• facebook
  • twitter
Wednesday, 11 March, 2026

মানসিক আতঙ্কের উৎস

এসআইআর হওয়া উচিত একটি নিয়মিত, স্বচ্ছ, ধাপে ধাপে পরিচালিত প্রক্রিয়া— নির্বাচনের বহু আগেই, পর্যাপ্ত সময় ও জনসচেতনতা নিয়ে।

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে এসআইআর— স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন— একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে তা সাধারণ মানুষের মনে গভীর আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা ও ভয়ের জন্ম দিয়েছে। ভোটার তালিকায় নাম না থাকলে এই দেশে থাকা যাবে না, ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠানো হবে— এই ধরনের ভয় ছড়িয়ে পড়েছে গ্রাম থেকে শহর, প্রান্তিক অঞ্চল থেকে মধ্যবিত্ত পাড়া পর্যন্ত। প্রশ্ন উঠছে, একটি গণতান্ত্রিক দেশে নাগরিকদের মধ্যে এই ভয় তৈরি হওয়া কি স্বাভাবিক? নাকি এটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও রাজনৈতিক অসংবেদনশীলতার ফল?

সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো, এই আতঙ্কের বাস্তব পরিণতি। প্রবীণ মানুষ, বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা তো বটেই, বহু মধ্যবয়সী পুরুষ ও মহিলা প্রবল মানসিক চাপে হার্ট অ্যাটাকের শিকার হয়েছেন, কেউ কেউ আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। এমনকি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত বিএলও-রাও (বুথ লেভেল অফিসার) কাজের অতিরিক্ত চাপ, লক্ষ্য পূরণের দায় ও মানসিক চাপে ভেঙে পড়ে আত্মহত্যা করেছেন— এমন ঘটনাও সামনে এসেছে। এই মৃত্যুগুলি কি নিছক ‘দুর্ভাগ্যজনক’ বলে এড়িয়ে যাওয়া যায়? নাকি রাষ্ট্রের দায়িত্ববোধের ঘাটতির প্রশ্ন এখানে অনিবার্যভাবে উঠে আসে?
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের প্রধান দায়িত্ব নাগরিকদের আস্থা বজায় রাখা। ভোটার তালিকা সংশোধন অবশ্যই প্রয়োজনীয় ও নিয়মিত একটি প্রক্রিয়া। কিন্তু সেটি হওয়ার কথা নির্দিষ্ট সময় অন্তর, স্বচ্ছভাবে, পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিয়ে। ২২ বছর পর হঠাৎ করে এসআইআর চালু করা, তাও আবার নির্বাচনের ঠিক আগে— এই সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়েই স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন উঠছে। যদি এটি একটি ‘রুটিন’ প্রশাসনিক কাজই হয়, তবে এত বছর ধরে কেন তা করা হলো না? আর কেনই বা এখন এত তাড়াহুড়ো?

Advertisement

এই তাড়াহুড়োর ফলেই তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি। বহু মানুষ জানেন না কী নথি লাগবে, কোথায় যেতে হবে, সময়সীমা কী। প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট, মানবিক ও আশ্বস্তকারী বার্তা না দিয়ে উল্টে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে মানুষ ভাবছে— ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়লেই বুঝি নাগরিকত্বই প্রশ্নের মুখে পড়বে। এই ভয় বাস্তব হোক বা গুজব—দুটো ক্ষেত্রেই প্রশাসনের ব্যর্থতা স্পষ্ট। কারণ ভয় ছড়ালে তার দায় এড়ানো যায় না।

Advertisement

নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিক সংস্থা, তার নিরপেক্ষতা ও সংবেদনশীলতা প্রশ্নাতীত হওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, মাঠপর্যায়ে কাজ করা কর্মীদের ওপর অসম্ভব চাপ চাপানো হয়েছে। অল্প সময়ে বিপুল কাজ শেষ করার নির্দেশ, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও সহায়তার অভাব—সব মিলিয়ে এই প্রক্রিয়া যেন মানবিকতার সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে দাঁড়িয়ে। একটি নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়া যেমন জরুরি, তেমনই নাগরিকদের মানসিক ও সামাজিক নিরাপত্তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সরকারের ভূমিকা এখানে আরও বেশি করে প্রশ্নের মুখে। দেশের সরকার কি তার নাগরিকদের প্রতি সহানুভূতিশীল থাকবে না? গণতন্ত্র কি কেবল ভোট নেওয়ার যন্ত্র, নাকি মানুষের জীবনের প্রতি দায়িত্বও তার অঙ্গ? যখন একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত মানুষের মনে এমন আতঙ্ক তৈরি করে যে তার ফলে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটছে, তখন সেই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি ওঠা কি অযৌক্তিক?

এসআইআর হওয়া উচিত একটি নিয়মিত, স্বচ্ছ, ধাপে ধাপে পরিচালিত প্রক্রিয়া— নির্বাচনের বহু আগেই, পর্যাপ্ত সময় ও জনসচেতনতা নিয়ে। আতঙ্ক নয়, আস্থা— এটাই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের বার্তা। এখনো সময় আছে। সরকার ও নির্বাচন কমিশনের উচিত অবিলম্বে প্রক্রিয়ার গতি ও পদ্ধতি নিয়ে পুনর্বিবেচনা করা, স্পষ্ট আশ্বাস দেওয়া যে নাগরিকত্ব নিয়ে অমূলক ভয় অকারণ, এবং মানুষের জীবনের মূল্য যে ভোটের চেয়েও কম নয়— এই বার্তাটি দৃঢ়ভাবে পৌঁছে দেওয়া।
নচেৎ ইতিহাস প্রশ্ন তুলবে—গণতন্ত্র রক্ষার নামে কি আমরা মানুষের জীবন ও মানসিক শান্তিকে বলি দিলাম?

Advertisement