নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায়
লালকেল্লায় বিচার হয়েছিল নেতাজির অনুগামী আইএনএ যুদ্ধবন্দীদের, উত্তাল হয়ে উঠেছিল সারা দেশ, সে ইতিহাস অনেকেই জানেন। ব্রিটিশ যখন ক্ষমতা হস্তান্তর করে এই উপমহাদেশ ছেড়ে চলে যেতে চাইছে, তখনও যে দক্ষিণ এশিয়ার নানান দেশে, পাহাড় পর্বতে, উপকূলে, ব্রিটিশের হয়ে লড়াই করে চলেছে ভারতীয় সৈন্যরা, তার বিশদ খবর রাখেন কজন? রাজশক্তির অনুগামী সেনাবাহিনীর সেটি জীবিকাদায়। তাই বলে, তাঁদের ত্যাগ ও বীরত্বের কথা, আমরা মনে রাখব না?
Advertisement
গৌতম হাজারিকা, তাঁর নতুন বই, ‘দ্য ফরগটেন ইন্ডিয়ান প্রিজনারস অফ ওয়ার্ল্ড ওয়ার টু: সারেন্ডার, লয়্যালিটি, বিট্রেয়াল অ্যান্ড হেল’, এতে এসব প্রসঙ্গই এনেছেন। সিঙ্গাপুর, মালয় কি মায়ানমারে ব্রিটিশবাহিনীতে অনেক ভারতীয় সৈন্যরা জাপানের বিরুদ্ধে লড়েছেন, যুদ্ধবন্দী রূপে জাপানের হাতে অনেক অত্যাচার সয়েছেন, সেসব কিছুটা আমরা জানি। জাপান যখন সিঙ্গাপুর ও মালয় দখল করলো, তখন ৬৭ হাজার ভারতীয় সেনা সেখানে হাজির, যারা আইএনএতে যোগ দেননি। ওদিকে, পাপুয়া নিউ গিনিতে কী ঘটেছিল, সঠিক জানা আছে কি?
Advertisement
জার্মান–জাপান অক্ষশক্তির অগ্রগতি তখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অব্যাহত। অস্ট্রেলিয়াকে জিতে নেবার লক্ষ্যে, লঞ্চিং প্যাড হিসেবে তারা পাপুয়া নিউ গিনিকে ব্যবহার করতে চাইছিল। ব্যাপক লোকবল দরকার। দ্বীপের স্থানীয় লোকজনের পাশাপাশি যুদ্ধবন্দীদের নিয়োগ করা হল রাস্তাঘাট বানানো থেকে ট্রেঞ্চ কি সুড়ঙ্গ খননের মতন নানারকম শ্রমসাধ্য কাজে। ‘দ্য ব্রিজ অন দ্য রিভার কোয়াই,’ সিনেমার কথা মনে পড়ছে?
দু-লাখ কুড়ি হাজার কর্মীর মধ্যে এক লাখ কুড়ি হাজার শ্রমিকের মৃত্যু ঘটেছিল বলে শোনা যায়। ১৭ হাজার যুদ্ধবন্দি ব্রিটিশ-ভারতীয় সৈন্য সিঙ্গাপুর থেকে জাহাজে চাপিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ‘নিউ ব্রিটেন’ নামে পরিচিত তখনকার নিউ গিনির উত্তরপ্রান্তে। ৩ হাজার শ্রমিকের জলপথেই মৃত্যু হল। বাদবাকি ১৪ হাজারের মধ্যে হাজার তিনেককে দক্ষিণপ্রান্তে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ১৯৪৪ সালে ভারতে পালিয়ে গেল ১৮৫ জন। রইলো বাকি ২৮১৫! তাদের মধ্যে নিজের বাড়িতে ফিরতে পেরেছিল একজন, হ্যাঁ, মাত্র একজন! আধপেটা খাওয়া, বিনা চিকিৎসায় শেষ হয়ে যাওয়া, এই ছিল প্রায় হাজার ছয়েক যুদ্ধবন্দি শ্রমিকের নিয়তি।
যুদ্ধ শেষ হলে, অস্ট্রেলিয়ার অনেকেই যখন দেখতে এল কী অবস্থা ওই দ্বীপের বাসিন্দাদের, তখন দেখা গেল কিছু কঙ্কালসার না-মানুষ। ভাষাহীন তাদের দৃষ্টি, তবু, জাপানিরা কতভাবে যে অত্যাচার করেছে, বলবে বলেই যেন বেঁচে আছে তারা। তবু, অস্ট্রেলিয়ার উদ্যোগেই জাপানিদের বিরুদ্ধে শতাধিক যুদ্ধাপরাধের মামলা হয় এবং বিচারে ফাঁসি হয় ৩৬ জন জাপানির।
নেতাজি সুভাষকে আবেগদীপ্ত আলোয় আঁকা হয়েছে ইতিহাসভিত্তিক নানান বইয়ে। বিজিত ব্রিটিশ উপনিবেশগুলিতে, সাধারণ গরিব মানুষের ওপর যে জাপান নানারকম অত্যাচার করতে করতে এগিয়েছে, নেতাজি একটি কথাও কখনও বলেননি তা নিয়ে। ভিন্ন গ্রন্থে পাচ্ছি এসব তথ্য, দেশবাসীর যে অভিমান হবে তাঁর প্রতি, সে যে স্বতঃসিদ্ধ! জাপানিদের হাতে আরেকবার পরাধীন হবার চাইতে পরিচিত প্রভু ব্রিটিশ বরং ভালো, অনেকেই এমন ভেবেছিলেন, স্বাভাবিক!
গৌতম হাজারিকার বইটি আইএনএ নিয়ে নয়, তবে ঘটনাচক্রে তৎকালীন কিছু কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য প্রকাশ পাচ্ছে। আত্মসমর্পণ করা ব্রিটিশ ভারতীয় সেনারা ছিলেন দেশপ্রেমের আবেগে ঋদ্ধ কিছু সাধারণ মানুষের পাশে। আইএনএ-র নেতৃত্বে তিনটি পর্ব লক্ষ্য করা যায়। শুরুতে ক্যাপ্টেন মোহন সিং, রাসবিহারী বসু, তারপর স্বয়ং নেতাজি সুভাষ। মোহন সিং ক্যাপ্টেন ছিলেন ব্রিটিশ ভারতীয় বাহিনীতে। এদিকে তাঁর ওপরের ধাপের অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল এন এস গিল এসে যখন আইএনএতে যোগ দিলেন, কেমন লাগে তখন অতীতের অধস্তনের আদেশে কাজ করতে? এই ধরনের সমস্যা এসেছে অনেকবারই, উদাহরণস্বরূপ এইটি বলা হল।
জাপানি সেনানায়কদের নির্দেশে, গিলকে গুপ্তচর হিসেবে গুরুতর কাজ করতে বলা হল মায়ানমার দেশের বাইরে। সে কাজে মন না দিয়ে তিনি পালিয়ে যাবার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু পারলেন না শেষপর্যন্ত। আইএনএ-র প্রস্তুতিপর্বে ক্যাপ্টেন মোহন সিং-এর অবদান অপরিসীম, জাপানিদের কাছে চেয়েচিন্তে যা অস্ত্রশস্ত্র মেলে এবং যত উৎসাহী ছেলেপুলে যুদ্ধে যোগদানে ইচ্ছুক, তাদের নিয়ে দল গড়েছিলেন। শেষমেশ তিনিও কিন্তু জাপানিদের বিশ্বাস করেননি। আদেশ না মানার জন্যে জাপানিদের হাতে তিনি বন্দি হন।
যুদ্ধের গতি ক্রমে মিত্রশক্তি, অর্থাৎ ব্রিটিশদের দিকে যখন ঘুরছে, তখন বাহিনীতে দুই ধরনের দৃশ্য দেখা গেল। আত্মসমর্পণের পর যারা আইএনএ তে যোগ দেয়নি, তাদের ফিরিয়ে নেওয়া হল বাহিনীতে। আইএনএ-র যুদ্ধবন্দিদের আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তিনরকম রঙে তাদের চিহ্নিত করা হয়, সাদা, কালো এবং ধূসর। কালো মানে ঘোরতর ব্রিটিশবিরোধী, তাদের তাড়িয়ে দেওয়া হল। ধূসরদের পাঠানো হল পুনর্বাসন ক্যাম্পে, তাদের মতিগতি কোনদিকে, তা খেয়াল রাখতে। তবে ভারতীয় সেনাদের নিয়ে নানারকম আশঙ্কা ব্রিটিশদের ছিলই!
পরিহাস চালু ছিল মাউন্টব্যাটেন সাহেবের নামে। হবু প্রধানমন্ত্রী নেহরুকে নাকি তিনি বলেছিলেন, ভারতীয় সেনাদের আর কিন্তু ব্রিটিশবাহিনীতে নেওয়া হবে না! বাদামি, তথা কালা আদমিদের নিয়ে দ্বিধা ওপরমহলের সাহেবদের থাকবে, তা স্বাভাবিক। সাম্রাজ্য তো অস্তমিত, এবার তারা মানে মানে পালাতে পারলে বাঁচে।
দেশপ্রেম, পুড়ে যায় বাস্তবতার নানান হিসেবের আঁচে। কর্তার ইচ্ছায় কর্ম, রাষ্ট্রের নেতাদের নির্দেশে যুদ্ধ অথবা শান্তি। জলে স্থলে অন্তরীক্ষে যাঁরা জান লড়িয়ে দিচ্ছেন, হচ্ছে আত্মবলিদান, তাঁরা কি বীর নন?
ইতিহাসের ভাষ্য নানারকম। সহযোগিতার আশ্বাসে জাপান এশিয়ার নানান দেশকে জড়িয়ে যুদ্ধ করলেও, তাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল প্রবল। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর কি মায়ানমারে যা হয়েছে, ভারতে কি তার চেয়ে আলাদা কিছু হত? ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বদলে কি জাপানি সাম্রাজ্যবাদ অধিক উপযোগী হত এশিয়ায়? ইচ্ছে করলেই জাপান উদার হতে পারতো আরও, তবে ভারতবর্ষ নিয়ে তাদের আরও কিছু অভিনব পরিকল্পনার কথা এই বই থেকে জানা যায়। নানান দেশের সমাহার রূপে তারা দেখেছিল এই অঞ্চলকে। শ্রীলঙ্কা ও দক্ষিণ ভারত নিয়ে আলাদা এক দেশ পরিকল্পনায় ছিল তাদের। অনেকগুলো ভাগে খণ্ডিত হয়ে যেত এই দেশ, তখনই৷
নিতান্তই বিলিতি ন্যারেশান বলে কিছু কিছু বই। তবু, মানতে তো বাধা নেই৷
Advertisement



