• facebook
  • twitter
Wednesday, 18 February, 2026

জীবনের আহ্বান

ভারতে অঙ্গদানের হার এখনও অত্যন্ত কম। বহু মানুষ ব্রেন ডেথ সম্পর্কে অবগত নন, কিংবা চিকিৎসা-ব্যবস্থার উপর পূর্ণ আস্থা রাখেন না। ধর্মীয় ও সামাজিক কুসংস্কারও বড় বাধা।

কেরলের পাথানামথিত্তা জেলার এক গির্জার সামনে ১০ মাসের শিশু আলিন শেরিনকে যখন ‘গার্ড অফ অনার’ জানাল কেরল পুলিশ, তখন সেটি কেবল এক করুণ বিদায়ের মুহূর্তই ছিল না— তা হয়ে উঠল মানবিকতার এক উজ্জ্বল স্বীকৃতি। পথদুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে কয়েক দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর চিকিৎসকেরা যখন তার ‘ব্রেন ডেথ’-এর ঘোষণা করেন, তখন শোকস্তব্ধ বাবা অরুণ আব্রাহাম ও মা শেরিন আন জন এমন এক সিদ্ধান্ত নেন, যা পাঁচটি পরিবারকে নতুন জীবনের আশা দেয়। সর্বকনিষ্ঠ অঙ্গদাতা হিসেবে আলিন আজ এক প্রতীক— মৃত্যুর মধ্যেও জীবনের সম্ভাবনার প্রতীক।

কেরলের মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন পরিবারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেছেন, অসীম শোকের মধ্যেও নেওয়া এই সিদ্ধান্ত অন্য পাঁচটি পরিবারকে পুনর্জন্মের সুযোগ দিয়েছে। অভিনেতা-রাজনীতিক কমল হাসনও শোকবার্তায় উল্লেখ করেছেন, আলিন এখন পাঁচ জনের মধ্যে বেঁচে থাকবে। উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী বীণা জর্জ ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুরেশ গোপী— রাষ্ট্রের এই উপস্থিতি ও সম্মান সমাজে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়– অঙ্গদান নিছক চিকিৎসা-প্রক্রিয়া নয়, এটি এক মহৎ নাগরিক উদ্যোগ।

Advertisement

এই ঘটনার আর একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো প্রশাসনিক দক্ষতা। কোচি থেকে প্রায় ২৩০ কিলোমিটার দূরের তিরুবনন্তপুরমে বিশেষ ব্যবস্থায় মাত্র তিন ঘণ্টা কুড়ি মিনিটে অঙ্গ পৌঁছে দেওয়া হয়। জানা গিয়েছে, আলিনের যকৃত ছ’মাসের এক শিশুর শরীরে এবং কিডনি ১০ বছরের এক শিশুর দেহে প্রতিস্থাপিত হয়েছে। অর্থাৎ একটি পরিবারের দুঃখের ভিতর দিয়ে দুই শিশুর জীবনরক্ষা সম্ভব হয়েছে, অন্য অঙ্গগুলি আরও কয়েকজনের শরীরে নতুন আশা জাগাবে। এখানে স্পষ্ট, পরিকল্পিত পরিকাঠামো, দ্রুত পরিবহন এবং সমন্বিত স্বাস্থ্যব্যবস্থা থাকলে অঙ্গদান বাস্তব ফল দিতে পারে।

Advertisement

ভারতে অঙ্গদানের হার এখনও অত্যন্ত কম। বহু মানুষ ব্রেন ডেথ সম্পর্কে অবগত নন, কিংবা চিকিৎসা-ব্যবস্থার উপর পূর্ণ আস্থা রাখেন না। ধর্মীয় ও সামাজিক কুসংস্কারও বড় বাধা। অথচ চিকিৎসাবিজ্ঞান স্পষ্ট করে বলছে— মস্তিষ্ক-মৃত ব্যক্তির অঙ্গ অন্যের শরীরে প্রতিস্থাপন করলে বহু জীবন বাঁচানো সম্ভব। সমস্যাটি মূলত সচেতনতার, আর তার চেয়েও বড় সমস্যা আস্থার।

আস্থা গড়ে ওঠে তিনটি স্তম্ভের উপর— স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা এবং সহমর্মিতা। প্রথমত, অঙ্গ সংগ্রহ ও বণ্টনের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বচ্ছ হতে হবে। অপেক্ষমাণ রোগীদের তালিকা, অগ্রাধিকার নির্ধারণের মানদণ্ড— সবই জনসমক্ষে স্পষ্ট থাকা উচিত। দ্বিতীয়ত, প্রতিস্থাপনের সুযোগ যেন কেবল আর্থিক সামর্থ্যের উপর নির্ভর না করে। সরকারি হাসপাতালে প্রতিস্থাপন পরিকাঠামো বাড়ানো এবং স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্পে পরবর্তী চিকিৎসার পূর্ণ সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। তৃতীয়ত, শোকস্তব্ধ পরিবারকে মানবিক সহায়তা দেওয়া— প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর, সামাজিক স্বীকৃতি এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই ক্ষেত্রে কিছু রাজ্যের উদ্যোগ প্রশংসনীয়। যেমন তামিলনাড়ু দীর্ঘদিন ধরে সংগঠিত অঙ্গদান নেটওয়ার্ক, দ্রুত ‘গ্রিন করিডর’ পরিবহন ব্যবস্থা এবং দাতাদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষকৃত্যের মাধ্যমে সামাজিক স্বীকৃতি দেওয়ার নীতি গ্রহণ করেছে। এই ধরনের পদক্ষেপ মানুষের মনে আস্থা জাগায় যে, রাষ্ট্র তাদের ত্যাগকে সম্মান জানায় এবং সুষ্ঠুভাবে তার সদ্ব্যবহার করে।

অন্যদিকে, চাহিদা ও জোগানের ফারাকই বেআইনি অঙ্গব্যবসার জন্ম দেয়। দারিদ্র্য ও বেকারত্বের সুযোগ নিয়ে অসাধু চক্র বহু মানুষকে প্রতারণা বা জোরজবরদস্তির মাধ্যমে অঙ্গ বিক্রিতে বাধ্য করেছে। এই অমানবিক বাণিজ্য রুখতে হলে কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি বৈধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে, যাতে রোগীরা আইনি পথে দ্রুত অঙ্গপ্রাপ্তির সুযোগ পান।

অঙ্গদানকে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে শিক্ষা ও গণমাধ্যমের ভূমিকা অপরিহার্য। স্কুল-কলেজে সচেতনতা কর্মসূচি, ধর্মীয় নেতাদের ইতিবাচক বক্তব্য, জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বদের অংশগ্রহণ— এসব মিলিয়ে এক নতুন মানসিকতা গড়ে তোলা সম্ভব। রক্তদানের ক্ষেত্রেও একসময় অনীহা ছিল, ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় আজ তা স্বাভাবিক মানবিক দায়িত্ব হিসেবে স্বীকৃত। অঙ্গদানও তেমনই এক স্বাভাবিক নাগরিক কর্তব্য হয়ে উঠতে পারে।

আলিন শেরিনের বিদায় আমাদের চোখকে অশ্রুসিক্ত করতে পারে, কিন্তু সেই অশ্রু যেন শুধু শোকের না হয়— তা হোক সংকল্পের। একটি দশ মাসের শিশুর সংক্ষিপ্ত জীবন আমাদের শিখিয়ে দিল, মানবিকতা বয়সের পরিমাপে মাপা যায় না। রাষ্ট্র যদি স্বচ্ছ ও সহমর্মী কাঠামো গড়ে তোলে, সমাজ যদি কুসংস্কার ছেড়ে যুক্তির পথে হাঁটে, তবে মৃত্যুর পর অঙ্গদান আর বিরল ঘটনা থাকবে না। আলিনের গল্প তখন ব্যতিক্রম নয়, এক নতুন সামাজিক চেতনার সূচনা হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

Advertisement