• facebook
  • twitter
Saturday, 17 January, 2026

সংবিধান বনাম সাম্রাজ্যবাদী দম্ভ

বার্নি স্যান্ডার্সের বক্তব্য তাই শুধু এক মুহূর্তের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া নয়— এটি একবিংশ শতাব্দীতে গণতন্ত্র, সার্বভৌমত্ব ও ন্যায়বোধের পক্ষে একটি জরুরি উচ্চারণ।

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

মার্কিন রাজনীতিতে বার্নি স্যান্ডার্স বরাবরই একটি ব্যতিক্রমী কণ্ঠ। ভেনেজুয়েলা প্রসঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক আগ্রাসী অবস্থানের বিরুদ্ধে তাঁর বক্তব্য শুধু একটি দলের বা একজন সিনেটরের প্রতিক্রিয়া নয়, এটি মার্কিন গণতন্ত্রের মৌলিক চরিত্র, আন্তর্জাতিক আইন এবং বিশ্বব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে এক গভীর সতর্কবার্তা।

মার্কিন সংবিধান স্পষ্টভাবে বলে, যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষমতা কংগ্রেসের। কোনও প্রেসিডেন্ট একতরফাভাবে অন্য একটি দেশের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালাতে পারেন না, সে দেশ যতই দুর্নীতিগ্রস্ত বা স্বৈরতান্ত্রিক শাসকের অধীনে থাকুক না কেন। স্যান্ডার্স ঠিক এই মৌলিক সত্যটিই মনে করিয়ে দিয়েছেন। ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলা আক্রমণ শুধু সংবিধান লঙ্ঘন নয়, এটি আইনের শাসনের প্রতি প্রকাশ্য অবজ্ঞা।

Advertisement

এর চেয়েও বিপজ্জনক এই আক্রমণের আন্তর্জাতিক অভিঘাত। যদি বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র নিজেকে আইন ও নিয়মের ঊর্ধ্বে মনে করে, তাহলে অন্য দেশগুলিকে কী বার্তা দেওয়া হয়? শক্তির জোরে সরকার বদলানো, সম্পদ দখল করা বা রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার— এই যুক্তিই তো ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেন আক্রমণের ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছেন। স্যান্ডার্স যথার্থই বলেছেন, ভেনেজুয়েলায় মার্কিন আগ্রাসন গোটা বিশ্বকে আরও অনিরাপদ করে তুলবে।

Advertisement

ট্রাম্প প্রশাসনের মুখে ‘মনরো ডকট্রিন’-এর পুনরুজ্জীবনের কথা নতুন নয়। লাতিন আমেরিকাকে মার্কিন ‘প্রভাবক্ষেত্র’ হিসেবে দেখার এই মানসিকতা উনিশ ও বিশ শতকে অসংখ্য সামরিক হস্তক্ষেপ, অভ্যুত্থান ও রক্তক্ষয়ী স্বৈরতন্ত্রের জন্ম দিয়েছে। চিলি থেকে গুয়াতেমালা, নিকারাগুয়া থেকে এল সালভাদর— এই অঞ্চলের ইতিহাস মার্কিন হস্তক্ষেপের কালো অধ্যায়ে ভরা। ভেনেজুয়েলার তেলের ভাণ্ডার নিয়ে প্রকাশ্য আগ্রহ সেই পুরনো সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতারই নতুন রূপ। নাম বদলালেও চরিত্র বদলায়নি।

সবচেয়ে বড় ভণ্ডামিটা ধরা পড়ে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ স্লোগানের সঙ্গে বাস্তব নীতির সংঘাতে। ট্রাম্প নিজেকে ‘শান্তির প্রার্থী’ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। অথচ আজ তাঁর প্রশাসন একের পর এক বিদেশি সামরিক অভিযানে জড়িয়ে পড়ছে। এর মধ্যেই মার্কিন সমাজে গভীর আর্থসামাজিক সংকট— ৬০ শতাংশ মানুষ মাসের শেষে বেতন ছাড়া টিকে থাকতে পারেন না, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে, বাড়িভাড়া সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা লক্ষ লক্ষ চাকরিকে বিপন্নতার মুখে ফেলছে। এই বাস্তবতায় প্রশ্ন ওঠে: মার্কিন প্রেসিডেন্টের অগ্রাধিকার কি হওয়া উচিত?

স্যান্ডার্সের ভাষায়, ট্রাম্প আসলে আমেরিকা ‘চালাতে’ ব্যর্থ হচ্ছেন বলেই ভেনেজুয়েলা ‘চালানোর’ স্বপ্ন দেখছেন। এটি শুধু রাজনৈতিক ব্যঙ্গ নয়, এক নির্মম সত্য। দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট থেকে নজর ঘোরাতে বিদেশি শত্রু তৈরি করা শাসকদের চেনা কৌশল। কিন্তু তার মূল্য চুকোতে হয় সাধারণ মানুষকে— যুদ্ধক্ষেত্রে, অর্থনীতিতে, এবং নৈতিক অবস্থানে।

এই পরিস্থিতিতে কংগ্রেসের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধক্ষমতার প্রশ্নে নীরবতা মানে সাংবিধানিক দায়িত্ব থেকে পলায়ন। স্যান্ডার্সের আহ্বান তাই শুধু ট্রাম্প-বিরোধিতা নয়, এটি মার্কিন গণতন্ত্রকে রক্ষার ডাক। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সমাজেরও উচিত এই আগ্রাসনের স্পষ্ট নিন্দা করা।

ভেনেজুয়েলার সংকট বাস্তব, মাদুরো সরকারের সমালোচনাও যুক্তিসংগত। কিন্তু তার সমাধান যুদ্ধবিমান বা ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে নয়। শক্তির যুক্তি শেষ পর্যন্ত শুধু আরও শক্তিকেই জন্ম দেয়। ইতিহাস তার প্রমাণ। আজ যদি এই আগ্রাসন মেনে নেওয়া হয়, কাল অন্য কোনও দেশ অন্য কারও উপর একই যুক্তিতে হামলা চালাবে। তখন আন্তর্জাতিক আইন থাকবে কেবল কাগজে।

বার্নি স্যান্ডার্সের বক্তব্য তাই শুধু এক মুহূর্তের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া নয়— এটি একবিংশ শতাব্দীতে গণতন্ত্র, সার্বভৌমত্ব ও ন্যায়বোধের পক্ষে একটি জরুরি উচ্চারণ।

Advertisement