দেশে তিন-ভাষা নীতি নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। কিন্তু কেন্দ্রীয় বোর্ডের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তগুলি এই বিতর্ককে আবার সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের উপর অতিরিক্ত ভাষাশিক্ষার চাপ কতটা যুক্তিসঙ্গত, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে সুপ্রিম কোর্টও বারবার হস্তক্ষেপ করছে। আদালতের অবস্থানকে শুধু নীতির বিরোধিতা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং মনে হচ্ছে, বাস্তব পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে নীতিটিকে আরও নমনীয় করার কথাই আদালত বলতে চাইছে।
শিক্ষানীতির মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত শিশুর শিক্ষাকে সহজ, আনন্দময় ও কার্যকর করা। কিন্তু একটি ভাষা কখন পড়তে হবে, কত বছর পড়তে হবে এবং কোন ভাষায় পরীক্ষা দিতে হবে— এসব সিদ্ধান্ত যদি বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা না করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে ভাষাশিক্ষাই ছাত্রছাত্রীর কাছে বোঝা হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষ করে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে নতুন ভাষা শেখানোর ক্ষেত্রে স্কুলগুলির প্রস্তুতি কতটা, শিক্ষক কোথায়, পাঠ্যপুস্তক কেমন— এসব প্রশ্নের উত্তর আগে দরকার। একটি শিশু যে ভাষা এতদিন পড়েনি, হঠাৎ তাকে সেই ভাষায় দক্ষ হতে বলা সহজ নয়। আরও কঠিন হয় যখন সেই ভাষা ভবিষ্যতে বোর্ড পরীক্ষার অংশ হয়ে দাঁড়ায়। শিক্ষার পরিবর্তে তখন পরীক্ষার ভয়ই প্রধান হয়ে ওঠে।
তিনটি ভাষা শেখার ধারণার মধ্যে আপত্তিকর কিছু নেই। ভারত বহু ভাষার দেশ। একাধিক ভারতীয় ভাষা জানলে মানুষের সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত হতে পারে, অন্য রাজ্যের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়তে পারে। দেশের ঐক্য ও বৈচিত্র্যকে বোঝার ক্ষেত্রেও ভাষার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ভাষাশিক্ষা কখনও রাজনৈতিক আনুগত্যের পরীক্ষা হতে পারে না। কোন ভাষা একজন ছাত্র শিখবে, তার ক্ষেত্রে তার পরিবার, অঞ্চল, ভবিষ্যৎ পেশা এবং নিজের আগ্রহকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
এখানেই ইংরেজির প্রশ্নটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ইংরেজিকে শুধুমাত্র ‘বিদেশি ভাষা’ হিসেবে দেখলে ভারতের বাস্তবতাকে পুরোপুরি বোঝা যায় না। কয়েক শতক ধরে ইংরেজি ভারতের প্রশাসন, উচ্চশিক্ষা, আইন, বিজ্ঞান, ব্যবসা এবং পেশাজীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। আজও দেশের লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রীর উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনের দরজা খুলে দেয় ইংরেজি। তথ্যপ্রযুক্তি, চিকিৎসা, গবেষণা, আন্তর্জাতিক ব্যবসা— প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই ইংরেজির ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তাই ইংরেজিকে সরিয়ে দিয়ে আরও একটি বাধ্যতামূলক ভাষা চাপিয়ে দেওয়া হলে তার সামাজিক ও অর্থনৈতিক ফল কী হবে, সেটিও ভাবতে হবে। বিশেষত যে পরিবারগুলি নিজেদের সন্তানকে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রের জন্য প্রস্তুত করতে চায়, তাদের পছন্দের স্বাধীনতা কমে যাওয়া উচিত নয়।
অন্যদিকে, ফরাসি, স্প্যানিশ, জার্মান, জাপানি বা অন্য বিদেশি ভাষা শেখার সুযোগও থাকা দরকার। বিশ্ব আজ আরও ঘনিষ্ঠ। ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্র শুধু ভারতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। কোনও ছাত্র যদি তৃতীয় ভাষা হিসেবে ফরাসি শেখার আগ্রহী হয়, অন্য কেউ যদি সংস্কৃত, তামিল, বাংলা, হিন্দি বা অন্য কোনও ভারতীয় ভাষা শিখতে চায়, তাহলে রাষ্ট্রের কাজ হওয়া উচিত সেই সুযোগ তৈরি করা— একটি নির্দিষ্ট পছন্দ সবার উপর চাপিয়ে দেওয়া নয়।
এই কারণে তৃতীয় ভাষাকে বোর্ড পরীক্ষার বাধ্যতামূলক বিষয় না করে অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা অনেক বেশি যুক্তিসঙ্গত হতে পারে। এতে ছাত্রছাত্রীরা ভাষা শিখবে, কিন্তু পরীক্ষার নম্বরের জন্য নয়, নিজের জ্ঞান ও আগ্রহের জন্য। যে ছাত্র ভাষাটিতে বেশি দক্ষ হতে চায়, সে চাইলে আরও এগিয়ে যেতে পারবে।
ভারতের জন্য দুই-ভাষার ভিত্তি— ইংরেজি এবং মাতৃভাষা বা আঞ্চলিক ভাষা— বাস্তবসম্মত। তার সঙ্গে তৃতীয় ভাষা শেখার দরজা খোলা থাকুক। কিন্তু সেই ভাষা বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা ছাত্রছাত্রী ও তাদের পরিবারের উপর থাকুক। ভাষা মানুষের পরিচয়, সংস্কৃতি ও যোগাযোগের মাধ্যম। তাই ভাষাকে ভালোবাসার বিষয় করে তুলতে হবে, ভয়ের বিষয় নয়।




