সাবেকি দুর্গা (Durga Puja) প্রতিমার পিছনে আমরা অনেক সময় চালচিত্র (Chalchitra) দেখতে পাই। চালচিত্র হল দেবদেবীর প্রতিমার মাথার উপর কিংবা পিছনের সচিত্র ছাদ বা আচ্ছাদন। চালচিত্রকে (Chalchitra) দেশীয় রীতি মনে হলেও এর আগমন এশিয়া মাইনর বা ফ্রিজিয়া থেকে। মন্দিরের চালের প্রতীক হিসেবে অর্ধবৃত্তাকার প্রেক্ষাপট যুক্ত হত। এখনও তুর্কীর ইফেসাস বা আপাসা মন্দিরে গেলে যিশুর জন্মের আগের চালচিত্র (Chalchitra) দেখা যাবে। সপ্তদশ শতাব্দীতে বাংলায় দুর্গাপুজো শুরু হলেও প্রথমেই চালচিত্রের (Chalchitra) প্রচলন হয়নি। ধীরে ধীরে তা বাংলার ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে গিয়েছে।
দেবদেবীর কাহিনিমূলক পটচিত্র, যা প্রধানত অর্ধগোলাকৃতি হয়ে থাকে। ‘চাল’ শব্দের অর্থ আচ্ছাদন। প্রতিমার চালির উপরে আঁকা হয় বলে এর নাম চালচিত্র (Chalchitra) । এই চালচিত্র (Chalchitra) বা চালির বিভিন্ন ভাগ রয়েছে। তার উপর নির্ভর করে প্রতিমা। ‘বাংলা চেলি’-বঙ্গদেশের সবথেকে পুরনো চালি। মনে করা হয় কৃষ্ণনগরের মৃৎশিল্পীরা এই চালির প্রচলন করেন। এই চালি কিছুটা অর্ধচন্দ্রাকার হয়। একচালার প্রতিমার মূল কাঠামোয় দেবীপ্রতিমার পিছনে উপরের দিকে যুক্ত থাকে। প্রতিমার একচালার কাঠামোর চেয়ে অনেক বড় হয়। এতটাই বড় হয় যে অর্ধচন্দ্রাকার এই চালি কাঠামো ছাড়িয়ে কাঠামোর বাইরে দুই পাশে কিছুটা ঝুলে থাক। মহাদেব ও চণ্ডীর কাহিনি এই চালিতে আঁকা থাকে। মূলত কৃষ্ণনগর রাজবাড়িতে দুর্গাপ্রতিমায় এই ‘বাংলা চালি’ লক্ষ্য কার যায়।
একচালার দেবী প্রতিমার (Durga Puja) পিছনে তিন শিখর বিশিষ্ট চালার নিচের দিকে আবার তিনটি অর্ধচন্দ্রাকার চালা থাকে তাকে ‘মঠচৌরি চালি’। পিছনের শিখর তিনটি কিছুটা দ্রাবিড় স্থাপত্যের আদলে তৈরি, প্রবেশ তোরণের মত দেখতে। ‘বাংলা চালি’তে কোনও পৃথক শিখরের অস্বিত্ব থাকে না। তার পরিবর্তে একটানা একটি অর্ধাচন্দ্রাকার চালি থাকে। এই তিন শিখর বিশিষ্ট চালা শাক্তশাস্ত্র গুলির সত্ত্ব-রজ:-তম গুণকে ইঙ্গিত করে। কলকাতার হাটখোলার দত্তবাড়িতে ‘মঠচৌরি চালি’র ব্যবহার দেখা যায়। যে সকল দুর্গাপ্রতিমায় (Durga Puja) এই চালি ব্যবহার করা হয় সেই সব প্রতিমা প্রাচীন বাংলা রীতিতে নির্মিত। প্রতিমার পরনে মাটির শাড়ি থাকে। পটুয়ার তুলিতে জীবন্ত হয়ে ওঠে এই শাড়ি। রং তুলি দিয়ে শাড়িতে আঁকা থাকে চণ্ডীর কাহিনি। সাবেক ডাকের সাজের প্রতিমায় দেবীর বাহন হিসেবে থাকে সিংহ ।
তিন শিখর বিশিষ্ট মঠচৌরি চালি থেকে তিনটি অর্ধচন্দ্রাকার চালা সরিয়ে ফেললে যে নতুন চালা তৈরি হয় তাকে ‘টানাচৌরি চালি’ বলে। এখানে অর্ধচন্দ্রাকার অংশটি থাকে না। তার পরিবর্তে পরপর তিনটি শিখর একটানা একটি সরলরেখায় বসানো থাকে বলেই এই চালির নাম ‘টানাচৌরি’। তিনটি শিখরকে শাক্তদর্শনের সত্ত্ব, রজ ও তম গুণের প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়। বাংলার চৌধুরী উপাধি যুক্ত জমিদার বাড়িগুলিতে এই চালির ব্যবহার দেখা যায়। তাই এই চালিকে চৌধুরীদের নিজস্ব চালিও বলা হয়। তাই এর অপর না ‘চৌধুরী চালি’।
আরও পড়ুন: শরৎ এল রে: ঐতিহ্য, জাঁকজমক ও ইতিহাসের মেলবন্ধন বঙ্কিমচন্দ্রের বাড়ির দুর্গাপুজো
বর্তমানে পারিবারিক ও সার্বজনীন সাবেকি পুজোগুলির অধিকাংশ পুজোর প্রতিমায় ‘মার্কিনি চালি’ দেখা যায়। এই চালিতে আধুনিক স্থাপত্য লক্ষ্য করা যায়। একচালার প্রতিমার পিছনে অর্ধবৃত্তাকার একটি চালা থাকে, অকালের স্রোতে চালচিত্র হারিয়েছে তার আভিজাত্য এবং শিল্প-সূক্ষ্মতা। সময়ের স্রোতে চালচিত্র হারিয়েছে তার আভিজাত্য এবং শিল্প-সূক্ষ্মতা। দিনে দিনে উধাও হয়েছে তার সাবেক জৌলুস। আজ শুধু নিয়ম রক্ষার্থে টিকে আছে চালচিত্র (Chalchitra) । দিনে দিনে কমে আসছে চালচিত্র (Chalchitra) শিল্পীও। আর যাঁরা টিকে আছেন তাঁরা কোন রকমে পেটের দায়ে ধরে রেখেছেন প্রাচীন এই ঐতিহ্য।
দেখুন:<iframe width=”560″ height=”315″ src=”https://www.youtube.com/embed/QpMtnNwskj4?si=b6T_YdQoEDdw_07G” title=”YouTube video player” frameborder=”0″ allow=”accelerometer; autoplay; clipboard-write; encrypted-media; gyroscope; picture-in-picture; web-share” referrerpolicy=”strict-origin-when-cross-origin” allowfullscreen></iframe>