• facebook
  • twitter
  • youtube
Tuesday, 22 September, 2026

কৃত্রিম মেধার স্রষ্টা ও সৃষ্টির সংঘাত

শুধু ঝুঁকি প্রতিরোধে বিনিয়োগ করলেই হবে না, এআই-এর সক্ষমতা বৃদ্ধির গতি এমন ভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে যাতে ঝুঁকি মোকাবিলার ব্যবস্থা সেই গতির সঙ্গে তাল মেলানোর জন্য প্রয়োজনীয় সময় পায়। এআই মডেলগুলির সক্ষমতা বৃদ্ধির গতি আমাদের কমাতেই হবে। তাতেও অগ্রগতির গতি দ্রুত থাকবে। এই প্রবন্ধে তিনি যে ভাবে বিষয়টির ভয়াবহতা তুলে ধরেছেন, তা অতীতে দেখা যায়নি। যে কারণে এই প্রবন্ধ প্রকাশিত হওয়ার পরই তাঁর মতকে সমর্থন করেছেন মাস্ক, অল্টম্যানরা।

কৃত্রিম মেধার স্রষ্টা ও সৃষ্টির সংঘাত

প্রতীকী চিত্র

কথায় বলে, ঘোড়া দেখলেই খোঁড়া। কৃত্রিম মেধার (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই) দাপটে সেই দশাই কি হচ্ছে মানুষের? সম্প্রতি, একটি সমীক্ষায় এ-হেন চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর দুনিয়া জুড়ে পড়ে যায় শোরগোল। তাতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিজ্ঞানী থেকে প্রযুক্তিবিদেরা। চলতি বছরেই মানুষের এআই নির্ভরতা নিয়ে সমীক্ষা চলে পোল্যান্ডে। এর জন্য বেছে নেওয়া হয় বেশ কয়েক জন চিকিৎসককে। তাঁদের কৃত্রিম মেধা প্রযুক্তি ব্যবহার করে কোলোনোস্কপির ছবি বিশ্লেষণ করতে বলে সমীক্ষক দল। এতে অভ্যস্থ হয়ে গেলে এআই ছাড়া একই কাজ দেওয়া হয় তাঁদের। এই পরীক্ষাতেই উঠে আসে বিস্ফোরক রিপোর্ট। সমীক্ষকদের দাবি, কৃত্রিম মেধা প্রযুক্তি ব্যবহার না করে কোলোনোস্কপির ছবি বিশ্লেষণ করতে পারছিলেন ২৮.৪ শতাংশ চিকিৎসক। এআইতে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ার পর সেই সংখ্যা হ্রাস পেয়ে নেমে আসে ২৪.৮ শতাংশে। ফলে মানুষ যে ধীরে ধীরে অত্যধিক কৃত্রিম মেধা নির্ভর হয়ে পড়ছে, তা বলাই বাহুল্য।আর এখানেই উঠে আসছে স্রষ্টা ও সৃষ্টির সংঘাত।

যদিও, স্রষ্টা ও সৃষ্টির সংঘাতের কাহিনি নতুন নয়। ১৮১৮ সালে প্রকাশিত মেরি শেলির বহু চর্চিত উপন্যাস ‘ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন’-এর গল্প স্মরণ করা যেতে পারে। এমন মারাত্মক পরিণতি যাতে না হয়, তার জন্যই এআই দৌড়ে লাগাম টানার পক্ষে হয়তো সওয়াল করলেন বিশ্বের তিন শীর্ষসংস্থার তিন শীর্ষকর্তা। তাঁদের আশঙ্কা, প্রযুক্তির অগ্রগতি এমন জায়গায় পৌঁছোতে পারে, যেখানে তা আর নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে না। এ জন্যই কৃত্রিম মেধার উন্নতিতে লাগাম পরাতে চাইছেন স্পেসএক্সের কর্ণধার ইলন মাস্ক, ওপেনএআই-এর সিইও স্যাম অল্টম্যান এবং অ্যানথ্রপিকের সিইও দারিয়ো আমোদেই। এআই নিয়ে তীব্র প্রতিযোগিতায় থাকা তিন সংস্থার শীর্ষকর্তার এমন ঐকমত্য বিরল। একটি দীর্ঘ প্রবন্ধে অ্যানথ্রপিকের সিইও দারিয়ো আমোদেই লিখেছেন, এআই যে গতিতে এগোচ্ছে, তাতে প্রযুক্তির তরফ থেকে আসা ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য গবেষকদের হাতে যথেষ্ট সময় থাকছে না। যে কারণে তিনি এআইয়ের উন্নতির গতি কমানোর স্বপক্ষে সওয়াল করেছেন।

প্রশ্ন উঠতে পারে, প্রযুক্তির উন্নয়নে রাশ টানা আদৌ সম্ভব কি? আইন করে কি তা রোখা যাবে? এ নিয়ে বহু মত রয়েছে। এক দল মনে করেন, কোনও ভাবেই আইন করে প্রযুক্তির বিকাশ রোখা যায় না। আবার অন্য দলের মত, গাড়ির গতিতে রাশ না টেনে তার গতি নিয়ন্ত্রণ, রাস্তায় স্পিডব্রেকার, ভাল ব্রেকের ব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকটাই এড়ানো সম্ভব। অর্থাৎ, এআই-এর সক্ষমতা বৃদ্ধির গতি যেন তার নিরাপত্তাব্যবস্থার উন্নতির গতিকে ছাড়িয়ে না যায়। এই দিকটির প্রতিই নির্দেশ করেছেন আমোদেই।

ওই প্রবন্ধ প্রকাশিত হওয়ার পর তাঁর সুরে সুর মিলিয়েছেন ওপেনএআই-এর সিইও স্যাম অল্টম্যান, স্পেসএক্সের কর্ণধার ইলন মাস্কও। সমাজমাধ্যমে তাঁরা যে যুক্তি দিয়েছেন, তার মূল কথা, এআই-এর বিকাশের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক ও ধীর গতির পদক্ষেপ প্রয়োজন। তাঁর প্রবন্ধে আমোদেই লিখছেন যে, গত কয়েক মাস ধরে তিনি এই বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছেন যে, এআই ব্যবহারের ঝুঁকিগুলিকে সম্পূর্ণভাবে মোকাবিলার জন্য আরও বিচক্ষণতার প্রয়োজন। শুধু ঝুঁকি প্রতিরোধে বিনিয়োগ করলেই হবে না, এআই-এর সক্ষমতা বৃদ্ধির গতি এমন ভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে যাতে ঝুঁকি মোকাবিলার ব্যবস্থা সেই গতির সঙ্গে তাল মেলানোর জন্য প্রয়োজনীয় সময় পায়। এআই মডেলগুলির সক্ষমতা বৃদ্ধির গতি আমাদের কমাতেই হবে। তাতেও অগ্রগতির গতি দ্রুত থাকবে। এই প্রবন্ধে তিনি যে ভাবে বিষয়টির ভয়াবহতা তুলে ধরেছেন, তা অতীতে দেখা যায়নি। যে কারণে এই প্রবন্ধ প্রকাশিত হওয়ার পরই তাঁর মতকে সমর্থন করেছেন মাস্ক, অল্টম্যানরা। এক্স পোস্টে মাস্ক লিখেছেন, ‘দারিয়ো ঠিক কথাই বলছেন।’ অল্টম্যান লিখেছেন, ‘এআই মডেল মূল্যায়নের কাজে স্বাধীন মূল্যায়নকারীদের নিজেদের সংস্থার কর্মীদের মতোই প্রবেশাধিকার দেওয়ার প্রস্তাব সাধু উদ্যোগ। আমরাও একই ব্যবস্থা চালু করব।’

আমোদেইয়ের বক্তব্য, বর্তমানে এআই-এর যে অত্যাধুনিক মডেলগুলি তৈরি হচ্ছে, সেগুলির সম্ভাব্য ঝুঁকি এতটাই বেশি যে, তাদের নিয়ে গবেষণা আগের মতো দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাওয়া আর নিরাপদ নয়। ঘটনাচক্রে, তাঁর এই সতর্কবার্তা এসেছে এমন এক সময়ে, যখন তাঁরই সংস্থার এক কর্মী জেকব কক্সন সংস্থা থেকে ইস্তফা দিয়েছেন এই অভিযোগ করে যে, বিশ্বের বড় এআই ল্যাবরেটরিগুলি এমন ভাবে পরীক্ষানিরীক্ষা চালাচ্ছে যাতে মানুষের জীবন বিপন্ন হতে পারে।

কেন আমোদেই এমন প্রবন্ধ লিখলেন? মূলত দু’টি কারণ। প্রথমত, এআই ব্যবস্থাগুলির ক্রমবর্ধমান সক্ষমতা। এআই এখন মানুষের সাহায্য ছাড়া নিজেরাই আরও দ্রুতগতির সংস্করণ তৈরি করতে পারছে। এই প্রক্রিয়াকেই বলা হয় ‘রিকার্সিভ সেল্ফ-ইমপ্রুভমেন্ট’, যা নিয়ে চিন্তিত আমোদেই। দ্বিতীয় কারণটি হল, গত জুলাইয়ে এআই সফ্‌টঅয়্যার সংস্থা ‘হাগিং ফেস’-এ চালানো হ্যাক। ওপেনএআই-এর একটি পরীক্ষামূলক পরিবেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া প্রায় ১২০০টি এআই এজেন্টের একটি ‘ঝাঁক’ ওই হামলা চালিয়েছিল। তাঁর মতে, আরও বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন এবং একই রকম ‘মিসঅ্যালাইনড’ এআই-এর হাতে এমন ক্ষমতা থাকলে ভয়াবহ ক্ষতি হতে পারে। তাঁর দাবি, এমন কোনও নিয়ন্ত্রণহীন এআই-ঝাঁক মাত্র ছ’মাস থেকে এক বছরের মধ্যে গোটা ইন্টারনেটের নিয়ন্ত্রণও নিয়ে নিতে পারে, যার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে। পরবর্তী তদন্তে জানা যায়, পরীক্ষামূলক এআই ব্যবস্থাগুলি অনলাইনে নানা ধরনের কার্যকলাপ চালিয়ে যায়, যা তাদের সংস্থার কর্তারা টের পান না।

শুধু ব্যক্তির স্তরেই নয়, অর্থনীতির বৃহত্তর প্রেক্ষাপটেও তার সুপ্রভাব এখন অনস্বীকার্য— কৃষিতে আবহাওয়ার পূর্বাভাস থেকে কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণের হিসাবনিকাশ, চিকিৎসাশাস্ত্রের দুরূহ সমস্যার সমাধান থেকে সীমান্ত প্রতিরক্ষা, সব ক্ষেত্রেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষকে এনে দিয়েছে অনতিক্রম্য বাধাকে অতিক্রম করার স্বাধীনতা। তবে, এই স্বাধীনতার ঠিক উল্টো পিঠেই রয়েছে পরাধীনতাও। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তি মানুষকে বন্দি করতে পারে নজরদারির নিশ্ছিদ্র জালে। নজরদারি রাষ্ট্রীয় হতে পারে— যন্ত্রের মাধ্যমে মুখ চেনা থেকে শুরু করে ব্যক্তিবিশেষের প্রাত্যহিক কাজকর্ম বিশ্লেষণ করে তার ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ অনুমান ও সে অনুসারে দমনমূলক ব্যবস্থাগ্রহণ, ফোন বা ইন্টারনেটের উপরে নিরন্তর নজরদারি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা রাষ্ট্রের হাতে নাগরিককে নিয়ন্ত্রণ করার, নজরবন্দি করার এক অমিত শক্তিশালী অস্ত্র তুলে দিতে পারে। আবার, বেসরকারি সংস্থা, গোষ্ঠী বা ব্যক্তির হাতেও ঠিক এই ক্ষমতাই আছে। রাষ্ট্রের যদি বা জবাবদিহির কিছুমাত্র দায় থাকে, বেসরকারি সংস্থা বা গোষ্ঠীর সেটুকুও নেই। এবং এই নিয়ন্ত্রণ বা ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ যে সব সময় বোঝা যায়, তা-ও নয়। অনলাইন শপিংয়ের দুনিয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে যে ভাবে মানুষের পছন্দকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়, এক অর্থে তা-ও কি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ নয়?পারমাণবিক শক্তি আশীর্বাদ না অভিশাপ, স্কুলপড়ুয়াদের এই মর্মে প্রবন্ধ রচনা করতে হয়। তার পরীক্ষক-ধন্য উত্তর হল, সে শক্তি কী ভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তার উপরেই নির্ভর করে তা আশীর্বাদ হয়ে উঠবে, না কি অভিশাপ।