কুমারেশ চক্রবর্তী: দেবী সরস্বতীর মতো বহুরূপী এবং বহু প্রতিভাবময়ী যুবতী দেবী দেব মন্ডলীতে খুব কম দেখা যায়। সম্ভবত তিনিই একমাত্র এই বিশেষণের অধিকারী। কারণ তিনি সুন্দরী রূপসী, তিনি বিদুূষী, তিনি শিল্পী, তিনিই আবার যোদ্ধা, তিনি কৃষির দেবতা জলের দেবতা, শিক্ষা সংস্কৃতি খেলাধুলার দেবতা, কি নন তিনি ? শুধু তাই নয় বাংলায় তিনি দু হাত যুক্ত হলেও বাংলার বাইরে চার হাত, ছয হাত ,আট হাত রূপেও তাকে দেখা যায়। তার বাহন মোরগ, ময়ূর, হরিণ, সিংহ, বাঘ এবং অবশেষে হাঁস কে আমরা দেখতে পাই।
অর্থাৎ এত বাহনের পরিবর্তন একমাত্র সরস্বতীর ক্ষেত্রেই লক্ষ্য করা গেছে অন্যত্র নয়। হ্যাঁ অনেক দেবদেবী তাদের বাহন পরিবর্তন করেছেন ঠিকই তবে সেটার সংখ্যা এক বা দুই। কিন্তু সরস্বতী কে আমরা বারবার চার বার বাহন পরিবর্তন করতে দেখেছি। তা ছাড়াও অন্যান্য পশু পাখিকে তিনি বাহন রূপে গ্রহণ করেছেন। অর্থাৎ বিলাসী ধনী মানুষেরা যেমন বারবার তাদের বাহন বা গাড়ি পাল্টান দেবী সরস্বতীকেও আমরা সেই রূপে খানিকটা দেখেছি।
Advertisement
এমন আকর্ষণীয় এমন রঙিন চরিত্রের দেবী সহজে লক্ষ্য করা যায়না। তবে আজ আমি মূলত দেবীর বাহন নিয়ই আলোচনা করব। কারণ এই বাহনের ব্যাপারটাই সরস্বতীর ক্ষেত্রে বারবার নজরে পড়ে। সবচেয়ে মজার কথা, যে বাহনে বর্তমানে আমরা তাকে দেখি তা হচ্ছে হাঁস বা রাজহাঁস, এই রাজহাঁস কিন্তু গত ৫০০ বছরেও সরস্বতীকে ব্যবহার করতে দেখা যায়নি, এটা তার আধুনিক সংযোজন। তাই বাহন আজকে মূল আলোচ্য বিষয়।
Advertisement
শাস্ত্র- পন্ডিতদের মতে দেবী সরস্বতী হাঁসকে বেছে নেয়ার ঘটনা আধুনিক যুগে। অন্তত বিশিষ্ট পন্ডিত হংসনারায়াণ ভট্টাচার্য সে কথাই বলে গিয়েছেন।তাঁর কথার সমর্থন আমরা পাই কাশ্মীরি পন্ডিত কলহনের লেখা থেকে। তিনি বলেছেন, সরস্বতী হংসরূপে ভেরগিরি পর্বতের চূড়ায় দেখা দিয়েছিলেন তাই তিনি হংসরূপা। তবে পন্ডিতদের মতে দেবী সরস্বতী হংস বাহনটি পেয়েছেন ব্রহ্মার কাছ থেকে। কিন্তু এই বাহন টি মানে হাঁস সাধারণ হাঁস নয়।
এখানে হংসকে সূর্যের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। অর্থাৎ সূর্যের মতো তেজস্বী হাঁস বা সূর্য। বেদ ও উপনিষদে তাই হংসের অর্থ করা হয়েছে সুূর্য। অথচ পুরানতন্ত্রে হংস বাহন সহ সরস্বতীর উল্লেখ নেই বললেই চলে।দেবী সরস্বতীর দ্বিতীয় বাহনটি হল মেষ বা ভেড়া। এই বাহনটি আমাদের কাছে খুব অপরিচিত, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে। কিন্তু পূর্ব বঙ্গে মেশ বাহনটি বহু অঞ্চলে দেখা যায়। অবশ্য মেষ নয় সেটি হল মেসি অর্থাৎ স্ত্রী ভেড়া।মেষ সরস্বতীর যজ্ঞে বলি দিতে দেখা যায়। সারস্বত সূত্রে এবং সংখ্যায়াণের সূত্র বিভিন্ন যজ্ঞে স্ত্রী-মেশ বলির উল্লেখ করা আছে।
সুতরাং ভেড়াকে সরস্বতীর বাহন রূপে দেখা আমাদের কাছে খুব অবাক হলেও ওপার বাংলায় এটা স্বাভাবিক। যারা নীহাররঞ্জন রায়ের বাঙালির ইতিহাস পড়েছেন (প্রথম খন্ড পৃষ্ঠা ৬১৭) তারা জানবেন, যে, বাংলাদেশের বহু স্থানে ভেড়া বলি এবং ভেড়ার লড়াই জনপ্রিয় একটি ঘটনা।মা সরস্বতীর দ্বিতীয় সুপরিচিত একটি বাহন হল ময়ূর ।তবে এটা দক্ষিণ ভারতে বিশেষ করে বোম্বাই যা বর্তমানে মুম্বাই নামে পরিচিত সেই অঞ্চলে বেশি দেখা যায়। তাছাড়া সরস্বতী নদীর তীরবর্তী এলাকাতেও ময়ূর বাহনা দেবী সরস্বতী খুবই প্রচলিত একটি মূর্তি।
এর প্রধান কারণ এই এলাকায় প্রচুর পরিমাণে ময়ূর আছে। রাজপুতনাতেও সরস্বতীর প্রধান বাহন হচ্ছে ময়ূর।ওখানে সুদৃশ্য একটি বা দুটি ময়ূর সর্বদাই মা সরস্বতীর সঙ্গে থাকে। অনেক সময় দেখা যায় তিনি একটি ময়ূরের ওপর বসে আছেন অন্য একটি ময়ূরের উপর পা রেখেছেন। ইদানিং পশ্চিমবঙ্গেও সরস্বতীর বাহন রূপে ময়ূরকে দেখা যাচ্ছে। তার কারণ ময়ূরের সুদৃশ্য রূপ।হাসের থেকেই ময়ূর সাধারণ এর কাছে অনেক বেশি আকর্ষণীয়। তাই ক্লাবের অল্প বয়সের ছেলে মেয়েরা ময়ূরকে বেশি পছন্দ করছে আজকাল।
তবে দক্ষিণ ভারতের ময়ূর বাহনযুক্ত সরস্বতীর অধিকাংশই চার হাত। পশ্চিমবঙ্গের বাইরে অবশ্য দু হাত বিশিষ্ট দেবী সরস্বতীর দেখা খুব কম পাওয়া যায়। এবার আসা যাক সিংহের কথায়। অবাক হলেও সত্য দেবী সরস্বতীর সিংহবাহনা মূর্তি শাস্ত্রসম্মত। এবং ভারতের বিভিন্ন স্থানে দেবী সরস্বতীকে সিংহের ওপর বসে থাকতে দেখা গেছে।
সিংহ বাহনা সরস্বতীর উল্লেখ আমরা পাই কৃষ্ণযজুর্বেদে(১/৫/১২/৪) ! কৃষ্ণ যজুর্বেদে তাই সরস্বতীকেই সিংহী রূপে সম্বোধন করা হয়েছে।
তাঁর কাছে প্রার্থনা করা হচ্ছে, তিনি যেন সিংহী রূপে শত্রু ও অধর্ম কে বিনাশ করেন। শুধু তাই নয় তার কাছেই পূজার সময় সিংহের মত সুন্দর ও শক্তিশালী পুত্র কন্যা প্রার্থনা করা হয়। অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণ এর লেখা থেকে জানা যায়, বারানসির কাছে সরস্বতী মন্দিরে সিংহ বাহনা বাগীশ্বরী সরস্বতী মূর্তি আছে। আমাদের কলকাতার জাদুঘরেও এই বাগীশ্বরী মূর্তি আছে। ইচ্ছে করলে উৎসাহীরা মিউজিয়ামে গিয়ে সিংহ বাহনা মা সরস্বতীকে দেখে আসতে পারেন।
আলোচ্য প্রবন্ধের সূচনাতেই আমি বলেছিলাম যে, রাজহংস সরস্বতীর আধুনিক বাহন। এর প্রমাণ আমরা দেখতে পাই দুই কবির লেখায়। বেদ ও পুরানে সরস্বতীর হংস বাহনের কথা উল্লেখ নেই। সেই কারণেই ৫০০ বছরের ব্যবধানে দুই কবির লেখাতেও আমরা রাজহংসের দেখা পাচ্ছি না। ষোড়শ শতকের কবি মুকুন্দরাম। তাঁর লেখা, কবিকঙ্কন চন্ডী গ্রন্থের লেখার একটি অংশ তুলে ধরছি–পুস্তক লইয়া করে উর দেবী এ আসরে/ বিধিমুখে বেদবাণী বন্দে দেবী বীণাপাণি/ শ্বেতপদ্মে অধিষ্ঠান শুভ্রধুতি পরিধান/ শ্রবণে কুন্তল দোলে কপালে বিজলী খেলে/ তনুরুচি খন্ডে অন্ধকার।।
ষোড়শ শতকের কবির লেখা দেখলাম। এবার আমরা রবীন্দ্রনাথকে ধরি, ১৩০০ বঙ্গাব্দে রবীন্দ্রনাথের চিত্রা কাব্যগ্রন্থের একটি কবিতার অংশ–প্রকাশ্যে জননী, নয়ন সম্মুখে/ প্রসন্ন মুখছবি!/ বিমল মানস সরস বাসিনী,/ শুক্লবসনা, শুভ্র হাসিনি,/বিনা গঞ্জিত মঞ্জুভাষিনী/ কমল কুঞ্জাসনা।এবার মূল প্রশ্নে আসা যাক। কেন দেবী সরস্বতী শেষ পর্যন্ত রাজহংসকেই বাহন হিসেবে গ্রহণ করলেন ?প্রাচীনকালের যে সমস্ত শাস্ত্র, বেদ পুরান প্রভৃতি গ্রন্থ আছে তাতে কোথাও দেবীর হংস বাহনের কথা পাওয়া যায় না।
বরং আলোচ্য চার প্রকার বাহন সরস্বতী ব্যবহার করেছেন যেমন ভেড়া বা মেষ,সিংহী, ময়ূর,মোরগ মাঝেমধ্যে বাঘ। কিন্তু পরবর্তীকালে দেখা গেল দেবী দুর্গা সিংহবাহন হয়ে গেলেন, কার্তিক গ্রহণ করলেন ময়ূর কে, কারণ যুদ্ধের কাজে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে দ্রুত যেতে হবে, তাই এ ব্যাপারে পাখিদের রাজা ময়ূরকেই প্রয়োজন। মেস বা ভেড়াকে মানুষ ভালোভাবে গ্রহণ করবে না, বুঝেই সরস্বতী বাধ্য হলেন রাজহংসকে বেছে নিতে। সেই থেকে মূলত হংসই সরস্বতীর বাহন রূপে পরিণত হলো।
তবে ভারতবর্ষের অন্যত্র ময়ূর বাহন দেখা যায়। এখানে একটা বিষয় উল্লেখযোগ্য যে, দেবী সরস্বতীর বাহন যে রাজহংস, তা কিন্তু সাধারণ হাঁস নয়, সে হচ্ছে পরমহংস অর্থাৎ যে কিনা জল ও দুধ থেকে পৃথক করে দুধ গ্রহণ করে, ধর্ম ও অধর্মের মধ্যে অধর্মকে বাদ দিয়ে ন্যায় বা ধর্মকে গ্রহণ করে নিতে পারে, জ্ঞান অজ্ঞানতার মধ্যে বেছে নিতে পারে জ্ঞানকে, সেই হচ্ছে পরমহংস।
যদিও বাস্তবে এটা কিন্তু সম্ভব নয়। কারণ হংস বা রাজহংস বা যে কোন প্রজাতির হংসই হোক না কেন, কোন হংসই জল আর দুধ থেকে দুধ পৃথক করতে পারে না। অন্তত বিজ্ঞান তাই বলে। অবশ্য দেবী সরস্বতীর হাঁসের কথা আলাদা !!
Advertisement



