ভারতের ৭৭তম প্রজাতন্ত্র দিবস এ বছর স্পষ্ট কূটনৈতিক তাৎপর্য বহন করছে। এই প্রথমবার, ইউরোপীয় ইউনিয়নের দুই শীর্ষ নেতা একসঙ্গে ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দিলেন। তাঁরা হলেন ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন এবং ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও লুইস সান্তোস দা কোস্তা।
এই আমন্ত্রণ শুধুই আনুষ্ঠানিক নয়। প্রায় দুই দশক ধরে চলা আলোচনার পর, বাণিজ্য, নিরাপত্তা এবং কৌশলগত সহযোগিতায় বড় সিদ্ধান্তের দিকে এগোচ্ছে ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। সেই প্রেক্ষিতেই এই সফরকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে উভয় ইউরোপীয় নেতা ২৫ থেকে ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় সফরে ভারতে অবস্থান করছেন।
Advertisement
ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও লুইস সান্তোস দা কোস্তা ১৯৬১ সালে লিসবনে জন্মগ্রহণ করেন। পর্তুগালের অন্যতম অভিজ্ঞ রাজনীতিক হিসেবে তিনি পরিচিত। তাঁর পরিবারে পর্তুগিজ, ভারতীয় এবং মোজাম্বিকীয় শিকড় রয়েছে। এই বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশেই বেড়ে ওঠার ফলে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও সংলাপের প্রতি তাঁর বিশেষ আস্থা তৈরি হয়েছে।
Advertisement
লিসবন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক হওয়ার পর তিনি পর্তুগিজ সোশ্যালিস্ট পার্টির মাধ্যমে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ন্যায়মন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র ও রাষ্ট্রবিষয়ক মন্ত্রী এবং লিসবনের মেয়রের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তিনি পালন করেছেন। ২০১৫ সালে তিনি পর্তুগালের প্রধানমন্ত্রী হন এবং টানা নয় বছর সেই পদে ছিলেন। তাঁর আমলে পর্তুগালের অর্থনীতি স্থিতিশীল হয়, কর্মসংস্থান বাড়ে এবং নবীকরণযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়। এই ঐকমত্য গঠনের দক্ষতার কারণেই ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে তাঁকে ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিয়োগ করা হয়।
অন্যদিকে, ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েনের জন্ম ১৯৫৮ সালে। পেশায় চিকিৎসক হলেও তিনি গত দুই দশকের বেশি সময় ধরে সক্রিয়ভাবে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। ২০০৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত জার্মান সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রিত্ব সামলেছেন—পরিবার ও যুবকল্যাণ, শ্রম এবং প্রতিরক্ষা দপ্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র তাঁর অভিজ্ঞতার অন্তর্ভুক্ত।
২০১৯ সালে তিনি ইউরোপীয় কমিশনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ২০২৪ সালের জুলাই মাসে দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য পুনর্নির্বাচিত হন। তাঁর নেতৃত্বে ইউরোপ অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার দিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।
সম্প্রতি এক বক্তব্যে উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, ভারত ও ইউরোপ “কৌশলগত অংশীদারিত্ব, সংলাপ ও উন্মুক্ততার পথ” বেছে নিয়েছে। তিনি আরও জানান, উভয় পক্ষ পারস্পরিক স্থিতিস্থাপকতা গড়ে তুলছে।
দাভোসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে তিনি ভারত-ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাণিজ্য চুক্তির গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ‘এখনও কিছু কাজ বাকি আছে, তবে আমরা একটি ঐতিহাসিক চুক্তির দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি। অনেকে একে ‘সবচেয়ে বড় চুক্তি’ বলছেন। এই চুক্তির ফলে ২০০ কোটি মানুষের একটি বাজার তৈরি হবে, যা বৈশ্বিক মোট উৎপাদনের প্রায় এক-চতুর্থাংশের সমান।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রজাতন্ত্র দিবসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতৃত্বের উপস্থিতি আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের কৌশলগত অবস্থান আরও দৃঢ় করবে।
Advertisement



