• facebook
  • twitter
Sunday, 11 January, 2026

বিষাক্ত ‘পানীয়’ জল

কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার একে অপরের দিকে দায় ঠেলে দিচ্ছে। কেন্দ্র বলছে, প্রকল্পের জন্য অর্থ বরাদ্দ হয়েছে। রাজ্য বলছে, বাস্তবায়নে কেন্দ্র যথেষ্ট সহযোগিতা করেনি।

প্রতীকী চিত্র

ইন্দোরে বিষাক্ত পানীয় জল পান করে একের পর এক মানুষের মৃত্যু দেশের তথাকথিত ‘উন্নয়ন’-এর দাবি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। স্মার্ট সিটি, অমৃত প্রকল্প, জল জীবন মিশনের ঢাক পেটানো প্রচারের মাঝেই বাস্তব চিত্র ভয়াবহ— নাগরিকেরা এখনও নিরাপদ এক গ্লাস পানীয় জল থেকে বঞ্চিত। ইন্দোরের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়, বরং তা গোটা দেশের নগরজল ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের অবহেলা ও ব্যর্থতার প্রতিফলন।

ইন্দোরকে বহু বছর ধরে ভারতের ‘সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন শহর’ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে পুরস্কার, কেন্দ্রের প্রশংসা, প্রশাসনের আত্মতৃপ্তি, সবই ছিল। অথচ সেই শহরেই নলবাহিত জলে নিকাশির মিশ্রণ, ব্যাকটেরিয়াজনিত দূষণ এবং অপরিশোধিত জল সরবরাহ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। সরকারি তদন্তে একাধিক ক্ষেত্রে জলদূষণের প্রমাণ মিলেছে। প্রশ্ন একটাই, যে শহর পরিচ্ছন্নতার মডেল বলে প্রচারিত, সেখানে পানীয় জলের মতো মৌলিক পরিষেবায় এত মারাত্মক গাফিলতি কীভাবে সম্ভব?

Advertisement

ইন্দোরের ঘটনার পর স্বাভাবিকভাবেই নজর গিয়েছে মধ্যপ্রদেশ ও গুজরাতের অন্যান্য শহরের দিকে। গান্ধীনগর ও উজ্জয়িনীতে এখনও পর্যন্ত সরাসরি ‘বিষাক্ত জল পান করে মৃত্যুর নিশ্চিত খবর না মিললেও, পরিস্থিতি মোটেই আশ্বস্তকর নয়। গান্ধীনগরে জলবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব, টাইফয়েড ও ডায়রিয়ার মতো অসুস্থতার খবর প্রশাসনকে সতর্ক করেছে। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য দপ্তরের বক্তব্যে স্পষ্ট— পানীয় জলের গুণমান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। উজ্জয়িনীতে, ইন্দোরের ঘটনার পরই, পুরসভার পক্ষ থেকে নাগরিকদের নলকূপ বা কলের জল সরাসরি পান না করার সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে। অর্থাৎ বিপদ যে কল্পনাপ্রসূত নয়, প্রশাসন নিজেই তা স্বীকার করছে।

Advertisement

এই প্রেক্ষাপটে স্পষ্ট হয়ে উঠছে একটি বৃহত্তর সত্য— দেশের শহরগুলিতে পানীয় জল ব্যবস্থাপনা গভীর সংকটে। অপরিকল্পিত নগরায়ন, শিল্পাঞ্চলের বর্জ্য, অপর্যাপ্ত নিকাশি ব্যবস্থা এবং ভূগর্ভস্থ জলের অতিরিক্ত ও অবৈজ্ঞানিক ব্যবহার জলস্তরকে ক্রমশ বিষাক্ত করে তুলছে। কিন্তু বিপদের আগাম সংকেত থাকা সত্ত্বেও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। প্রশাসন নড়েচড়ে বসে তখনই, যখন মৃত্যু ঘটে বা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

সবচেয়ে মর্মান্তিক দিক হল, এই সংকটের প্রথম শিকার হয় সমাজের দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষ– যাঁরা বোতলজাত জল কিনতে পারেন না, যাঁরা সরকারি কল বা নলকূপের উপর নির্ভরশীল। উন্নয়নের যে পরিসংখ্যান সরকারি মঞ্চে তুলে ধরা হয়, সেখানে তাঁদের জীবনের নিরাপত্তার কোনও হিসাব নেই। স্মার্ট সিটি যদি শুধু চকচকে রাস্তা, ক্যামেরা আর অ্যাপের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, কিন্তু তার নাগরিক যদি নিরাপদ জল না পায়, তবে সেই স্মার্টনেস অর্থহীন।

কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার একে অপরের দিকে দায় ঠেলে দিচ্ছে। কেন্দ্র বলছে, প্রকল্পের জন্য অর্থ বরাদ্দ হয়েছে। রাজ্য বলছে, বাস্তবায়নে কেন্দ্র যথেষ্ট সহযোগিতা করেনি। পুরসভা বলছে, রিপোর্ট আসেনি বা তদন্ত চলছে। এই দায় এড়ানোর রাজনীতির মাঝেই মানুষের জীবন বিপন্ন হচ্ছে। পানীয় জল কোনও রাজনৈতিক ইস্যু নয়, এটি মৌলিক মানবাধিকার। সংবিধান যে জীবনের অধিকার নিশ্চিত করে, তার সঙ্গে নিরাপদ জল অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত।

যে দেশ চন্দ্রযান পাঠায়, ডিজিটাল বিপ্লবের কথা বলে, বিশ্বমঞ্চে নেতৃত্বের স্বপ্ন দেখায়, সেই দেশেই মানুষ এক গ্লাস জল খেয়ে অসুস্থ হয়, প্রাণ হারায়। এই বৈপরীত্য কেবল লজ্জাজনক নয়, বিপজ্জনকও। কারণ এতে বোঝা যায়, রাষ্ট্রের অগ্রাধিকারে মানুষের দৈনন্দিন বেঁচে থাকা ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছে।

এখনই প্রয়োজন সমন্বিত ও স্বচ্ছ পদক্ষেপ। নিয়মিত ও প্রকাশ্য জল পরীক্ষা, শিল্পবর্জ্যের উপর কঠোর নজরদারি, পরিশোধন পরিকাঠামোয় বাস্তব বিনিয়োগ এবং নাগরিকদের প্রতি জবাবদিহি— এই বিষয়গুলিকে আর উপেক্ষা করা চলবে না। ইন্দোরের মৃত্যু যেন গান্ধীনগর বা উজ্জয়িনীতে পুনরাবৃত্তি না হয়, তার দায় রাষ্ট্রকেই নিতে হবে।

নচেৎ, উন্নয়নের বিজ্ঞাপন চলতেই থাকবে, আর নীরবে, অদৃশ্য পথে, বিষাক্ত জল মানুষের জীবন কেড়ে নেবে।

Advertisement