কলকাতার পাথুরিয়াঘাটায় রয়েছে এক রাজকীয় প্রাসাদ, নাম খেলাত ভবন (Khelat Bhawan)। ৪৭ নম্বর পাথুরিয়াঘাটা স্ট্রিটে অবস্থিত এই বাড়িটি পুরনো কলকাতার ঐতিহ্য ও বনেদিয়ানার এক জীবন্ত রূপকথা। এই প্রাসাদের আনাচেকানাচে ছড়িয়ে রয়েছে শহরের অতীত ইতিহাস, আভিজাত্য এবং সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক পরম্পরার নানা অজানা কাহিনি।
খেলাতচন্দ্র ঘোষ ছিলেন গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসের কেরানি রামলোচন ঘোষের নাতি। হেস্টিংসের আমলে তিনি হুগলির করটিয়া গ্রাম থেকে পাথুরিয়াঘাটা স্ট্রিটে চলে আসেন। এখানে একটি বাড়ি তৈরি করেন। ১৮২৯ সালে এই বাড়িতেই খেলাতচন্দ্র ঘোষের জন্ম হয়। তিনি ছিলেন একজন অত্যন্ত বিদ্বান ব্যক্তি। সফল ব্যবসায়ী হওয়ার পাশাপাশি তিনি তাঁর ধর্মীয়, আধ্যাত্মিকতা এবং জনহিতকর কাজের জন্যও পরিচিত ছিলেন। তিনি এই খেলাত ঘোষ ম্যানশনটি নির্মাণ করেন। যা এক শতাব্দী পরেও শহরের একটি বিশিষ্ট নিদর্শন হিসেবে রয়ে গিয়েছে।
১৮৪৪ সালে ভবনটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। দুই বছরের মধ্যে নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছিল। এই বাড়িটির কেন্দ্রে রয়েছে একটি খোলা উঠোন, যার দু’পাশে রয়েছে দীর্ঘ করিডোর এবং মার্বেলের সিঁড়ি দিয়ে সেখানে পৌঁছে যাওয়া যায়। বেলজিয়ামের কাচের আয়না, ঝাড়বাতি এবং নানা মূল্যবান শিল্পসামগ্রী। কলকাতা পুরসভার ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যের তালিকায় বাড়িটির স্বীকৃতি রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। বর্তমানে ঐতিহ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি বাড়িটির কিছু অংশ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও অতিথি আপ্যায়নের কাজেও ব্যবহৃত হচ্ছে।
আরও পড়ুন: শরৎ এল রে: কলম দিয়ে দেবী আরাধনা, ১৩ হাজার কলমে তৈরি দুর্গার মূর্তি
এবার এই ঐতিহাসিক বনেদি বাড়ির দরজা খুলে দেওয়া হচ্ছে সাধারণ মানুষের জন্য। দুর্গাপুজোর সপ্তমীর দিন আয়োজন করা হয়েছে ভোগের। খেলাত ভবনের বর্তমান বংশদর প্রদীপ্ত ঘোষ জানিয়েছেন, এই উদ্যোগের মাধ্যমে মানুষ ফিরে পেতে পারেন হারিয়ে যাওয়া কলকাতার বাবুদের বাড়ির রান্নার স্বাদ। উনিশ শতকে যখন কলকাতার ধনী পরিবারগুলির হাত ধরে শিল্প, সাহিত্য, সংগীত এবং ধর্মীয় উৎসবের বিকাশ ঘটছিল, তখন এই বাড়িও হয়ে উঠেছিল আভিজাত্য ও সাংস্কৃতিক চর্চার অন্যতম কেন্দ্র।
এই বাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বহু বিশিষ্ট মানুষের স্মৃতি। ১৮৮৩ সালের ২১ জুলাই শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব এই বাড়িতে এসেছিলেন বলে মনে করা হয়। যদিও এই সাল নিয়ে কিছু ভিন্ন মত রয়েছে। পরবর্তী সময়ে মহাত্মা গান্ধী, ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ এবং ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণনের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের নামও এই প্রাসাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় একসময় ঘোষ পরিবারের দেওয়ান হিসেবে কাজ করেছিলেন বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। ফলে এই বাড়ির ইতিহাস শুধু জমিদারি ঐশ্বর্যের কাহিনি নয়, সাহিত্য, ধর্ম ও সমাজজীবনের নানা অধ্যায়েরও সাক্ষী।
আরও পড়ুন: শরৎ এল রে: শিলিগুড়ি সেন্ট্রাল কলোনিতে এবার ১০০ কেজি সোনার গয়নায় সাজছেন উমা
বাংলার বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজো মানেই সাবেকি আচার, ঠাকুরদালানের আবহ, ঢাকের বাদ্যি আর ভোগের থালা ঘিরে ব্যস্ততা। আর এই ভোগ বহন করে সেই সময়ের বনেদি বাড়িগুলির খাদ্যসংস্কৃতি। পুরনো কলকাতার বাবুদের বাড়িতে পুজোর দিনে কী রান্না হতো, ভোগের থালায় কী থাকত, কোন কোন পদে তৃপ্ত হতেন অতিথিরা—সেই স্মৃতি আজও বাঙালির কাছে বিশেষ আকর্ষণের।
এবার বনেদি বাড়ির খাবারের স্বাদ নিয়ে হাজির হয়েছে খেলাত ভবন (Khelat Bhawan)। বংশধর প্রদীপ্ত ঘোষ জানিয়েছেন, এ বছরে সপ্তমীতে সাধারণ মানুষের জন্য থাকছে বনেদি বাড়ির ভোগের আয়োজন। জমিদার বাড়ির প্রাচীন স্থাপত্য দেখার পাশাপাশি মিলবে কলকাতার বনেদি বাড়ির খাবারের স্বাদও। পুরনো কলকাতার ইতিহাস জানতে যাঁরা আগ্রহী তাঁদের কাছে এ এক অনন্য সুযোগ। খেলাত ভবনের (Khelat Bhawan)নিজস্ব ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ওই দিনের জন্য বুকিং করা যাবে। সপ্তমীতে ভোগে কী কী আয়োজন থাকছে এবং বুকিংয়ের শর্তাবলি ওয়েবসাইট থেকে জেনে নিতে হবে। এই উদ্যোগের বিশেষত্ব হল, এটি শুধু খাবারের আয়োজন নয়; বরং পুরনো কলকাতার বনেদি বাড়ির রন্ধন ঐতিহ্যকে নতুন করে মানুষের সামনে তুলে ধরার একটি প্রচেষ্টা।
একদিকে প্রাচীন ঠাকুরদালান, অন্যদিকে বনেদি বাড়ির রান্নার স্বাদ—দুইয়ের মিলনে ফিরে দেখা যাবে সেই কলকাতাকে, যেখানে পুজোর আনন্দের সঙ্গে মিশে থাকত বাবুদের আভিজাত্য, অতিথি আপ্যায়ন আর রসনাতৃপ্তির দীর্ঘ ঐতিহ্য। ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে আসা সেই কলকাতাকে এবার শুধু চোখে দেখা নয়, চেখেও দেখার সুযোগ এনে দিচ্ছে খেলাত ভবন। সপ্তমীর ভোগের থালায় থাকবে এমন এক শহরের গল্প, যে শহর আজও ভোলেনি তার পুরনো দিনের কথা।
দেখুন:<iframe width=”560″ height=”315″ src=”https://www.youtube.com/embed/N6g_XzAG6tA?si=pZUbylNzxJpKpqaP” title=”YouTube video player” frameborder=”0″ allow=”accelerometer; autoplay; clipboard-write; encrypted-media; gyroscope; picture-in-picture; web-share” referrerpolicy=”strict-origin-when-cross-origin” allowfullscreen></iframe>