সৈয়দ হাসমত জালাল
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশ্ব রাজনীতিতে তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা একটি সার্বভৌম দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে জোর করে আটক করে আমেরিকায় নিয়ে গিয়েছে। এই ঘটনাকে অনেক দেশ সরাসরি ‘অপহরণ’ বলছে। আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রের সার্বভৌম অধিকার এবং শক্তিধর দেশের আগ্রাসী নীতির প্রশ্নে গোটা বিশ্ব আজ বিভক্ত।
Advertisement
এই ঘটনার পর থেকেই বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড় উঠেছে। ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা, এশিয়া— প্রায় সর্বত্রই প্রশ্ন উঠছে, কোনও দেশ কি অন্য দেশের প্রেসিডেন্টকে এইভাবে ধরে নিয়ে যেতে পারে? আর সেই প্রশ্নের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে ভারতের অবস্থান— যা অনেকের চোখে খানিকটা ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ নীতিরই আর এক উদাহরণ।
Advertisement
আমেরিকার দাবি, নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক পাচার ও আর্থিক অপরাধের অভিযোগ রয়েছে এবং সেই কারণেই এই পদক্ষেপ। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে পদ্ধতি নিয়ে। কোনও আন্তর্জাতিক আদালতের রায় ছাড়া, রাষ্ট্রসঙ্ঘের অনুমতি ছাড়া, একটি স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে সামরিক অভিযানে আটক করা কি আইনসম্মত?
আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের বড় অংশ বলছেন, এ ধরনের পদক্ষেপ সরাসরি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বে আঘাত। আজ ভেনেজুয়েলা, কাল অন্য কোনও দেশের ক্ষেত্রেও এরকম ঘটনা ঘটতে পারে, এই নজির বিপজ্জনক। কারণ এতে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলি নিজেদের আইনের ঊর্ধ্বে ভাবতে শুরু করে।
চিন, রাশিয়া, ইরান-সহ একাধিক দেশ এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছে। তাদের বক্তব্য, এই ধরনের কাজ আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। লাতিন আমেরিকার বহু দেশ বলছে, এটি আসলে পুরনো সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতারই নতুন রূপ। শুধু রাষ্ট্রই নয়, বিশ্বজুড়ে নাগরিক সমাজ, বামপন্থী দল, মানবাধিকার সংগঠন রাস্তায় নেমেছে। তাদের বক্তব্য স্পষ্ট— আইনের নামে শক্তির প্রদর্শন গ্রহণযোগ্য নয়।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ঘটনার বিরোধিতা আমেরিকার ভেতর থেকেই উঠছে। সেনেটর বার্নি স্যান্ডার্স প্রকাশ্যে এই পদক্ষেপের নিন্দা করেছেন। তাঁর ভাষায়, এটি ‘আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন এবং নগ্ন সাম্রাজ্যবাদ’। তিনি বলেছেন, কোনও দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করার অধিকার আমেরিকার নেই। তেলের জন্য, ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের জন্য অন্য দেশের ওপর জোর খাটানো গণতন্ত্রের পরিপন্থী।
নিউ ইয়র্ক, ওয়াশিংটন, শিকাগোর মতো শহরে বিক্ষোভ হয়েছে। স্লোগান উঠেছে— ‘তেলের জন্য যুদ্ধ নয়’, ‘লাতিন আমেরিকা থেকে হাত সরাও’।
এই পুরো ঘটনার পেছনে সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটি ঘুরছে, তা হলো তেল। ভেনেজুয়েলাতে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল ভাণ্ডার রয়েছে। বহু বছর ধরেই এই তেলের উপর আমেরিকার বড় শিল্পগোষ্ঠীর নজর। বিশ্লেষকদের মতে, মাদুরো সরকার মার্কিন স্বার্থের পক্ষে সহায়ক নয় বলেই দীর্ঘদিন ধরে তাকে চাপের মুখে রাখা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক অবরোধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা— সব কিছুর পর এই ঘটনা কি সেই একই নীতির চরম রূপ?
এই পুরো ঘটনায় ভারতের প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত সতর্ক। ভারত শান্তির কথা বলেছে, সংলাপের কথা বলেছে, কিন্তু স্পষ্টভাবে আমেরিকার এই পদক্ষেপের নিন্দা করেনি। ভারতের এই অবস্থান অনেকের চোখে দ্বিধাজড়িত। ভারত একদিকে নিজেকে গ্লোবাল সাউথের নেতা হিসেবে তুলে ধরতে চায়, অন্যদিকে আবার শক্তিধর দেশের অন্যায়ের বিরুদ্ধে স্পষ্ট কথা বলতে পিছিয়ে যায়। ভারতের এই নীতি অনেকটা জল না ছুঁয়ে মাছ ধরার চেষ্টা।
ভারত ঐতিহাসিকভাবে জোটনিরপেক্ষতা, আন্তর্জাতিক আইন এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের পক্ষে কথা বলেছে। আজ যদি ভারত সত্যিই একটি দায়িত্বশীল বৈশ্বিক শক্তি হতে চায়, তাহলে কিছু বিষয় স্পষ্টভাবে বলা দরকার— প্রথমত, কোনও দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে জোর করে আটক করা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী, এ কথা বলার সাহস দেখাতে হবে। দ্বিতীয়ত, শান্তির আহ্বান শুধু কূটনৈতিক বাক্য হয়ে থাকলে চলবে না। অন্যায়ের বিরুদ্ধে নৈতিক অবস্থান নেওয়াই প্রকৃত শান্তির পথ। তৃতীয়ত, আজ ভেনেজুয়েলা, কাল অন্য কোনও উন্নয়নশীল দেশ— এই নজির ভারতের নিজের নিরাপত্তার পক্ষেও বিপজ্জনক। তাই ভারতের এই ভূমিকা ভারতের স্বার্থেই তাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে।
ভারত চাইলে রাষ্ট্রসঙ্ঘে নিরপেক্ষ কিন্তু স্পষ্ট অবস্থান নিতে পারে— আইন মানা হোক, সংলাপে সমস্যা মেটানো হোক, শক্তির ব্যবহার বন্ধ হোক।
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে ঘিরে এই ঘটনা শুধু একটি দেশের সংকট নয়। এটি গোটা বিশ্বের সামনে এক বড় প্রশ্ন— শক্তিই কি তাহলে শেষ কথা? নাকি আইন, নৈতিকতা এবং সার্বভৌমত্বের এখনও কোনও মূল্য আছে?
এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করবে শুধু আমেরিকার উপর নয়, ভারতের মতো দেশের অবস্থানের উপরেও। ইতিহাস নীরব দর্শকদের ক্ষমা করে না। আজ যে দেশ কথা বলে না, কাল তার কথাও কেউ শুনবে না, এই সত্য ভারতকে ভুললে চলবে না।
মনে রাখা দরকার, আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে জোর করে আটক করে অন্য দেশে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা অত্যন্ত গুরুতর। রাষ্ট্রপুঞ্জের সনদ বা ইউএন চার্টার অনুযায়ী, প্রতিটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা অক্ষুণ্ণ রাখা বাধ্যতামূলক। কোনও দেশই অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সামরিক বা জোরপূর্বক হস্তক্ষেপ করতে পারে না, যদি না রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্পষ্ট অনুমোদন থাকে।
এক্ষেত্রে সেই অনুমোদনের কোনও প্রমাণ সামনে আসেনি। ফলে এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইনের ভাষায় একতরফা বলপ্রয়োগ বলা যায়, যা স্পষ্টতই নিষিদ্ধ। এমনকি যদি কোনও রাষ্ট্রপ্রধানের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগও থাকে, তাহলে তার বিচার হওয়ার কথা আন্তর্জাতিক আদালতে বা সংশ্লিষ্ট দেশের আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, অপহরণের মাধ্যমে নয়।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাষ্ট্রপ্রধানদের একটি বিশেষ কূটনৈতিক সুরক্ষা বা ইমিউনিটি থাকে। সেই সুরক্ষা ভেঙে দেওয়া মানে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভিতটাই দুর্বল করে দেওয়া। আজ যদি এই নিয়ম ভাঙা হয়, তবে ভবিষ্যতে শক্তিধর দেশগুলি নিজেদের স্বার্থে যে কোনও দুর্বল রাষ্ট্রের নেতৃত্বকে টার্গেট করতে পারে।
এই কারণেই বহু আন্তর্জাতিক আইনবিদ বলছেন, এই ঘটনা শুধু একটি রাজনৈতিক সংকট নয়— এটি আন্তর্জাতিক আইন ও বিশ্বের শৃঙ্খলার উপর সরাসরি আঘাত।
Advertisement



