• facebook
  • twitter
Saturday, 18 April, 2026

বন্দুকের ছায়ায় বিপ্লবের মৃত্যু, নাকি রাষ্ট্রের নতুন জন্ম?

ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি কেবল একটি দেশের রাজনৈতিক সংকট নয়

সুদীপ ঘোষ: ইতিহাসের বুকে এমন কিছু মুহূর্ত থাকে, যেগুলোকে কেবল ঘটনা বলে ব্যাখ্যা করা যায় না— সেগুলো হয়ে ওঠে এক একটি মোড়, যেখানে একটি জাতির ভবিষ্যৎ নিঃশব্দে দিক বদলায়। ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি তেমনই এক সন্ধিক্ষণ, যেখানে ধ্বংস আর পুনর্গঠনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে একটি রাষ্ট্র নিজের নতুন পরিচয় খুঁজছে। প্রশ্ন শুধু এই— এই পরিচয় কি মানুষের স্বপ্ন থেকে জন্ম নেবে, নাকি বন্দুকের নলের ছায়ায় গড়ে উঠবে? দীর্ঘ চার দশক ধরে ইরান একটি ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার অধীনে পরিচালিত হয়েছে, যার কেন্দ্রে ছিল ধর্মীয় অভিভাবকত্বের ধারণা।

এই ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতা কোনও নির্বাচিত প্রতিনিধির হাতে নয়, বরং ধর্মীয় কর্তৃত্বের অধিকারী এক সর্বোচ্চ নেতার হাতে কেন্দ্রীভূত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই কাঠামোর ভিতরে ফাটল ধরতে শুরু করে— এটি কোনও আকস্মিক পরিবর্তন নয়, বরং দীর্ঘ সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং বৌদ্ধিক প্রক্রিয়ার ফল।বিশেষত গত দুই দশকে ইরানের সমাজে যে পরিবর্তনগুলি লক্ষ্য করা গেছে, তা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়— রাষ্ট্রের ভেতর থেকেই এক ধরনের নীরব প্রতিরোধ গড়ে উঠছিল। নতুন প্রজন্মের ধর্মীয় শিক্ষার্থীরা ধর্ম ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়ে পুনর্বিবেচনা শুরু করেছিল। তারা এমন এক ধর্মীয় ব্যাখ্যার দিকে ঝুঁকছিল, যেখানে আধ্যাত্মিকতা ব্যক্তিগত, আর রাষ্ট্র পরিচালনা হবে জনগণের ইচ্ছার ভিত্তিতে।

Advertisement

এই পরিবর্তনের উৎস খুঁজতে গেলে শিয়া ইসলামের দুই প্রধান কেন্দ্রের মধ্যে মতাদর্শগত পার্থক্যের দিকে নজর দিতে হয়— একদিকে ইরানের কৌম, অন্যদিকে ইরাকের নাজাফ। নাজাফের দীর্ঘ ঐতিহ্য ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে আলাদা রাখার পক্ষে, যেখানে কৌমের আধুনিক ঐতিহ্য রাষ্ট্রক্ষমতার সঙ্গে ধর্মকে যুক্ত করেছে। গত কয়েক দশকে এই দুই ধারার মধ্যে মেলবন্ধন ঘটতে শুরু করেছিল, যার ফলে ইরানের ধর্মীয় পরিমণ্ডলেই এক ধরনের বৌদ্ধিক নবজাগরণ দেখা যাচ্ছিল।এই প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

Advertisement

কারণ, কোনও ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভেতরে যদি ধর্মীয় ব্যাখ্যাই বদলাতে শুরু করে, তাহলে সেই রাষ্ট্রের ভিত্তিই নড়ে যায়। ইরানের ক্ষেত্রেও ঠিক সেটাই ঘটছিল। তরুণ ধর্মগুরুরা শুধু নীরব দর্শক ছিলেন না; তাঁরা সক্রিয়ভাবে সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছিলেন, এমনকি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ কর্তৃত্বের বিরুদ্ধেও কণ্ঠ তুলছিলেন।এই অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের অসন্তোষ—অর্থনৈতিক সংকট, দুর্নীতি, বেকারত্ব এবং সামাজিক নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে ক্ষোভ। ফলে একটি এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছিল, যেখানে রাষ্ট্রের বৈধতা ক্রমশ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠছিল। রাজনৈতিক বিজ্ঞানের ভাষায়, এটিকে বলা যায় ‘বৈধতার সংকট’— যেখানে শাসনব্যবস্থা আর জনগণের সম্মতি থেকে শক্তি অর্জন করতে পারে না।

এই অবস্থায় ইতিহাস সাধারণত দুটি পথের দিকে এগোয়— অভ্যন্তরীণ সংস্কার অথবা আকস্মিক পতন। কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে এই স্বাভাবিক গতিপথ ব্যাহত হয়েছে বাইরের শক্তির হস্তক্ষেপে। সামরিক আক্রমণ শুধু অবকাঠামো ধ্বংস করে না; এটি একটি সমাজের মানসিক কাঠামোকেও বদলে দেয়। যখন একটি জাতি নিজেকে আক্রান্ত বলে মনে করে, তখন তার অভ্যন্তরীণ বিভাজনগুলি সাময়িকভাবে মুছে যায়, এবং রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য নতুন করে গড়ে ওঠে।
এই মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এটি বোঝায় কেন বহিরাগত আক্রমণ প্রায়শই গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে নষ্ট করে দেয়। ইরানের ক্ষেত্রেও সেটাই ঘটেছে।

যে সমাজ ধীরে ধীরে পরিবর্তনের দিকে এগোচ্ছিল, সেটিকে হঠাৎ করেই একটি প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। ফলে, সংস্কারপন্থী শক্তিগুলি দুর্বল হয়ে পড়েছে, আর কঠোরপন্থী সামরিক শক্তি নিজেদের বৈধতা পুনর্গঠন করতে পেরেছে।এই প্রেক্ষাপটে সামরিক শক্তির উত্থানকে কেবল রাজনৈতিক ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে; এটি একটি কাঠামোগত পরিবর্তন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি ‘প্রেটোরিয়ান রাষ্ট্র’-এর দিকে অগ্রসর হওয়ার লক্ষণ— যেখানে সেনাবাহিনী শুধু নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনী নয়, বরং রাষ্ট্রের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হয়ে ওঠে।

এমন রাষ্ট্রব্যবস্থায় গণতন্ত্র পুরোপুরি অনুপস্থিত থাকে না; বরং এটি একটি নিয়ন্ত্রিত কাঠামোতে রূপান্তরিত হয়। নির্বাচন হয়, কিন্তু তার ফলাফল পূর্বনির্ধারিত সীমার মধ্যে আবদ্ধ থাকে। রাজনৈতিক দল থাকে, কিন্তু তাদের কার্যক্ষমতা সীমিত। এই ধরনের ব্যবস্থাকে অনেক সময় ‘নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র’ বা ‘ছায়া গণতন্ত্র’ বলা হয়।বিশ্ব রাজনীতিতে এর উদাহরণ নতুন নয়। বিভিন্ন দেশে আমরা দেখেছি—সামরিক বাহিনী সরাসরি ক্ষমতায় না থেকেও রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে প্রধান ভূমিকা পালন করে। ইরানের ভবিষ্যৎ সেই পথেই এগোতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

এটি সম্পূর্ণ সামরিক একনায়কতন্ত্র নাও হতে পারে, আবার পূর্ণ গণতন্ত্রও নয়; বরং এর মাঝামাঝি একটি জটিল কাঠামো।তবে এই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো— এটি আদর্শগত নয়, বরং বাস্তববাদী। ধর্মতান্ত্রিক শাসনের বিপরীতে সামরিক শাসন সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শকে প্রতিষ্ঠা করতে চায় না; বরং তার লক্ষ্য থাকে ক্ষমতা ধরে রাখা এবং স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। এই বাস্তববাদই একদিকে এই ব্যবস্থাকে নমনীয় করে তোলে, আবার অন্যদিকে এটিকে অনিশ্চিতও করে তোলে। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে সামরিক শাসন একসময় গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পথ খুলে দিয়েছে।

তবে এই প্রক্রিয়া কখনোই সরল বা দ্রুত নয়। এটি নির্ভর করে বহু উপাদানের উপর— অভ্যন্তরীণ সামাজিক চাপ, অর্থনৈতিক অবস্থা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, জনগণের রাজনৈতিক চেতনা।
ইরানের ক্ষেত্রে এই সমস্ত উপাদানই জটিলভাবে জড়িত। একদিকে রয়েছে একটি উচ্চশিক্ষিত, সচেতন তরুণ প্রজন্ম, যারা পরিবর্তন চায়। অন্যদিকে রয়েছে একটি শক্তিশালী সামরিক কাঠামো, যা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় কঠোর। এই দ্বন্দ্বই আগামী দিনের ইরানের রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণ করবে।কিন্তু এই সমগ্র আলোচনার কেন্দ্রে যে প্রশ্নটি থেকে যায়, তা হলো— এই পরিবর্তনের মূল্য কে দিচ্ছে? উত্তরটি স্পষ্ট— সাধারণ মানুষ। তারা একদিকে রাষ্ট্রের দমন-পীড়নের শিকার, অন্যদিকে যুদ্ধের ধ্বংসের ভার বহন করছে।

তাদের জীবন হয়ে উঠেছে এক ধরনের রাজনৈতিক পরীক্ষাগার, যেখানে বিভিন্ন শক্তি নিজেদের কৌশল প্রয়োগ করছে।মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে এই চিত্র নতুন নয়। এখানে বারবার দেখা গেছে— অভ্যন্তরীণ সংকট এবং বহিরাগত হস্তক্ষেপ একসঙ্গে মিলে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করে, যেখানে স্থিতিশীলতা অধরা থেকে যায়। প্রতিটি সংঘাতের পর মনে হয়, এবার হয়তো নতুন কিছু শুরু হবে; কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, পুরনো সমস্যাগুলিই নতুন রূপে ফিরে আসে। ইরানের ক্ষেত্রেও সেই আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ধর্মতান্ত্রিক শাসনের পরিবর্তে যদি সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে সেটি হয়তো কিছু সমস্যার সমাধান করবে, কিন্তু নতুন সমস্যারও জন্ম দেবে। কারণ, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ যেখানেই ঘটে, সেখানেই জনগণের অংশগ্রহণ সীমিত হয়ে পড়ে।

তবুও, ইতিহাসের গতিপথ কখনো একরৈখিক নয়। প্রতিটি সংকটের মধ্যেই সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে। ইরানের ক্ষেত্রেও সেই সম্ভাবনা রয়েছে—কিন্তু তা বাস্তবায়িত হবে কি না, তা নির্ভর করবে ভবিষ্যতের উপর, মানুষের উপর, এবং সবচেয়ে বেশি, সেই প্রশ্নগুলোর উপর, যেগুলো আজ চাপা পড়ে আছে।শেষ পর্যন্ত বলা যায়, ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি কেবল একটি দেশের রাজনৈতিক সংকট নয়; এটি একটি বৃহত্তর ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার অংশ, যেখানে রাষ্ট্র, সমাজ এবং ক্ষমতার সম্পর্ক নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হচ্ছে। এই প্রক্রিয়া হয়তো ধ্বংসের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে, কিন্তু তার শেষ কোথায়— তা এখনও অনিশ্চিত।আর হয়তো ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সত্য এটিই— যে কোনো রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হয় না শুধু তার শাসকদের দ্বারা, বরং তার মানুষের দ্বারা, তাদের স্মৃতি, তাদের প্রশ্ন, এবং তাদের অদম্য বেঁচে থাকার ইচ্ছার দ্বারা।

Advertisement