• facebook
  • twitter
Sunday, 8 February, 2026

সুভাষচন্দ্রের জাপান-সংযোগ

১৯৮৭ সালে তিনি যখন ভাগলপুরে অবসর জীবন যাপন করছিলেন তখন পত্রালাপের মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করার সুযোগ আমার হয়েছিল।

ফাইল চিত্র

অলকরঞ্জন বসুচৌধুরী

১৯৩৯ সালে কংগ্রেসের সভাপতি (তখন বলা হত রাষ্ট্রপতি) পদে গান্ধীর মতের বিরুদ্ধে প্রার্থী হয়ে সুভাষচন্দ্র নির্বাচনে গান্ধী মনোনীত প্রার্থীকে পরাজিত করেছিলেন। তারপর থেকেই কংগ্রেসের মধ্যে তাঁর বিরোধী একটি শিবিরের জন্ম হয়, যার পরিণতিতে শেষ পর্যন্ত কংগ্রেস থেকে বের হয়ে তাঁকে ফরওয়ার্ড ব্লক গঠন করতে হয়েছিল। কংগ্রেসের গান্ধীপন্থী হাইকমান্ড তাঁর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির মূল ধারায় তাঁর কাজ করার সুযোগ ক্রমশ সংকুচিত করে দেবার চেষ্টা করছিল। ১৯৪০ সালের শেষে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে যখন কারারুদ্ধ করে, তখন কার্যত সুভাষচন্দ্রের রাজনৈতিক জীবন এক রকম স্তব্ধ হবার মুখে এসে দাঁড়িয়েছিল।

Advertisement

এই সময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছে। এর সুযোগ নিয়ে ভারতকে ব্রিটিশ কবলমুক্ত করতে বৃটেনের শত্রুপক্ষীয় কোন দেশের সাহায্য গ্রহণের কথা সুভাষচন্দ্র ভাবতে থাকেন। তিনি জানতে পেরেছিলেন, বিশ্বযুদ্ধের সময়টা তাঁকে জেলখানায় আটক রাখার পরিকল্পনা ভারত সরকারের রয়েছে। কাজেই তিনি মুক্তির দাবিতে জেলখানায় অনশন শুরু করেন ও শেষ পর্যন্ত তখনকার মতো জেল থেকে মুক্তি অর্জন করতে সমর্থন হন। কিন্তু তিনি বুঝতে পেরেছিলেন কংগ্রেসের সর্বভারতীয় নেতৃবৃন্দ আর ব্রিটিশ সরকার এই দু’পক্ষই তাঁর আপোষবিরোধী আন্দোলনে বাধা সৃষ্টি করবে। এই পরিস্থিতিতে স্বভাবতই সরকারের দৃষ্টি এড়িয়ে ভারতের বাইরে চলে গিয়ে ব্রিটিশ বিরোধী অক্ষশক্তির সাহায্যগ্রহণের পরিকল্পনা তাঁর মাথায় এসেছিল।

Advertisement

১৯৪১ সালে কলকাতা থেকে গোপনে মহানিষ্ক্রমণের পর জার্মানিতে গিয়ে সুভাষচন্দ্রের ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের প্রচেষ্টায় ফ্রি ইন্ডিয়া সেন্টার স্থাপন ও যুদ্ধবন্দী ভারতীয় সৈন্যদের নিয়ে ‘ইন্ডিয়ান লিজিয়ান’ নামে একটি সেনাদল গড়ে তোলার কাহিনি আমরা সবাই জানি। কিন্তু এই সেনাদল নিয়ে ভারত অভিযান করে ব্রিটিশকে আক্রমণ করার কোন সুযোগ যে নাৎসি জার্মানি তাঁকে দেবে না, সে কথা নেতাজি ক্রমশ বুঝতে পারছিলেন। সে সময় পূর্ব এশিয়ায় রাসবিহারী বসু প্রমুখের নেতৃত্বে সেখানকার স্বাধীনতাকামী ভারতীয়রা গড়ে তুলেছিলেন ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স লীগ নামে এক সংগঠন। অক্ষশক্তির অন্যতম শরিক জাপান রাজনৈতিক কারণে এই আন্দোলনের সমর্থক ও পৃষ্ঠপোষক রূপে এগিয়ে এসেছিল। ব্যাংককে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে পূর্ব এশিয়ার এই ভারতীয়রা তাঁদের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেবার জন্য জার্মানি থেকে নেতাজিকে আমন্ত্রণ করে আনার প্রস্তাব গ্রহণ করেছিলেন।

এঁদেরই আহ্বানে সাড়া দিয়ে ১৯৪২ সালে সুভাষচন্দ্র জার্মানি থেকে জাপানে এসে পৌঁছন। নেতাজির জাপানে আগমনের পটভূমিকার এই ইতিহাস আজ সুবিদিত। কিন্তু যে-কথা আমরা অনেকেই জানি না, তা হল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হবার বেশ কিছু আগে থেকেই সুভাষচন্দ্র জাপানের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করেছিলেন। তাঁকে এই প্রচেষ্টায় সাহায্য করেছিলেন তাঁর পূর্বপরিচিত আনন্দমোহন সহায়, যিনি এর বহুবছর আগে থেকেই জাপানে ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স লীগের পতাকাতলে একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে সক্রিয় ছিলেন ও পরবর্তীকালেও নেতাজি আজাদ হিন্দ সরকার গঠন করার পর তাঁর মন্ত্রিসভার সচিব নিযুক্ত হয়ে নেতাজির বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে কাজ করেছিলেন।

জাপানে স্থিতিলাভ করার আগে থেকেই বিশের দশকে বিহারের একজন কংগ্রেসকর্মী হিসেবে আনন্দমোহন স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন এবং ১৯২২ সালে গয়া কংগ্রেসে সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়েছিল। ১৯২৭ সালে তিনি এক বাঙালি পরিবারের মেয়ে সতী সেনকে বিয়ে করেন এবং সে বছরই জাপানে এসে বসবাস শুরু করেন। এরপর তিনি ক্রমেক্রমে ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স লীগের কাজকর্মে যুক্ত হয়ে পড়েন ও রাসবিহারী বসুর ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসেন।

লীগের সমর্থকদের কাছে একজন উল্লেখযোগ্য নেতৃব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তিনি ভারতবর্ষের জাতীয় কংগ্রেসের প্রধান নেতাদের সঙ্গেও সংযোগ রক্ষা করে চলতেন। এই যোগাযোগ ছাড়াও বাংলার সঙ্গে আনন্দমোহনের বৈবাহিক সম্পর্কের সুবাদে সহায়দম্পতির বাংলাদেশেও আসা যাওয়া ছিল। এই সুযোগটিকে কাজে লাগিয়ে তিরিশের দশকেই সুভাষচন্দ্রের পক্ষে জাপানের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়েছিল।

স্বাধীনতার পরবর্তীকালে আনন্দমোহন ভারতে ফিরে আসেন এবং বেশ কয়েক বছর ভারত সরকারের রাষ্ট্রদূত হিসেবে বিভিন্ন দেশে কাজ করেন। ১৯৮৭ সালে তিনি যখন ভাগলপুরে অবসর জীবন যাপন করছিলেন তখন পত্রালাপের মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করার সুযোগ আমার হয়েছিল। সেই সময়ে আমি বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে সুভাষচন্দ্রের জাপানের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের কিছু অকথিত কাহিনি তাঁর কাছ থেকে জানতে পারি। বিশ্বযুদ্ধে জাপানের আত্মসমর্পণের পর সুভাষচন্দ্রের পরবর্তী পরিকল্পনা কী ছিল, সে বিষয়ে আমি তাঁর কাছে চিঠি লিখে জানতে চেয়েছিলাম। এর জবাবে তিনি স্বতঃপ্রবৃত্তভাবে আমাকে অতিরিক্ত কিছু তথ্যও জানান। ১৫-৬-১৯৮৮ তারিখের এক চিঠিতে আমাকে তিনি লেখেন, ‘… একথা সত্যি যে, আমি ১৯৩০ সাল থেকেই নেতাজীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলাম। পূর্ব এশিয়ায় আমাদের নেতৃত্ব দেবার ব্যাপারে তাঁর আগমন চাইবার ব্যাপারেও আমার কিছু হাত ছিল। কিন্তু জাপানি কর্তৃপক্ষের কিছু নির্বুদ্ধিতার কারণে এ ব্যাপারটি ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত বিলম্বিত হয়েছিল।’

এরপর আমার আরও জিজ্ঞাসার জবাবে সহায়জি যা লিখেছিলেন, তা থেকে ধারণা হয় যে, এমনকি চল্লিশের দশকের আগেও সুভাষচন্দ্র প্রয়োজনে বিভিন্ন বিদেশী রাষ্ট্রে আশ্রয় নেবার আগাম পরিকল্পনা শুরু করেছিলেন। সেসব দেশের মধ্যে শুধু জার্মানি বা সোভিয়েট রাশিয়াই নয়, জাপানও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ প্রসঙ্গে সহায়জি আমাকে লিখেছিলেন, ‘ভারত থেকে নেতাজির নিষ্ক্রমণ — হ্যাঁ, আমরা এতে কিছুটা অংশ নিয়েছিলাম। প্রকৃতপক্ষে আমার স্ত্রী সেই অংশগ্রহণ করেন, যদিও সেই নিষ্ক্রমণের পরিকল্পনায় আমাদের কোন অংশ ছিল না।’ এ ব্যাপারটিকে খোলসা করতে গিয়ে তিনি লেখেন যে, বিশ্বযুদ্ধ শুরুর আগেই ব্রিটিশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার ব্যাপারে জাপান সরকারের প্রস্তুতি সম্পর্কে বিভিন্ন খবর সরবরাহ করে তিনি ভারতে সুভাষচন্দ্রকে অবহিত রাখতেন। এই প্রক্রিয়াতে তিনি সুভাষচন্দ্রকে জাপানের নানা খবর বিস্তারিতভাবে জানাবার জন্য নিজের স্ত্রী সতীকে ভারতে পাঠানোর পরিকল্পনা করেন। যেহেতু ভারতে ও জাপানে ব্রিটিশের চরেরা তাঁর ওপরে নজর রাখত, তাই তাঁকে এমনভাবে কাজ করতে হত, যাতে কোন সন্দেহ না হয়। সুতরাং এই দেশপ্রেমিক দম্পতিকে কিছু ‘নাটক’ করতে হয়েছিল। [সহায়জির চিঠি, ২৬-৮-১৯৮৭]

কিন্তু কী ছিল সেই নাটক? সহায়জি ঐ চিঠির একটি অংশ দেখা যাক— ‘আমি রটিয়ে দিলাম যে, আমার স্ত্রীর সঙ্গে আমার গুরুতর মতবিরোধের সৃষ্টি হয়েছে এবং আমরা আলাদা থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তাই তিনি তাঁর মায়ের কাছে পাকাপাকিভাবে থাকার জন্য দেশে ফিরে যাচ্ছেন।’ উল্লেখ্য যে, এখানে মা বলতে বোঝানো হয়েছে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের বোন উর্মিলা দেবীকে, সতী দেবীর মায়ের মৃত্যুর পর তাঁর বাবার সঙ্গে যার বিয়ে হয়েছিল। কাজেই সুভাষচন্দ্রকে জাপানের সংবাদ সরবরাহ করার পরিকল্পনা নিয়ে সতী দেশে ফিরে তাঁর বিমাতার কলকাতার বাড়িতেই উঠলেন। উর্মিলা দেবী নিজেও একজন কংগ্রেস নেত্রী হিসেবে রাজনৈতিক কাজকর্মে সক্রিয় ছিলেন ও সেজন্য সব সময় তাঁর বাড়িতে পুলিশী নজরদারি থাকত। এ অবস্থায় সেখানে বসে সেই নজর এড়িয়ে সুভাষচন্দ্রের মতো একজন রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করা যথেষ্ট মুশকিল ছিল। এ কারণে উর্মিলা দেবীর সঙ্গে মিথ্যে ঝগড়ার একটি নাটক সৃষ্টি করে সতী একটি ভাড়া বাড়িতে উঠে এলেন। এখানে বসে তিনি জাপান থেকে আনন্দমোহন যেসব সংবাদ পাঠাতেন, সেগুলো সুভাষচন্দ্রের কাছে সহজেই পাচার করতেন।

আমাকে লেখা পূর্বোক্ত চিঠিতে ১৯৪১ সালে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে সুভাষচন্দ্রের দেশত্যাগ সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে আনন্দমোহন আরও দাবি করেন যে, কাবুলের জাপানি রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে তাঁর কাবুলে আগমনের খবর সুভাষচন্দ্র তাঁকে পাঠান ও জানান যে, তিনি জাপানে যেতে চান। তাঁর মতে সুভাষচন্দ্র জাপানে যেতে আগ্রহী থাকলেও জাপান সরকার চাইছিল না যে, সুভাষ সেই মুহূর্তে জাপানে আসুন। জাপানের এই অনিচ্ছার কারণ ব্যাখ্যা করে সহায়জি লিখেছিলেন, জাপানিরা তাদের যুদ্ধ ঘোষণা পরিকল্পনা সম্পর্কে চরম গোপনীয়তা অবলম্বন করতে চাইছিল। এর ফলে তখন নেতাজিকে রাশিয়ার দক্ষিণ অঞ্চলের মধ্য দিয়ে জার্মানিতে চলে যেতে হয়েছিল।

নেতাজির এই জাপান-সংযোগ বিষয়ে আরো কিছু তথ্য এখানে যোগ করা যায়। কাবুল থেকে জার্মানি পৌঁছাবার পর যে দু’বছর সুভাষচন্দ্র ওই দেশে ছিলেন, তখনও জার্মান সরকারের মাধ্যমে জাপান সরকারের সঙ্গে তাঁর নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। তিনি এই সূত্র ব্যবহার করে ভারতে তাঁর মেজদাদা শরৎচন্দ্র বসুকে যেসব খবর পাঠাতেন, সেগুলো কলকাতার জাপানি কনসালের মাধ্যমে শরৎচন্দ্রের কাছে পৌঁছে যেত। এই সংবাদ ও মতামত বিনিময়ের জন্য শরৎচন্দ্র গোপনে কলকাতার বাইরে এক বাগানবাড়িতে জাপানি কনসালের সঙ্গে মাঝেমধ্যেই মিলিত হতেন। কিন্তু সেটি অন্য এক কাহিনি।

Advertisement