মাইনে পাওয়ার জন্যে খাতায়কলমে যতটা দরকার, তার বাইরেও কত ঘণ্টা কাজ করেন আপনি? হিসেব কষে দেখেছেন কখনও? সদ্য প্রকাশিত একটি আন্তর্জাতিক সমীক্ষা বলছে, এই প্রশ্নের উত্তরে চমকে উঠতে পারেন খোদ ভারতীয়রাই। বেতনহীন পরিশ্রমে গোটা বিশ্বে এক নম্বরে উঠে এসেছে ভারত।
সমীক্ষা কী বলছে
মার্কিন সংস্থা এডিপি রিসার্চের (ADP Research) ‘পিপল অ্যাট ওয়ার্ক ২০২৬’ (People at Work 2026) শীর্ষক সমীক্ষায় উঠে এসেছে এই তথ্য। ৩৬টি দেশের প্রায় ৩৯ হাজার কর্মীর উপর চালানো এই সমীক্ষা অনুযায়ী, ভারতের প্রতি চারজন কর্মীর একজন, অর্থাৎ কর্মরত জনসংখ্যার ২৪ শতাংশ, সপ্তাহে ১৬ ঘণ্টা বা তার বেশি সময় বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করেন। আরও ৪০ শতাংশ কর্মী সপ্তাহে ৬ থেকে ১৫ ঘণ্টা বিনামূল্যে খাটেন। অর্থাৎ প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভারতীয় কর্মীই সপ্তাহে অন্তত ৬ ঘণ্টা বাড়তি কাজ করেন, যার জন্য কোনও মজুরি মেলে না।
গোটা বিশ্বের ছবিটা কিন্তু এতটা কঠিন নয়। বিশ্বব্যাপী ৬২ শতাংশ কর্মী সপ্তাহে পাঁচ ঘণ্টার কম বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করেন। ২৬ শতাংশের ক্ষেত্রে তা ৬ থেকে ১৫ ঘণ্টা। আর ১৬ ঘণ্টা বা তার বেশি বেতনহীন পরিশ্রম করেন মাত্র ১২ শতাংশ কর্মী। এই নিরিখে তুর্কিয়ে (২৩ শতাংশ), অস্ট্রিয়া (২১ শতাংশ) এবং আমেরিকা (২০ শতাংশ) ভারতের ধারেকাছে থাকলেও শীর্ষস্থান দখলে রেখেছে ভারতই। অন্যদিকে চেক প্রজাতন্ত্রে এই হার সবচেয়ে কম, মাত্র ৪ শতাংশ। চিন, তাইওয়ান ও জাপানেও এই হার ৬ শতাংশের আশপাশে।
কাদের ঘাড়ে বেশি বোঝা
সমীক্ষায় একটি আকর্ষণীয় প্রবণতাও ধরা পড়েছে। পদের সিঁড়িতে যত উপরে উঠবেন, বিনা পয়সার কাজের বোঝাও তত বাড়বে। ঊর্ধ্বতন ম্যানেজার এবং সিনিয়র নেতৃত্বের প্রায় অর্ধেকই সপ্তাহে অন্তত ৬ ঘণ্টা বিনামূল্যে কাজ করেন বলে জানিয়েছেন, আর ২০ শতাংশ করেন ১৬ ঘণ্টা বা তার বেশি। অথচ সাধারণ কর্মীদের মধ্যে এই হার মাত্র ৯ শতাংশ।
কর্মক্ষেত্রের ধরনও এখানে বড় ভূমিকা নেয়। বাড়ি থেকে কাজ করা অর্থাৎ রিমোট ওয়ার্কাররা (remote workers) সবচেয়ে বেশি বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করেন, ১৩ শতাংশ কর্মীর ক্ষেত্রে তা ১৬ ঘণ্টা বা তার বেশি। অফিসে বসে কাজ করা কর্মীদের মধ্যে এই হার তুলনায় কম, মাত্র ১২ শতাংশ। ঘরে বসে কাজ আর অফিসের কাজের সীমারেখা যে ক্রমশ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে, এই তথ্য তারই ইঙ্গিত দেয়। তরুণ কর্মীদের মধ্যেও অফিস সময়ের পরে কাজ চালিয়ে যাওয়ার প্রবণতা বেশি বলে জানিয়েছে সমীক্ষা।
বেশি খাটুনি মানেই কি বেশি ফল
সমীক্ষার সবচেয়ে চমকপ্রদ অংশ সম্ভবত এটাই। বেশি সময় বিনামূল্যে কাজ করলেই যে কাজের ফল ভালো হয়, এমন কোনও প্রমাণ মেলেনি। বরং যাঁরা বিনা পারিশ্রমিকে বেশি কাজ করেন, তাঁদের মধ্যেই উৎপাদনশীলতা বা প্রোডাক্টিভিটি (productivity) কমে যাওয়ার অভিযোগ বেশি। কাজে নিজেকে সম্পূর্ণ ভাবে জড়িয়ে ফেলার অনুভূতি এবং কাজের মধ্যে অর্থ খুঁজে পাওয়ার প্রবণতা তাঁদের মধ্যে বেশি দেখা গেলেও, তার পাশাপাশি বেড়েছে ক্লান্তি, কমেছে উন্নতির ইচ্ছা এবং বেড়েছে চাকরি বদলের ইচ্ছাও।
পশ্চিমবঙ্গের ছবিটা কেমন
কলকাতার সেক্টর ফাইভ বা নিউটাউনের আইটি করিডরে (IT corridor) কাজ করা কর্মীদের কাছে এই ছবিটা খুব অচেনা নয়। অতিমারির পরে হাইব্রিড ও রিমোট কাজের সংস্কৃতি এখানেও জাঁকিয়ে বসেছে, আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে অফিস টাইমের বাইরেও ল্যাপটপ খোলা রাখার বাধ্যবাধকতা। মেসেজের উত্তর দিতে হবে, ডেডলাইন মেটাতে হবে, এমন চাপ প্রতিদিনের বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে অনেকের জীবনে।
এই ছবির আরেকটি দিকও আছে, যা অফিসের গণ্ডি ছাড়িয়ে ঘরের চৌকাঠ পর্যন্ত বিস্তৃত। জাতীয় পরিসংখ্যান দপ্তরের (MOSPI) সময় ব্যবহার সমীক্ষা বলছে, ঘরের কাজে ভারতীয় মহিলারা পুরুষদের তুলনায় বহুগুণ বেশি সময় ব্যয় করেন প্রতিদিন, যদিও তার কোনও আর্থিক মূল্য জাতীয় আয়ের হিসেবে ধরাই হয় না। রান্নাঘর থেকে অফিসের ডেস্ক, দুই জায়গাতেই বিনা পারিশ্রমিকের এই খাটুনি আসলে একই সমস্যার দুটি মুখ।
সমাধানের পথ কোথায়
উৎপাদনশীলতা, কর্মীদের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতা এবং প্রতিষ্ঠানে টিকে থাকার ইচ্ছা, তিনটিই ধাক্কা খেতে পারে যদি বিনা পারিশ্রমিকের কাজের এই প্রবণতা এভাবেই বাড়তে থাকে। সতর্ক করছেন সমীক্ষকরা। শুধুমাত্র হাজিরার খাতা বা অফিসে কাটানো ঘণ্টার হিসেব দেখে কর্মীদের প্রকৃত কর্মচাপ বোঝা সম্ভব নয়, এই বার্তাও স্পষ্ট দিয়েছে রিপোর্টটি। নিয়োগকারী সংস্থাগুলির কাছে এটি একটি জরুরি সংকেত, ওয়র্ক আওয়ার বা কাজের সময়ের স্পষ্ট সীমারেখা নির্দিষ্ট না করলে, আখেরে ক্ষতি প্রতিষ্ঠানেরই।




