• facebook
  • twitter
  • youtube
Sunday, 18 October, 2026

শরৎ এল রে: দেবী দুর্গার সঙ্গে এখানে রয়েছেন ১৬ হাত বিশিষ্ট অষ্টনায়িকা

নিজেদের রামচন্দ্রের 'সূর্যবংশ'-এর উত্তরাধিকারী বলে পরিচয় দেওয়া এই পরিবারটি অবশেষে দামোদর নদের তীরে ভুলুই গ্রামে এক নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পায়। এঁদের আদি পদবি ছিল 'বন্দ্যোপাধ্যায়'

শরৎ এল রে: দেবী দুর্গার সঙ্গে এখানে রয়েছেন ১৬ হাত বিশিষ্ট অষ্টনায়িকা

Image: SNS

এই পরিবারের ইতিহাস অত্যন্ত রোমাঞ্চকর। লোককথা অনুযায়ী, মোগল আমলে প্রবল অস্থিরতার সময় নিজেদের প্রাণ এবং আরাধ্য দেবতা শ্রী রামচন্দ্রের পবিত্রতা রক্ষার্থে উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যা থেকে একটি পরিবার প্রাণভয়ে পালিয়ে আসে। নিজেদের রামচন্দ্রের ‘সূর্যবংশ’-এর উত্তরাধিকারী বলে পরিচয় দেওয়া এই পরিবারটি অবশেষে দামোদর নদের তীরে ভুলুই গ্রামে এক নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পায়। এঁদের আদি পদবি ছিল ‘বন্দ্যোপাধ্যায়’। পরবর্তীতে শিখরভূম বা পঞ্চকোট রাজ্যের রাজার থেকে এঁরা ভুলুই গ্রামে বসবাসের জন্য জমি এবং সম্মাননীয় ‘রায়’ উপাধি লাভ করেন।

এই বংশেই জন্ম নেন সাধক কবি জগদ্রাম রায়। যৌবনে তাঁর গৃহত্যাগী হয়ে সাধনার পথে যাওয়ার পেছনে এক সুদীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। তবে এই ভুলুই গ্রামের মন্দির প্রতিষ্ঠার ইতিহাসটি অত্যন্ত কৌতূহলপ্রদ এবং এটি দু’টি মন্দিরে বিভক্ত। গ্রামের আদি দুর্গামন্দিরটি (বামদিকের মন্দির) সাধক জগদ্রাম রায় স্থাপন করেননি, সেটি স্থাপন করেছিলেন তাঁর পিতা রঘুনাথ রায়। তবে সূচনালগ্নে সেখানে কোনও মূর্তিপুজো হতো না। বর্তমানে জগদ্রাম রায়ের অন্য পাঁচ ভাইয়ের বংশধরেরা এই আদি মন্দিরটি পরিচালনা করেন।

অন্যদিকে, ডানদিকের যে মন্দিরটি রয়েছে, সেটিই হল সাধক কবি জগদ্রাম রায় প্রতিষ্ঠিত ‘শ্রী শ্রী অষ্টনায়িকা দুর্গামন্দির’। জগদ্রাম রায়ের নিজের বংশধরেরা আজও পরম নিষ্ঠার সাথে এই মন্দিরের পুজো ও রীতিনীতি পরিচালনা করে আসছেন। (উল্লেখ্য, জগদ্রাম রায়ের পুত্র রামপ্রসাদ রায় আলাদা করে কোনও মন্দির প্রতিষ্ঠা করেননি)।

এই পুজোর সবচেয়ে বড় বিস্ময় হল দেবীর রূপ। দেবী দুর্গা এখানে দশভুজা রূপেই পূজিতা হন। কিন্তু তাঁর সঙ্গে থাকা অষ্টনায়িকা বা আটজন সঙ্গিনী দেবী প্রত্যেকেই ষোড়শভুজা অর্থাৎ ১৬ হাত বিশিষ্ট! এই আটজন নায়িকা হলেন— উগ্রচণ্ডা, প্রচণ্ডা, চণ্ডোগ্রা, চণ্ডনায়িকা, চণ্ডা, চণ্ডবতী, চণ্ডরূপা এবং অতিচণ্ডিকা। দশভুজা মায়ের সঙ্গে ষোড়শভুজা অষ্টনায়িকার এমন অপূর্ব সহাবস্থান বাংলার আর কোনও পুজোমণ্ডপে সচরাচর চোখে পড়ে না। মূল অষ্টশক্তির পাশাপাশি সপরিবারে অর্থাৎ লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশও এই মণ্ডপে পূজিত হন।

এই মন্দিরের ইতিহাসের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে বাংলার সাহিত্য মহলের এক অমূল্য রত্ন। অনেকেই মনে করেন জগদ্রামী রামায়ণ হয়তো কোনও অনুবাদ সাহিত্য, কিন্তু তা একেবারেই নয়। এটি একটি সম্পূর্ণ মৌলিক রচনা। সাধক কবি জগদ্রাম রায় এই অষ্টকাণ্ড বা ‘অদ্ভুত রামায়ণ’ রচনা শুরু করেছিলেন। কিন্তু গ্রন্থটি সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই তিনি দেহত্যাগ করেন। পরবর্তীকালে তাঁর সুযোগ্য পুত্র রামপ্রসাদ রায় বাবার এই অসমাপ্ত কাজ পরম যত্নে সম্পূর্ণ করেন। পিতা ও পুত্রের এই অনবদ্য যুগলবন্দির কারণেই বাংলার সাহিত্যের ইতিহাসে এই গ্রন্থটি ‘জগদ্রামী-রামপ্রসাদী রামায়ণ’ নামে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।

জগদ্রাম রায় নিজে শাক্ত সাধক হলেও তাঁর রামায়ণে বৈষ্ণব ও শাক্ত— দুই মতেরই অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটেছিল। এই কাব্যের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল, এতে সাতটির বদলে আটটি কাণ্ড রয়েছে! ‘লঙ্কাকাণ্ড’ ও ‘উত্তরাকাণ্ড’-র মাঝে কবি যুক্ত করেছিলেন ‘পুষ্করকাণ্ড’, যেখানে দশানন রাবণের চেয়েও বহুগুণ বলশালী ‘সহস্রস্কন্ধ’ রাবণের গল্প বর্ণিত হয়েছে। এছাড়াও রাধাকৃষ্ণের রাসলীলার অনুসরণে তিনি ‘রামরাস’ নামের একটি অংশ যোগ করেছিলেন। রামায়ণ ছাড়াও তিনি রচনা করেছিলেন ‘শ্রীদুর্গা পঞ্চরাত্রি’ এবং ‘আত্মবোধ’-এর মতো মহামূল্যবান গ্রন্থ। জগদ্রামী রামায়ণের মূল পাণ্ডুলিপি আজও কলকাতার ‘এশিয়াটিক সোসাইটি’-তে সযত্নে সংরক্ষিত রয়েছে।

একসময় এই পুজোর প্রসার ছিল কল্পনাতীত। দূরদূরান্ত থেকে অগণিত পুণ্যার্থী এই সাধক কবির মন্দিরে ছুটে আসতেন। আজও শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে এই জাগ্রত মন্দিরে ভক্তদের মনস্কামনা পূর্ণ করেন দেবী। কিন্তু কালের গভীরে আজ হারিয়ে যেতে বসেছেন মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের এই অন্যতম সাধক ও তাঁর অমূল্য সৃষ্টি। আজকের যান্ত্রিক প্রজন্মের কাছে কবি জগদ্রাম রায় হয়তো ভুলতে বসা এক নাম, কিন্তু ভুলুই গ্রামের এই প্রাচীন ঠাকুরদালান  মনে করিয়ে দেয় বাংলার এক হারানো স্বর্ণযুগের কথা।

দেখুন: