• facebook
  • twitter
  • youtube
Friday, 3 July, 2026

প্রয়াত উত্তরাখণ্ডের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বিসি খাণ্ডুরি

উত্তরাখণ্ডের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ও প্রাক্তন সেনা আধিকারিক ভুবন চন্দ্র খাণ্ডুরির ৯১ বছর বয়সে মৃত্যু। তাঁর রাজনৈতিক ও সামরিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন।

প্রয়াত উত্তরাখণ্ডের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বিসি খাণ্ডুরি

ফাইল চিত্র

উত্তরাখণ্ডের রাজনীতিতে এক যুগের অবসান। মঙ্গলবার প্রয়াত হলেন উত্তরাখণ্ডের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ভুবন চন্দ্র খাণ্ডুরি। দীর্ঘ অসুস্থতার পর দেহরাদূনের একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯১ বছর। তাঁর প্রয়াণের খবরে উত্তরাখণ্ডজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। রাজনৈতিক মহল থেকে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।

মেজর জেনারেল পদমর্যাদার সেনা আধিকারিক হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছিলেন বি সি খাণ্ডুরি। পরে সক্রিয় রাজনীতিতে এসে নিজস্ব সততা, শৃঙ্খলা এবং কঠোর প্রশাসনিক মানসিকতার জন্য বিশেষ পরিচিতি তৈরি করেন তিনি। সম্প্রতি দেহরাদূনের ম্যাক্স হাসপাতালে বয়সজনিত নানা শারীরিক সমস্যার জন্য তাঁর চিকিৎসা চলছিল। সেখানেই মৃত্যু হয় তাঁর।

প্রসঙ্গত, ১৯৩৪ সালের ১ অক্টোবর দেহরাদূনে জন্মগ্রহণ করেন ভুবন চন্দ্র খাণ্ডুরি। এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়, পুনের সামরিক প্রকৌশল মহাবিদ্যালয়, দিল্লির ইঞ্জিনিয়ার্স প্রতিষ্ঠান এবং সেকেন্দরাবাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেন তিনি। ছাত্রজীবন থেকেই দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের আবহ তাঁর মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

১৯৫৪ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত প্রায় ৩৬ বছর ভারতীয় সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। সেনাবাহিনীর প্রধান প্রকৌশলী থেকে শুরু করে সামরিক সদর দপ্তরের অতিরিক্ত সামরিক সচিবের মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব সামলেছেন। দেশের প্রতি অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৮২ সালে তাঁকে ‘অতি বিশিষ্ট সেবা পদক’ প্রদান করা হয়।

সেনা জীবন শেষ হওয়ার পর নব্বইয়ের দশকে রাম মন্দির আন্দোলনের সময় ভারতীয় জনতা পার্টিতে যোগ দেন খাণ্ডুরি। ১৯৯১ সালে প্রথমবার গাঢ়ওয়াল কেন্দ্র থেকে লোকসভায় নির্বাচিত হন। পরে ১৯৯৮, ১৯৯৯ এবং ২০০৪ সালেও একই কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়ে তিনি চারবার সাংসদ হন।

অটলবিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের আমলে খাণ্ডুরি সড়ক পরিবহণ ও জাতীয় সড়ক দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে পূর্ণমন্ত্রীও হন। তাঁর সময়েই দেশের জাতীয় সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প এবং ‘গোল্ডেন কোয়াড্রিল্যাটারাল’ প্রকল্প দ্রুতগতিতে এগোয়। দেশের চারটি প্রধান মহানগরকে আধুনিক সড়কপথে যুক্ত করার এই প্রকল্প বাস্তবায়নে তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতা বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়।

তিনি ২০০৭ সালে উত্তরাখণ্ড বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির জয়ের ক্ষেত্রে তাঁর নেতৃত্ব ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ৮ মার্চ মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরই প্রশাসনে কড়াকড়ি আরোপ করেন। রাজনৈতিক নেতা এবং আমলাদের নিরাপত্তা কমানো, বিদেশ সফরের খরচ নিয়ন্ত্রণ এবং মুখ্যমন্ত্রীর বিশেষ তহবিল ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপের মতো একাধিক সাহসী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন তিনি।

তবে ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে উত্তরাখণ্ডে বিজেপির খারাপ ফলের পর দলের ভিতরে চাপ বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত ওই বছরের জুন মাসে মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেন খাণ্ডুরি। পরে ২০১১ সালে ফের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় এসে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নেওয়ার বার্তা দিয়ে শক্তিশালী লোকায়ুক্ত গঠনের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিলেন।

কিন্তু ২০১২ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায়। খাণ্ডুরিও কোটদ্বার কেন্দ্র থেকে পরাজিত হন। এরপর রাজ্যপালের কাছে ইস্তফাপত্র জমা দেন। বর্তমানে তাঁর কন্যা ঋতু ভূষণ খাণ্ডুরি উত্তরাখণ্ড বিধানসভার অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। রাজ্যের প্রথম মহিলা অধ্যক্ষ হিসেবে ইতিহাস গড়েছিলেন তিনি।

খাণ্ডুরির মৃত্যুতে রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে শোকপ্রকাশ করেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। অনেকেই তাঁকে উত্তরাখণ্ড রাজনীতির ‘সৎ এবং শৃঙ্খলাপরায়ণ মুখ’ বলে উল্লেখ করেছেন। সমাজের একাংশের মতে, তাঁর প্রয়াণে রাজ্যের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিসরে এক অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি হল।