• facebook
  • twitter
  • youtube
Thursday, 1 October, 2026

একটু জল পাই কোথায় বলতে পারেন

শৈশবে ভূগোলে পড়েছিলাম, পৃথিবীর তিন ভাগ জল আর এক ভাগ স্থল। সেই সহজ হিসাবে মনে হতো, এ পৃথিবীতে আর যাই হোক, জলের অভাব

একটু জল পাই কোথায় বলতে পারেন

শৈশবে ভূগোলে পড়েছিলাম, পৃথিবীর তিন ভাগ জল আর এক ভাগ স্থল। সেই সহজ হিসাবে মনে হতো, এ পৃথিবীতে আর যাই হোক, জলের অভাব কোনোদিন হবে না। কিন্তু প্রকৃতির সেই অফুরন্ত জলের মধ্যে মানুষের পানের যোগ্য ও ব্যবহারের উপযোগী মিষ্টি জলের পরিমাণ যে তিন শতাংশেরও কম, আর তার সিংহভাগই বরফ আকারে জমে আছে— এই কঠিন সত্যটা বুঝতে বেশ কিছুটা বয়স লেগে গেল। আমাদের স্কুল-কলেজের সাধারণ পাঠ্যবইয়ে এই সংকটের গভীরতা নিয়ে খুব বেশি আলোচনা হতো না। আমরা যারা গ্রামবাংলায় বড় হয়েছি, তাদের চোখের সামনে ছিল কেবলই জল আর জল। দিঘি, পুকুর, ডোবা, খাল-বিল আর নদী-নালা সারা বছরই টলমল করত। সমস্যা যা ছিল, তা মূলত স্বাস্থ্যসম্মত পানীয় জলের। গ্রামের মাঝে মাঝে দূরে দূরে কিছু সরকারি নলকূপ পোঁতা থাকত। তার মধ্যে কোনও কোনোটা আবার হঠাৎ বিগড়ে যেত, বিশেষ করে চৈত্র-বৈশাখ মাসের কাঠফাটা গরমে। দূর থেকে বালতি বা কলসি কাঁখে জল বয়ে আনতে গিয়ে ঘরের মানুষগুলো হাঁপিয়ে উঠতেন। তখন একটু হলেও বুঝতাম জলের কষ্ট কী জিনিস। বড়রা বলতেন, খাবার জল বিন্দুমাত্র নষ্ট করতে নেই। ইস্কুলের মাস্টারমশাইরাও ক্লাসে একই কথা মনে
করিয়ে দিতেন।
বছর কুড়ি আগে প্রথম খবরের কাগজ ও বিজ্ঞানীদের কথায় শুনলাম, মাটির নিচের সঞ্চিত জলের ভাণ্ডার নাকি দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। তার পর থেকে এই নিয়ে যত পড়েছি, ততই চোখ খুলে গেছে। ছোটবেলায় দেখতাম গ্রামের জমিগুলো মূলত একফসলি ছিল। বর্ষার জলে ধান চাষ হতো, আর শীতের দিনে নদী বা খালের কাছাকাছি কিছু জমিতে খাল ও পুকুরের জল সেচে শাকসবজি বা দ্বিতীয় ফসল ফলানো হতো। মাটির নিচের গভীর জলের ওপর তখন এতটুকুও চাপ ছিল না।
হঠাৎ দৃশ্যপট বদলে গেল নব্বইয়ের দশকের পর থেকে। গ্রামে গ্রামে বসতে শুরু করল শ্যালো আর ডিপ টিউবওয়েল। পাতাল ফুঁড়ে হাজার হাজার লিটার জল তুলে মাঠের পর মাঠ শুকনো জমিতে বোরো ধান ও অন্যান্য অর্থকরী ফসলের চাষ শুরু হলো। সঙ্গে  রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ঢালাও ব্যবহার। ফলন বাড়ল কয়েক গুণ, চাষীদের ঘরেও কিছু বাড়তি টাকা এলো। কিন্তু সেই সঙ্গে বাড়ল জলের চরম অপচয়। পাম্প চালিয়ে চাষের জমিতে জল থৈথৈ করা হতে লাগল। গ্রামের সহজ-সরল বহু কৃষিজীবী মানুষ, যাঁদের প্রাতিষ্ঠানিক পুঁথিগত বিদ্যা বেশি নেই বা দেশের পরিবেশ সংক্রান্ত খবর জানার সুযোগ কম, তাঁরা ভাবলেন মাটির তলার জল বুঝি কোনোদিন ফুরোবে না!
ফলে বিপদ যা হবার তা-ই হলো। জলস্তর দ্রুত নিচে নামতে শুরু করল। এর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর পরিণতি দেখা দিল আর্সেনিক বিষের রূপ ধরে। গাঙ্গেয় উপত্যকার ভূগর্ভস্থ পাথুরে স্তরে প্রাকৃতিকভাবে মিশে থাকা আর্সেনিক ও আয়রন যৌগ মাটির গভীরে বাতাসের সংস্পর্শে এসে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটায়। অতিরিক্ত জল তোলার ফলে সেই বিষাক্ত পদার্থ ভূগর্ভস্থ মিষ্টি জলে দ্রবীভূত হয়ে নলকূপের মাধ্যমে উঠে আসে। এই দূষিত জল পান করে এবং সেই জলে সেচ দেওয়া ফসল খেয়ে মানুষের শরীরে ধীরে ধীরে বিষক্রিয়া শুরু হয়। প্রথমে হাতের তালু ও পায়ের তলায় কালো বা খসখসে দাগ পড়ে, যাকে বলা হয় কেরাটোসিস পিলারিস। দীর্ঘকাল এই জল খেলে তা পাকস্থলী, লিভার, ফুসফুস ও ত্বকের ক্যানসারে রূপ নেয়। আমাদের রাজ্যের বহু জেলায় এই নীরব ঘাতকের কবলে পড়ে অসংখ্য মানুষ পঙ্গু হয়েছেন, এমনকি
প্রাণও হারিয়েছেন।
গ্রামের ছবি যদি অজ্ঞতার হয়, তবে শহরের ছবি চরম উদাসীনতার। পথের ধারে খোলা কল থেকে  অথবা মিউনিসিপ্যালিটির পাইপ ফেটে অবিরাম জল গড়িয়ে নর্দমায় মিশছে, পথচলতি মানুষ তা দেখেও ভ্রূক্ষেপ না করে চলে যান। বাড়ির গাড়ি ধোওয়া, উঠোন ধোওয়া, ওয়াশিং মেশিনে কাপড় কাচা বা বাথরুমে শাওয়ার ছেড়ে স্নান করার সময় আমরা লিটারের পর লিটার বিশুদ্ধ জল অপচয় করি। অথচ গবেষণায় দেখা গেছে, ভূগর্ভস্থ জলতল গত কয়েক দশকে এত নিচে নেমে গেছে যে অনেক জায়গায় গভীর নলকূপ বসিয়েও আর জলের রেখা মিলছে না।
চেন্নাইয়ের সাম্প্রতিক তীব্র জলসংকট ও দেশের নীতি আয়োগের সামগ্রিক জল ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত প্রতিবেদন আমাদের সেই নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ভারতের বহু বড় শহরের ভূগর্ভস্থ জলস্তর প্রায় শূন্যের কোঠায় পৌঁছে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলছেন, এখনই সঠিক পদক্ষেপ না নিলে আগামী কয়েক দশকের মধ্যে দেশের একটি বিশাল অংশ চরম জলকষ্টের মুখে পড়বে, যাকে পরিবেশবিদরা ‘ডে জিরো’ বলে অভিহিত করছেন।
রাষ্ট্রসঙ্ঘের এক হিসেব অনুযায়ী, একজন মানুষের বেঁচে থাকা ও সুস্থভাবে দিনযাপনের জন্য দিনে গড়ে প্রায় পঞ্চাশ লিটার জল প্রয়োজন— যার মধ্যে পানের জন্য পাঁচ লিটার, শৌচাগারের জন্য কুড়ি লিটার, স্নানের জন্য পনেরো লিটার এবং রান্নার জন্য দশ লিটার। কিন্তু প্রাকৃতিক নিয়মে যে বিপুল পরিমাণ বৃষ্টি হয়, তার মাত্র কুড়ি থেকে পঁচিশ শতাংশ মিষ্টি জল হিসেবে মাটিতে শোষিত হয় বা জলাশয়ে ধরে রাখা যায়। বাকি অধিকাংশ জল নদী-নালা দিয়ে বয়ে গিয়ে সমুদ্রের নোনা জলে মিশে ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ে।
এই সংকট থেকে মুক্তির সবচেয়ে সহজ, বিজ্ঞানসম্মত ও পরিবেশবান্ধব পথ হলো ‘বৃষ্টির জল সংরক্ষণ’ বা ‘রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং’। হিসেব করে দেখা গেছে, একটি মাঝারি আকারের বাড়ির ছাদ থেকে সংগৃহীত বৃষ্টির জল যদি সঠিক ফিল্টারের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ ট্যাঙ্কে জমা রাখা যায়, তবে তা দিয়ে বহু পরিবারের সারা বছরের নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজ চালানো সম্ভব।
বৃষ্টির জল আমরা মূলত দুটি উপায়ে সংরক্ষণ করতে পারি। প্রথমত, ছাদের জল পাইপ দিয়ে নামিয়ে ফিল্টারের মাধ্যমে সরাসরি ট্যাঙ্কে জমা রাখা অথবা সেই জল দিয়ে মাটির গভীর স্তরে কৃত্রিমভাবে রিচার্জ করা। দ্বিতীয়ত, সনাতন প্রথায় গ্রামের পুকুর, দিঘি, বিল ও নয়ানজুলিগুলো সংস্কার করে বৃষ্টির জল ধরে রাখা। বৃষ্টির জল প্রাকৃতিকভাবে অত্যন্ত খাঁটি ও নরম। সঠিক উপায়ে ধরে রাখলে এর অনেক সুফল—
১. এটি ভূগর্ভস্থ জল ও পুরসভার সরবরাহের জলের ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়।
২. যে সমস্ত প্রত্যন্ত অঞ্চলে নলকূপের জলে আর্সেনিক বা অতিরিক্ত লবণাক্ততা রয়েছে, সেখানে বৃষ্টির জলই হতে পারে পানীয় ও রান্নার সবচেয়ে নিরাপদ বিকল্প।
৩. বর্ষার অতিরিক্ত জল সঞ্চিত হওয়ায় নিচু এলাকায় হঠাৎ বন্যা বা জল জমা কমে এবং ভূমিক্ষয় রোধ হয়।
৪. মাটির নিচে রিচার্জ পিটের মাধ্যমে জল পাঠালে ভূগর্ভস্থ জলস্তর আবার ধীরে ধীরে ওপরের দিকে উঠে আসতে সাহায্য করে।
৫. সংগৃহীত জল সামান্য শোধন করলেই দৈনন্দিন স্নান, কাপড় কাচা, বাসন মাজা, গৃহপালিত পশুর পরিচর্যা ও বাগানের কাজে নিশ্চিন্তে ব্যবহার করা যায়।
জলবিজ্ঞানের এই বিশ্বজোড়া লড়াইয়ে একজন বঙ্গসন্তানের গবেষণা আজ সারা বিশ্বে সমাদৃত। আইআইটি খড়্গপুরের ভূতত্ত্ব ও ভূপ্রকৃতিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক অভিজিৎ মুখোপাধ্যায় দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারতের ভূগর্ভস্থ জলস্তর ও আর্সেনিক দূষণ প্রতিরোধে মৌলিক গবেষণা চালিয়ে আসছেন। ভূগর্ভস্থ জলের সঞ্চয় ও তার ভবিষ্যৎ ঝুঁকি নির্ধারণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উপগ্রহ প্রযুক্তির মেলবন্ধন ঘটিয়ে তিনি এক অনন্য দিশা দেখিয়েছেন। তাঁর এই যুগান্তকারী কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি আমেরিকার সম্মানীয় জিওলজিক্যাল সোসাইটি অব আমেরিকার ফেলো নির্বাচিত হয়েছেন। শতবর্ষের বেশি ইতিহাসে কোন ভারতীয় নাগরিক হিসেবে এই সম্মান অর্জন করা নিঃসন্দেহে দেশের পক্ষে এক বিরল গৌরব। এর আগে তিনি ভারত সরকারের সর্বোচ্চ বিজ্ঞান সম্মান শান্তিস্বরূপ ভাটনগর পুরস্কার এবং ন্যাশনাল জিওসায়েন্স অ্যাওয়ার্ডেও ভূষিত হয়েছেন। শুধু গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ না থেকে আগামী প্রজন্মের ছাত্রছাত্রীদের এই কাজে যুক্ত করা এবং কৃষিক্ষেত্রে জলের অপচয় কমানোর প্রযুক্তি উদ্ভাবনে তিনি নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন।
আমাদের রাজ্যেও জল সংরক্ষণের ক্ষেত্রে বেশ কিছু প্রশংসনীয় উদ্যোগ অতীতে দেখা গেছে। ২০১১ সালে শুরু হওয়া ‘জল ধরো জল ভরো’ কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্যই ছিল বৃষ্টির জল অপচয় না করে পুকুর খনন ও চেক ড্যামের মাধ্যমে তা কৃষিকাজে লাগানো। বহু ব্লকে এর জন্য জলাশয় কাটা হয়েছিল। এই ধরনের প্রকল্পকে সরকারি কাজের বাইরে এনে প্রতিটি গ্রাম ও শহরের সাধারণ মানুষের সামাজিক অভ্যাসে পরিণত করা দরকার। প্রতিটি বহুতল আবাসন ও সরকারি ভবনে বৃষ্টির জল সংরক্ষণের পরিকাঠামো তৈরি বাধ্যতামূলক করা এখন সময়ের দাবি। ঠিক যেমন পশ্চিমবঙ্গের রাজভবনে অবস্থানকালে তৎকালীন রাজ্যপাল গোপালকৃষ্ণ গান্ধী বৃষ্টির জল ধরে রেখে তা ব্যবহারের এক সুন্দর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, যা নাগরিকদের পরিবেশ চেতনার পাঠ দিয়েছিল।

জল কোনও অফুরন্ত কারখানা থেকে তৈরি হয়ে আসে না, এটি প্রকৃতির এক সীমিত দান। রাস্তার খোলা কল বন্ধ করা, দাঁত মাজার সময় কল খুলে না রাখা, গৃহস্থালির ব্যবহৃত জল বাগানে কাজে লাগানো এবং সর্বোপরি বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা মাটির বুকে ধরে রাখার দায়িত্ব আমাদের সকলের। আজ যদি আমরা সচেতন না হই, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক রুক্ষ, তৃষ্ণার্ত পৃথিবী রেখে যেতে হবে। সুকুমার রায়ের সেই নাটকের সংলাপের মতো তখন হাহাকার করে ঘুরে মরতে হবে— একটু জল পাই কোথায় বলতে পারেন, তৃষ্ণায় ছাতি ফেটে যাচ্ছে!