Shyamakatha: বাংলার হংসেশ্বরী মন্দিরের পরতে পরতে রয়েছে তন্ত্রদর্শন এবং মানবচেতনার রহস্য

Image: SNS

হুগলির বাঁশবেড়িয়ার হংসেশ্বরী মন্দিরের (Hangseshwari Temple) তেরোটি পদ্মকলির মতো চূড়া এবং পাঁচটি স্তর বাংলার মন্দির স্থাপত্যে এক অনন্য সংযোজন। স্থাপত্যের পাশাপাশি তন্ত্রদর্শন, আধ্যাত্মিক ভাবনা এবং মানবচেতনার প্রতীকী ব্যাখ্যার জন্যও এই মন্দির বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

পদ্মের উপর রয়েছেন দেবী হংসেশ্বরী। সেই পদ্মের ডাঁটি উঠে এসেছে শায়িত শিবের নাভি থেকে। দেবী ও মহাদেবের এই যুগল অবস্থআন কেবল ভক্তি বা উপাসনার প্রতীক নয় বরং এর মধ্যে নিহিত রয়েছে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অস্তিত্ব ও সৃষ্টির এক গভীর দর্শন।

মন্দিরের ইতিহাস সম্পর্কে আঞ্চলিক ইতিহাসবিদ পার্থ চট্টোপাধ্যায় জানান, এই অসাধারণ স্থাপত্যের সূচনা হয়েছিল অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে এবং উনিশ শতকের গোড়ায়। রাজা নৃসিংহদেব রায় ১৭৯৯ সালে মন্দির নির্মাণের কাজ শুরু করেন।  ১৮০২ সালে তাঁর মৃত্যু হওয়ায় নির্মাণ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। পরে তাঁর স্ত্রী রানি শঙ্করী সেই কাজের দায়িত্ব নেন। তাঁর উদ্যোগেই ১৮১৪ সালে মন্দির নির্মাণ সম্পূর্ণ হয়।


Hangseshwari Temple

পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের কথায়, ‘এই মন্দিরের ইতিহাসে রানি শঙ্করীর ভূমিকা এক বিশেষ  মাত্রা যোগ করেছে। এক রাজার আধ্যাত্মিক ও স্থাপত্যগত স্বপ্ন তাঁর মৃত্যুর পরেও হারিয়ে যায়নি। এক নারীর দৃঢ় সংকল্পে সেই অসমাপ্ত স্বপ্ন বাস্তব রূপ পেয়েছিল।‘

হংসেশ্বরী মন্দিরের (Hangseshwari Temple) গর্ভগৃহে দেবীকে একটি পদ্মের উপর দেখা যায়, যার ডাঁটি শায়িত শিবের নাভি থেকে উঠে এসেছে। দেবী ও শিবের এই বিশেষ মূর্তিবিন্যাস মন্দিরটিকে এক স্বতন্ত্র তাৎপর্য দান করেছে।

আরও পড়ুন: Shyamakatha: শ্মশানে পূজিতা হন এই দেবী, সামনে থাকে শবদেহ, তাই তিনি শ্মশান কালী

পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের ব্যাখ্যা, ‘শায়িত শিবের নাভি থেকে উঠে আসা পদ্মের উপর দেবীর অবস্থানকে শিব ও শক্তির পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। শিব চেতনার আধার, আর শক্তি সেই চেতনার সৃজনশীল প্রকাশ। পদ্ম এখানে সেই প্রকাশের প্রতীকী ক্ষেত্র। ফলে দেবীকে কেবল একটি অলংকারময় পদ্মের উপর বসানো হয়েছে, এমনটা ভাবলে ভুল হবে। এই মূর্তিবিন্যাস স্থিরতা ও গতি, চেতনা ও শক্তি, সম্ভাবনা ও সৃষ্টির পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে ভাবনার অবকাশ তৈরি করে।‘

Devi Hangseshwari

ভারতীয় তন্ত্র ও যোগশাস্ত্রের সূক্ষ্ম শরীরের ধারণার সঙ্গে হংসেশ্বরী মন্দিরের (Hangseshwari Temple) স্থাপত্যের সম্পর্কও অত্যন্ত আকর্ষণীয়। আধুনিক শারীরবিদ্যা যেখানে মানবদেহকে বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও শারীরবৃত্তীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করে, সেখানে তন্ত্রদর্শনে দেহের এক অদৃশ্য শক্তিভূগোলের কথাও বলা হয়েছে। এই ধারণায় মানুষের শরীর কেবল রক্ত-মাংসের কাঠামো নয়, বরং তার মধ্যে রয়েছে চেতনা ও শক্তির এক সূক্ষ্ম জগৎ।

ইতিহাসবিদের মতে, এই দার্শনিক ধারণার নিরিখে হংসেশ্বরী মন্দিরকে (Hangseshwari Temple) দেখলে তার স্থাপত্যের অন্য এক অর্থ সামনে আসে। মন্দিরের স্তরগুলিকে আধ্যাত্মিক শক্তির ঊর্ধ্বমুখী যাত্রার প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়। মন্দিরের উচ্চতা তখন আর শুধু স্থাপত্যের পরিমাপ থাকে না। তা হয়ে ওঠে মানুষের অন্তর্জগতের এক যাত্রাপথ—জাগতিক অস্তিত্বের গভীর স্তর থেকে প্রসারিত চেতনার দিকে এগিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত।

আরও পড়ুন: Shyamakatha: মৃত্যুর দেবতা যমও তাঁকে ভয় পায়, কৃষ্ণা বর্ণা এই দেবী মুক্তির প্রতীক, কে এই দেবী জেনে নিন

পার্থ চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘তন্ত্রদর্শনে পদ্ম কেবল একটি ফুল নয়, এটি এক জীবন্ত প্রতীকী নকশা। পদ্মের পাপড়িগুলি আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার বিভিন্ন স্তরকে বোঝায়। আর তার কেন্দ্র নির্দেশ করে সমন্বিত চেতনার সম্ভাবনাকে। কুঁড়ি থেকে পূর্ণ প্রস্ফুটিত ফুলে পরিণত হওয়ার মধ্যে যেমন সম্ভাবনা থেকে পূর্ণতার দিকে এগিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত রয়েছে, তেমনই হংসেশ্বরী মন্দিরের চূড়াগুলিতেও যেন সেই চিরন্তন বিকাশের প্রতিফলন দেখা যায়। মাটির সঙ্গে যুক্ত স্থাপত্য এবং অসীমের দিকে তার আকাঙ্ক্ষার মাঝামাঝি এক অবস্থানে দাঁড়িয়ে রয়েছে এই চূড়াগুলি।‘

বাংলার ধর্মীয় স্থাপত্যের ইতিহাসে হংসেশ্বরী মন্দির স্বতন্ত্র হয়ে উঠেছে। কালীপুজোর (Kalipuja) সময় মন্দির চত্বরে এক বিশেষ আবহ যোগ হয়। দেবীর আরাধনা, আলোকসজ্জা এবং ভক্তদের সমাগমে মন্দিরের স্থাপত্য ও প্রতীকী দর্শন যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে। সেই সময় হংসেশ্বরী মন্দির (Hangseshwari Temple) শুধু ইতিহাসের এক নির্দশন থাকে না, তা হয়ে ওঠে বিশ্বাস,সাধনা এবং আধ্যাত্মিক অনুভবের মিলনক্ষেত্র।

দেখুন:<iframe width=”560″ height=”315″ src=”https://www.youtube.com/embed/eb8_EaSGfOk?si=885ETFS1hChjhl4Z” title=”YouTube video player” frameborder=”0″ allow=”accelerometer; autoplay; clipboard-write; encrypted-media; gyroscope; picture-in-picture; web-share” referrerpolicy=”strict-origin-when-cross-origin” allowfullscreen></iframe>