সমাজে বৈষম্য রোখা এত কঠিন কেন— এই প্রশ্ন আজ আর তাত্ত্বিক নয়, রক্তমাখা বাস্তব। যে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি সামাজিক সাম্য ও সহাবস্থানের মডেল হওয়ার কথা, সেখানেই বারবার ভেঙে পড়ছে সংবেদনশীল তরুণ জীবন। আত্মহত্যার সংখ্যা নিছক পরিসংখ্যান নয়; তা এক গভীর কাঠামোগত ব্যর্থতার নীরব দলিল।
জাতীয় টাস্ক ফোর্স (এনটিএফ), যাকে সুপ্রিম কোর্ট ছাত্র আত্মহত্যা সংক্রান্ত পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে নিযুক্ত করেছিল, স্পষ্টই জানিয়েছে— শিক্ষাগত চাপ এবং সামাজিক বৈষম্য, এই দুই কারণ প্রায়শই পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে।
২০২২ সালে শুধুমাত্র উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আত্মহত্যা করেছেন ১৩,০০০-রও বেশি ছাত্রছাত্রী— জাতীয় অপরাধ নথি ব্যুরোর এই তথ্য ভয়াবহ। তার চেয়েও উদ্বেগজনক, ভারতের ১৫টি আইআইটি-তে ২০২১ থেকে ২০২৫-এর মধ্যে আত্মহত্যার সংখ্যা ৬৭। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রক ছাত্রদের মানসিক ও আবেগগত সুস্থতা নিশ্চিত করতে নির্দেশিকা জারি করার পরেও, মাত্র দেড় বছরে ৪০ জন আইআইটি ছাত্র আত্মহত্যা করেছেন।
Advertisement
এই তথ্যগুলি প্রমাণ করে যে, নির্দেশিকা আছে, সেল আছে, নীতি আছে; নেই কার্যকর প্রয়োগ। এনটিএফ-এর রিপোর্টে উঠে এসেছে, সমতা, সামাজিক ন্যায় ও যৌন নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যে বিভিন্ন ‘সেল’ বা ব্যবস্থা রয়েছে, সেগুলি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। ক্ষমতার সামাজিক কাঠামো— জাত, শ্রেণি, ভাষা, অঞ্চল— এই সবই প্রতিষ্ঠানগত প্রক্রিয়ার সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে, যে বৈষম্য প্রায় অদৃশ্য হয়েও সর্বগ্রাসী।
Advertisement
এই প্রেক্ষাপটে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ২০২৬ সালের Promotion of Equity in Higher Education Institutions Regulations নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের স্থগিতাদেশ নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এই বিধিগুলির উদ্দেশ্য ছিল জাতিভিত্তিক বৈষম্য রোধ করা। কিন্তু ‘সাধারণ’ বা অ-সংরক্ষিত শ্রেণির ছাত্রছাত্রীরা অভিযোগ তুলেছেন— এই বিধি তাঁদের বাদ দিচ্ছে, এমনকি তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃতও হতে পারে। সুপ্রিম কোর্টও মত দিয়েছে, বিধির ভাষা অস্পষ্ট, বিভ্রান্তিকর এবং অপব্যবহারের সুযোগ রাখে। ফলে বিশেষজ্ঞ কমিটির দ্বারা তা পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে।
আদালত আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অসঙ্গতির দিকে আঙুল তুলেছে। যখন ২০১২ সাল থেকেই ইউজিসির এমন একটি বিধি রয়েছে যা সব ধরনের বৈষম্যের বিরোধিতা করে, তখন শুধুমাত্র এসসি, এসটি ও ওবিসি ছাত্রদের বিরুদ্ধে বৈষম্য রুখতে আলাদা বিধি কেন? এই দ্বৈত কাঠামোই বিভাজনকে উসকে দেয়। সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে যদি নতুন সামাজিক ক্ষোভ তৈরি হয়, তবে উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়।
তবে এই বিধি স্থগিত হওয়ায় স্বস্তির নিশ্বাস ফেলার সুযোগ নেই। কারণ, মূল সমস্যা— বৈষম্যের কারণে ছাত্র আত্মহত্যা— অবিকল রয়ে গেছে। প্রশ্ন ওঠে, ইউজিসি বা রাষ্ট্র কেন বারবার এমন অস্পষ্ট ও বিভাজনমূলক নীতি প্রণয়ন করে? এর উত্তর হয়তো ভারতের স্বাধীনতা-পরবর্তী ইতিহাসেই নিহিত। ২০১০ সালের আগে পর্যন্ত ‘discrimination’ শব্দটি আধুনিক অর্থে রাষ্ট্রীয় নথিতে প্রায় অনুপস্থিত।
সমাজকে একত্র করার প্রয়াসে অসমতাকে ‘বৈচিত্র্য’ বা ভাগ্যনির্ধারিত ‘পিছিয়ে পড়া’ হিসেবে দেখার প্রবণতা গড়ে উঠেছিল। সেই মানসিকতা আজও কাটেনি।
ফলে বৈষম্যকে সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও, তাকে মোকাবিলা করার সাহসী ও সর্বজনীন কাঠামো তৈরি হয় না। পরিচয়ের রাজনীতি, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক আত্মরক্ষার প্রবৃত্তি— সব মিলিয়ে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি প্রায়শই নৈতিক দায়িত্ব এড়িয়ে যায়।
এই অবস্থা আর গ্রহণযোগ্য নয়। প্রতিটি ছাত্রের জীবন সমান মূল্যবান—জাত, শ্রেণি বা সংরক্ষণের পরিচয় নির্বিশেষে। বৈষম্য রোধের নীতি যদি নিজেই বৈষম্যের অভিযোগ ডেকে আনে, তবে সেই নীতি পুনর্গঠন জরুরি। কিন্তু তার চেয়েও জরুরি, নীতির বাস্তব প্রয়োগ, স্বচ্ছ অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা এবং ক্ষমতাহীন ছাত্রদের বিশ্বাস অর্জন।আত্মহত্যার সংখ্যা কোনও ‘দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা’ নয়, তা রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত ব্যর্থতার প্রতিফলন। এই ব্যর্থতা আর দীর্ঘায়িত হতে দেওয়া যায় না।
Advertisement



