• facebook
  • twitter
  • youtube
Friday, 12 June, 2026

অস্তিত্বের সংকট তৃণমূলের

দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে ঘিরে দ্বন্দ্ব, সাংসদদের পদত্যাগ এবং ভাঙনের আশঙ্কা— সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে

প্রতীকী চিত্র

পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনীতি আজ এক গভীর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে স্পষ্ট, তৃণমূল কংগ্রেসের ভেতরে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়— বরং একটি বড় রাজনৈতিক সংকটের লক্ষণ। দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে ঘিরে দ্বন্দ্ব, সাংসদদের পদত্যাগ এবং ভাঙনের আশঙ্কা— সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে।
কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো একজন প্রবীণ নেতা যখন প্রকাশ্যে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন, তখন তা নিছক ব্যক্তিগত ক্ষোভ বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, অভিষেকের নেতৃত্বে তিনি আর থাকতে পারবেন না। তাঁর অভিযোগ— দলের ভেতরে প্রবীণদের সম্মান নেই, সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে একতরফাভাবে। এই বক্তব্য শুধু একজন নেতার নয়, বরং দলের একাংশের মনের কথাও।
এই ঘটনার পাশাপাশি রাজ্যসভা থেকে একাধিক সাংসদের পদত্যাগ পরিস্থিতিকে আরও সংকটজনক করে তুলেছে। এতে শুধু সংখ্যাগত ক্ষতি নয়, রাজনৈতিক বার্তাও স্পষ্ট— দলের ভিতরে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। এমনকি লোকসভাতেও ভাঙনের গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। যদিও কিছু নেতা প্রকাশ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেছেন, তবু সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতি স্থিতিশীল বলা যায় না।
এই অস্থিরতার পেছনে কয়েকটি বড় কারণ কাজ করছে। প্রথমত, নেতৃত্বের কেন্দ্রীকরণ। দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ উঠেছে যে, দলের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলি সীমিত কয়েকজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এতে অন্য নেতাদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়া স্বাভাবিক। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক পরাজয়ের অভিঘাত। সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয় দলের মনোবলকে বড় ধাক্কা দিয়েছে।
এর ফলে দলে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা ভাঙনের ঝুঁকি বাড়িয়েছে।তৃতীয়ত, বাইরের চাপও উপেক্ষা করা যায় না। বিজেপি এখন রাজ্যের ক্ষমতায়, এবং তাদের রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে বিরোধী দলকে দুর্বল করার চেষ্টা থাকবে— এটাই স্বাভাবিক। যদি সত্যিই দলবদলকে উৎসাহ দেওয়া হয়, তবে তা তৃণমূলের সংকটকে আরও গভীর করবে।
এই পরিস্থিতিতে তৃণমূল কংগ্রেসের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল সংগঠনকে ধরে রাখা। শুধু শীর্ষস্তরে নয়, নিচুতলার কর্মীদের মধ্যেও যদি অনিশ্চয়তা ছড়িয়ে পড়ে, তবে তা দলের অস্তিত্বের জন্য বড় বিপদ হয়ে উঠতে পারে। অতীতে আমরা দেখেছি, রাজনৈতিক দল ভাঙতে শুরু করলে তার প্রভাব দ্রুত নিচে নেমে যায়।
এখন প্রশ্ন উঠছে, সমাধান কী? কিছু মহলে কংগ্রেসের সঙ্গে সম্ভাব্য একীভূত হওয়ার কথাও শোনা যাচ্ছে। এই প্রস্তাব একদিকে যেমন তৃণমূলকে জাতীয় স্তরে নতুন পরিচিতি দিতে পারে, অন্যদিকে কংগ্রেসও রাজ্যে নতুন করে শক্তি পেতে পারে। তবে এই ধরনের সিদ্ধান্ত সহজ নয়। দলীয় স্বাতন্ত্র্য, নেতৃত্বের প্রশ্ন, এবং রাজনৈতিক কৌশল— সব কিছুই বিবেচনা করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা। তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতা এবং মুখ্য শক্তি। এই সংকটের মুহূর্তে তাঁর সিদ্ধান্তই ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। তিনি কি দলীয় ঐক্য বজায় রাখতে কঠোর পদক্ষেপ নেবেন, নাকি বর্তমান কাঠামো বজায় রাখবেন, তা সময়ই বলবে।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এখন নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে।
বিজেপি শক্ত অবস্থানে রয়েছে, সিপিএমও ধীরে ধীরে সক্রিয় হচ্ছে। এই অবস্থায় তৃণমূল কংগ্রেস যদি নিজেদের ভিত মজবুত করতে না পারে, তবে রাজনৈতিক জমি আরও সঙ্কুচিত হবে। শেষ কথা হল, রাজনীতি কখনোই স্থির নয়। পরিবর্তনই তার নিয়ম। কিন্তু সেই পরিবর্তন যদি নিয়ন্ত্রিত না হয়, তবে তা ধ্বংসের পথও দেখাতে পারে। তৃণমূল কংগ্রেসের বর্তমান সংকট সেই পরীক্ষারই একটি বড় উদাহরণ। এখন দেখার, তারা এই সংকট থেকে নতুন শক্তি নিয়ে বেরিয়ে আসতে পারে, নাকি ভাঙনের পথে আরও এগিয়ে যায়।