• facebook
  • twitter
  • youtube
Thursday, 5 November, 2026

প্রবীণ-নবীন মেলবন্ধন

সরকার ও নির্বাচন কমিশনের উচিত প্রতিবাদকে শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে না দেখে নাগরিকদের উদ্বেগের কারণগুলি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের জবাব দমন বা অবিশ্বাস দিয়ে নয়, স্বচ্ছতা, আলোচনা ও কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে দেওয়াই গণতান্ত্রিক পথ।

প্রবীণ-নবীন মেলবন্ধন

Photo: File photo

গণতন্ত্রের শক্তি শুধু তার সংবিধান, সংসদ কিংবা নির্বাচনী ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি নির্ভর করে নাগরিকেরা কতটা সচেতন এবং অন্যের অধিকার রক্ষায় কতটা এগিয়ে আসেন, তার ওপর। বিশেষ করে যখন তরুণদের প্রতিবাদের পাশে প্রবীণ নাগরিকেরা এসে দাঁড়ান, তখন গণতন্ত্রের এক গুরুত্বপূর্ণ ছবি সামনে আসে। প্রমাণ হয়, বয়সের পার্থক্য থাকলেও ন্যায় ও অধিকারের প্রশ্নে মানুষের মধ্যে ঐক্য গড়ে উঠতে পারে।

দিল্লিতে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর-কে কেন্দ্র করে অক্টোবর মাসে যে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ দেখা গিয়েছে, তাতে এই বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ছাত্রছাত্রী, তরুণ আন্দোলনকারী ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সদস্যদের পাশাপাশি অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী, প্রবীণ পেশাজীবী এবং সাধারণ বয়স্ক মানুষও প্রতিবাদে শামিল হয়েছেন। তাঁদের অনেকেই জীবনের এই পর্যায়ে এসে রাজনৈতিক আন্দোলনের সামনের সারিতে থাকার কথা ভাবেননি। তবু তাঁরা পথে নেমেছেন। কারণ, তাঁদের কাছে বিষয়টি কোনও বিশেষ দল বা গোষ্ঠীর স্বার্থের প্রশ্ন নয়, নাগরিক অধিকার রক্ষার প্রশ্ন।

ভোটার তালিকা সংশোধনের উদ্দেশ্য অবশ্যই হওয়া উচিত তালিকাকে নির্ভুল করা। কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় যদি কোনও যোগ্য ভোটারের নাম ভুল করে বাদ পড়ে যায়, তাহলে তা গুরুতর অন্যায়। ভোট দেওয়া শুধু একটি সাংবিধানিক অধিকার নয়, নাগরিক হিসেবে নিজের মত প্রকাশের অন্যতম প্রধান উপায়। সেই অধিকার রক্ষার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। তাই সংশোধনের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা, শুদ্ধতা এবং অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা থাকা জরুরি।

এই আন্দোলনে প্রবীণদের যোগ দেওয়ার আর একটি তাৎপর্য রয়েছে। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ অতীতে বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন বলেও জানা যাচ্ছে। কিন্তু কোনও রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করা মানেই তার প্রতিটি কাজকে সমর্থন করা নয়। অন্যায় বা অধিকার হরণের আশঙ্কা দেখা দিলে নিজের রাজনৈতিক পছন্দের ঊর্ধ্বে উঠে প্রতিবাদ করা সুস্থ গণতান্ত্রিক চেতনার পরিচয়। তবে কিছু মানুষের অবস্থান বদলকে সারা দেশের জনমতের পরিবর্তন বলে ধরে নেওয়াও ঠিক হবে না।

শুধু ভোটার তালিকা নয়, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, নিয়োগে অনিয়ম এবং চাকরির অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধেও তরুণদের আন্দোলনে প্রবীণদের উপস্থিতি দেখা গিয়েছে। এর কারণ সহজেই বোঝা যায়। একটি চাকরির পরীক্ষার জন্য একজন তরুণকে বছরের পর বছর প্রস্তুতি নিতে হয়। পরিবারের সঞ্চয়ের বড় অংশ ব্যয় হয় তাঁর পড়াশোনা ও প্রশিক্ষণে। সেই পরীক্ষায় দুর্নীতি হলে শুধু একজন পরীক্ষার্থীর স্বপ্ন ভাঙে না, ক্ষতিগ্রস্ত হয় গোটা পরিবার। পরিশ্রম ও যোগ্যতার মূল্য পাওয়ার যে আশা নিয়ে তরুণেরা এগিয়ে চলে, সেই বিশ্বাসও দুর্বল হয়ে পড়ে।

প্রবীণেরা নিজেদের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে এই যন্ত্রণা বুঝতে পারেন। তবে তাঁদের অভিজ্ঞতা যেন তরুণদের উপদেশ দেওয়া বা তাঁদের আন্দোলনকে ছোট করে দেখার কারণ না হয়। আবার প্রতিবাদে অংশ নেওয়া মানেই প্রতিটি অভিযোগ সত্য, এমনটাও নয়। অভিযোগের যথাযথ তদন্ত হওয়া দরকার। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার যেমন রক্ষা করতে হবে, তেমনই তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

সরকার ও নির্বাচন কমিশনের উচিত প্রতিবাদকে শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে না দেখে নাগরিকদের উদ্বেগের কারণগুলি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের জবাব দমন বা অবিশ্বাস দিয়ে নয়, স্বচ্ছতা, আলোচনা ও কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে দেওয়াই গণতান্ত্রিক পথ।

প্রজন্মের মধ্যে মতের অমিল থাকবেই। কিন্তু সেই অমিল যেন পরস্পরের শত্রুতায় পরিণত না হয়। প্রবীণেরা যখন তরুণদের পাশে দাঁড়ান, তখন তাঁরা শুধু একটি আন্দোলনকে সমর্থন করেন না, তাঁরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার দায়িত্বও গ্রহণ করেন। গণতন্ত্র কোনও একটি বয়সের মানুষের সম্পত্তি নয়। তাকে রক্ষা করার দায়িত্ব সকলের।