার পরেই আবার বিমানটির সংকেত মিলতে শুরু করে। এর পর সকাল ৮টা ৪৩ মিনিটে আবার সব নিস্তব্ধ। অনুমান করা হচ্ছে সেই সময়েই বিমানটি ভেঙে পড়ে। ফ্লাইটরেডার জানিয়েছে, বারামতী বিমানবন্দর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরত্বে ঘটনাটি ঘটে।
আচমকাই বন্ধ হয়ে যায় ‘এডিএস-বি’ সংকেত পাঠানো। সেই সময় বিমানটি ভূপৃষ্ঠ থেকে এক কিলোমিটার উচ্চতায় ছিল। বিমানটির গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ২৩৭ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টায়। বিমানবন্দরের পাশের সড়কপথে লাগানো সিসিটিভি ক্যামেরাতেই ধরা পড়েছে সেই বিস্ফোরণের মুহূর্ত। ভিডিওয় দেখা গিয়েছে, মুহূর্তের মধ্যে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে ছেয়ে গিয়েছে আকাশ।
অবতরণের সময় কি বিমানটির নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিলেন পাইলট? সেই প্রশ্নও উঠতে শুরু করেছে। বিমানটির ব্ল্যাক বক্স বিশ্লেষণ করার পরে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য মিলবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। অসামরিক বিমান পরিবহণ নিয়ামক সংস্থা ডিজিসিএ-র প্রধান ফৈয়জ আহমেদ কিড়াই জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখা শুরু হয়েছে।লিয়ারজেট ৪৫ মডেল-এর ‘ভিটি-এসএসকে’ বিমানটি বম্বার্ডিয়ার এরোস্পেস সংস্থার তৈরি। এই বিমানটিই বুধবার সকালে ভেঙে পড়ে বারামতীতে। লিয়ারজেট ৪৫ মডেলের বিমান অতীতেও দুর্ঘটনার কবলে পড়েছিল।
জানা গিয়েছে, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে বিশাখাপত্তনম থেকে মুম্বইয়ের উদ্দেশে উড়ানের সময়ে দুর্ঘটনার কবলে পড়েছিল একটি লিয়ারজেট ৪৫ বিমান। সেটিতেও অবতরণের সময়েই দুর্ঘটনা ঘটেছিল। এই মডেলের বিমানগুলিতে দু’টি ইঞ্জিন থাকে। সাধারণত এই বিজনেস জেট বিভিন্ন কর্পোরেট এবং ভিআইপি-দের সফরের জন্য ব্যবহৃত হয়। মাঝারি মাপের এই বিমানটি স্বল্প এবং মাঝারি দূরত্বের উড়ানের জন্য উপযুক্ত।
মুম্বই থেকে বারামতী যাওয়ার পথে ভেঙে পড়া এই লিয়ারজেট ৪৫ বিমানটি পরিচালনা করছিল ‘ভিএসআর ভেঞ্চার্স’ নামে একটি সংস্থা। সেই ‘ভিএসআর ভেঞ্চার্স’-এর বিমান দুর্ঘটনাতেই এ বার মৃত্যু হল মহরাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী তথা এনসিপি নেতা অজিতের। উল্লেখ্য, জীবনের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত বারামতীরই জনপ্রতিনিধি ছিলেন অজিত। সাংসদ, বিধায়ক-সমস্ত পদ পেয়েছেন বারামতী থেকে। তাঁর জীবনও শেষ হল ওই বারামতীতেই।
যে এলাকায় দুর্ঘটনাটি ঘটেছে, সেটি পাহাড় এবং জঙ্গলে ঘেরা। প্রাকৃতিক, যান্ত্রিক না অন্য কোনও কারণে দুর্ঘটনা, তা তদন্তের পরেই জানা যাবে বলে জানিয়েছে ডিজিসিএ। অজিত পাওয়ারের মৃত্যুতে শোকপ্রকাশ করেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। বিমান দুর্ঘটনার খবর পেয়েই মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী তথা বিজেপি নেতা দেবেন্দ্র ফডনবিশকে ফোন করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ।
মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় শোকের ছায়া নেমেছে মহারাষ্ট্রে। দাদার মৃত্যুসংবাদ পেয়ে রাজনৈতিক বিবাদ ভুলে ছুটে গিয়েছেন শরদ পাওয়ারের কন্যা সুপ্রিয়া সুলে।বুধবার মহারাষ্ট্রে ছুটি ঘোষণা করেছে সেখানকার সরকার। সে রাজ্যে তিনদিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালিত হবে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।বন্ধু’ অজিতের প্রয়াণে শোকাহত মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশ। সমস্ত কর্মসূচি বাতিল করে বারামতী যাচ্ছেন তিনি। সঙ্গে যাচ্ছেন উপমুখ্যমন্ত্রী একান্ত শিণ্ডেও।
এই বিমান দুর্ঘটনা নতুন করে উসকে দিয়েছে ২০২৫ সালে গুজরাতের আহমেদাবাদে এয়ার ইন্ডিয়ায় দুর্ঘটনার স্মৃতি। সেই দুর্ঘটনায় বিমানে থাকা ১২ জন ক্রু সদস্য এবং ২৩০ জন যাত্রীর মধ্যে মাত্র ১ জন জীবিত ছিলেন। মৃতদের তালিকায় ছিলেন গুজরাতের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বিজয় রূপানি। এর পাশাপাশি জনবহুল স্থানে বিমানটি আছড়ে পড়ায় আরও ১৯ জনের মৃত্যু হয়। মর্মান্তিক সেই দুর্ঘটনার ছবি এবার ফিরল বারামরীতে।
Advertisement



